হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির

18 Oct 2026, 01:27 PM অন্যান্য শেয়ার:
হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় হাটিকুমরুল গ্রামে নবরত্ন মন্দিরটি অবস্থিত। দোলমঞ্চের আদলে নির্মিত বলে স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি দোলমঞ্চ নামে পরিচিত। মন্দিরটির স্থাপত্যরীতি ও নির্মাণশৈলী দেখে ধারণা করা হয় মন্দিরটি তিন শত বছরের প্রাচীন।

ইতিহাসবিদদের মতে মোগল শাসনামলে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের নির্দেশে তাঁর তহশিলদার রামানাথ ভাদুড়ী উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল এলাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, নবরত্ন মন্দিরটি ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭২৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। তবে, কয়েকজন ইতিহাসবিদ ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে রামানাথ ভাদুড়ী প্রথম জীবনে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের তহশিলদার ছিলেন। পরবর্তীকালে রামানাথ ভাদুড়ী জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের পর নবাবের নির্দেশে ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গ্রামে মন্দিরটির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মন্দিরটির নির্মাণকালীন রামানাথ ভাদুড়ী মৃত্যুবরণ করলে এর নির্মাণ কাজ বেশকিছু দিন বন্ধ থাকে। রামানাথ ভাদুড়ীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে দেবেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের পর দেবেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী পুনরায় মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন এবং ১৭২৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনতলাবিশিষ্ট বিশাল মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন।

নবরত্ন মন্দির নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। দিনাজপুরের জমিদার প্রাণনাথ উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুলের জমিদার রামানাথ ভাদুড়ীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সে সময়ে জমিদার প্রাণনাথের অর্থ সংকট দেখা দিলে তাঁর জমিদারির রাজস্ব বাকি পড়ে। এই দুঃসময়ে রামানাথ ভাদুড়ী প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে বন্ধু প্রাণনাথকে সহযোগিতা করেন। দিনাজপুরের জমিদার প্রাণনাথ পরবর্তীসময়ে বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হাটিকুমরুল গ্রামে জমিদার রামানাথ ভাদুড়ীর বাড়ির পাশে দিনাজপুরের কান্ত জিউ মন্দিরের আদলে একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির নির্মাণ করে দেন।

১৩.২৫ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট বর্গাকার মন্দিরটি একটি উঁচু বেদির উপর নির্মাণ করা হয়েছে।

ইট, চুন, সুরকি, গাবের কশ ও কয়েক রকম মসল্লার সংমিশ্রণে দেশীয় রীতিতে দুই দশক ধরে প্রাচীন মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। তিনতলা বিশিষ্ট বর্গাকার মন্দিরটির দেয়াল, খিলান ও পিলারে পোড়ামাটির চিত্রফলকে সনাতন ধর্মের দেবদেবীদের ছবি স্থান পেয়েছে। মন্দিরটিতে চারদিক দিয়ে প্রবেশ করা যায়। মন্দিরের নিচতলার প্রতিপাশে ৫টি করে মোট ২০টি উন্মুক্ত দরজা রয়েছে। চারপাশে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। এই বারান্দা দিয়ে মন্দিরের চতুর্দিকে ঘুরে আসা যায়। বারান্দা পার হয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে ঢোকার জন্য চারপাশে আরো ৫টি করে উন্মুক্ত দরজা রয়েছে। ভেতরের এই দরজাগুলোও খিলানযুক্ত। মন্দিরের নিচতলার ভিতরে অনেক ছোটো ছোটো কক্ষ বা প্রকষ্ঠ রয়েছে। নিচতলার উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে মন্দিরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। দ্বিতীয় তলায়ও অনেক ছোটো ছোটো কক্ষ বা প্রকোষ্ঠ রয়েছে। দ্বিতীয় তলায়ও বর্গাকার স্থাপনায় চারদিকে ৩টি করে খিলানযুক্ত উন্মুক্ত দরজা রয়েছে। দ্বিতীয় তলার বারান্দাটির উম্মুক্ত কোনো ছাদ নেই। বারান্দার চারকোণে ৪টি উঁচু চূড়া রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে চূড়া ৪টি ভেঙে গেছে।

নবরত্ন মন্দিরটির তৃতীয় তলায় খোলা বারান্দার চারকোণে ৪টি চূড়ার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। তিন তলায়ও কয়েকটি প্রকষ্ঠ রয়েছে। তিন তলার ছাদের উপর শীর্ষদেশে বড়ো আকারের একটি চূড়া ছিল। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ভূমিকম্পে শীর্ষদেশের চূড়াসহ মন্দিরের সব চূড়া ভেঙে যায়। মন্দিরের এই চূড়াগুলোকে রত্ন হিসেবে গণ্য করা হতো।

প্রাচীন এই মন্দিরটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার চারকোণে ৪টি করে ৮টি চূড়া এবং মন্দিরের শীর্ষদেশে একটি চূড়াসহ মোট ৯টি চূড়া থাকায় মন্দিরটির নামকরণ করা হয় নয়রত্ন মন্দির। ধারণা করা হয় নয়রত্ন থেকেই কালক্রমে নাম হয়ে যায় নবরত্ন মন্দির।

নবরত্ন মন্দিরটির চারদিকে সীমানা বেষ্টনী রয়েছে। এর উত্তর দিকে প্রবেশ ফটক রয়েছে। সীমানা বেষ্টনীর ভেতরে রয়েছে একটি শিবমঠ ও একটি জোড়বাংলা মন্দির। দেশিয় স্থাপত্যরীতি ও নান্দনিক নির্মাণশৈলী জোড়বাংলা মন্দিরটিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। বেষ্টনীর বাইরে নবরত্ন মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম দিকে আরো একটি শিবমন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের পূর্ব-পশ্চিম পাশে বড়ো দু’টি দিঘি রয়েছে। মন্দির ও দিঘির পশ্চিম পাশে রামানাথ ভাদুড়ীর বাড়ি ছিল। কালের আবর্তে জমিদার বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। মাটি খুঁড়লে এখনো প্রাচীন ইট, কাঠসহ ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। নবরত্ন মন্দিরের বেষ্টনীর বাইরে জমিদার রামানাথ ভাদুড়ীর বাড়ির জায়গাসহ অনেক জায়গা বেদখল হয়ে গিয়েছে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়েছে। এখন দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলাসহ মন্দিরের ৯টি চূড়া পুনর্নির্মাণ করে পোড়ামাটির চিত্রফলক স্থাপন করা হয়েছে। সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার পর মন্দিরটি আদি রূপ ফিরে পেয়েছে ।

দেশের মধ্যে যে ক’টি নবরত্ন মন্দির রয়েছে তার মধ্যে হাটিকুমরুল মন্দিরটি সবচেয়ে বড়ো ও ভালো অবস্থায় রয়েছে। দেশ বিদেশের অনেক দর্শনার্থী প্রতিদিন মন্দিরটি দেখার জন্য এখানে আসেন। সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত তিনশত বছর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মন্দরটি বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা