নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া নামক স্থানে শীতালক্ষ্যা নদীর তীরে জমিদারবাড়িটি অবস্থিত। নাটোর রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ রামরতন ব্যানার্জি উনিশ শতকের শেষভাগে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হন। সেসময়ে তিনি রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ও আশপাশ এলাকায় অনেক জমি ক্রয় করেন। এরপর তিনি ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের পর ১৮৮৯ খ্রিষ্টব্দে মুড়াপাড়ায় শীতালক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে সাড়ে ষোল একর জমির উপর একটি বিশাল বাড়ি নির্মাণ করেন। ভারতের মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্রাসাদের অনুকরণে ইন্দ-ইউরোপীয় স্থাপত্য নকশায় মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করেন। মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িটিতে একাধিক শয়নকক্ষ, বৈঠকখানা, অতিথি কক্ষ, আঁতুরঘর, দাসদাসি, পাইক-পেয়াদাদের থাকার ঘরসহ ৯০টি কক্ষ রয়েছে। পশ্চিম দিকে মুখ করা জমিদারবাড়িটির সম্মুখভাগের দেয়াল, পিলার ও কার্নিশগুলো নকশাখঁচিত। ভবনের মাঝখানে প্রবেশদ্বারের উপরে স্থাপিত সিংহমূর্তি বাড়িটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিশাল এই বাড়িটির সম্মুখভাগের ভবনটিতে উত্তর-দক্ষিণ মুখি টানা বারান্দা রয়েছে। নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠার কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ভবনের সামনে ও পেছনে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দোতলা দিয়ে পেছনের অন্দরমহলে প্রবেশ করার পথ বর্তমানে বন্ধ। অন্দরমহল ও সামনের প্রাসাদ ভবনের মাঝখানে রয়েছে পূজামণ্ডপ। পূজামণ্ডপটির দেয়াল ও পিলার নকশাখঁচিত। জমিদার রামরতন ব্যানার্জি খুবই সৌখিন ও কৌশলি ছিলেন। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তার মৃত্যুর পর পালকপুত্র প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জি মুড়াপাড়া জমিদারির স্বত্বাধিকারী হন। তিনি জমিদারবাড়ির অন্দরমহলের কিছু অংশ বর্ধিত করেন। জমিদার প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জির মৃত্যুর পর তার পুত্র বিজয়চন্দ্র ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়চন্দ্র ব্যানার্জি মৃত্যুবরণ করলে জমিদারির উত্তারাধিকার নিয়ে তার দুই ছেলে জগদীশচন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষচন্দ্র ব্যানার্জির মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়। বাড়ির সম্প্রসারণ নিয়েও তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। পরিশেষে তাদের মধ্যে মীমাংসা হয়। দুইভাই মিলে মূল প্রাসাদ ভবনের পেছনে একতলা অন্দরমহলকে দোতলায় রূপান্তরিত করে আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করতে থাকেন।

মুড়াপাড়া জমিদারগণ জমিদারির পাশাপাশি দাদন ব্যবসা করতেন। রূপগঞ্জ মুড়াপাড়ার অধিকাংশ প্রজা পেশায় তাঁতি ও কৃষক ছিল। তারা প্রয়োজনে জমিদারদের কাছ থেকে দাদন নিতো। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, গরিব তাঁতি ও কৃষকেরা অনেক সময় দাদন পরিশোধে ব্যর্থ হতো। তখন জমিদার জগদীশচন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষচন্দ্র ব্যানার্জি দাদন পরিশোধে ব্যর্থ প্রজাদের উপর নানারকম নির্যাতন করতেন। কখনো কখনো বসতভিটা ও জায়গা-জমি কেড়ে নিতেন। তবে, জগদীশচন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষচন্দ্র ব্যানার্জির পিতা বিজয়চন্দ্র ব্যানার্জি এবং পিতামহ প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জি প্রজাদরদি ছিলেন। তারা দাদন পরিশোধে অক্ষম প্রজাদের কোনো প্রকার শাস্তি দিতেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র প্রজাদের দাদন মওকুফ করে দিতেন।
মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশের দিঘি ও শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝখানে বিশাল খোলা মাঠ রয়েছে। মাঠের উত্তর পাশে বৈচিত্র্যময় স্থাপত্য নকশায় দু’টি শ্মশান সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। অনেকে এ স্থাপত্যরীতি ও সৌন্দর্য দেখে মন্দির বলে মত প্রকাশ করেন। দিঘিটির উত্তর পাশে রয়েছে নানারকম বৃক্ষের সমাহার। জমিদার বাড়ির পশ্চিম পাশে ছিল প্রধান প্রবেশদ্বার ও চারপাশে ছিল বেষ্টনী দেয়াল। বেষ্টনী দেয়াল ও প্রধান প্রবেশদ্বার এখন আর নেই।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের অবসান হওয়ার পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন অন্য হিন্দু জমিদারদের মতো জগদীশচন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষচন্দ্র ব্যানার্জি সপরিবারে পূর্ব-বাংলা ত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর অনেকদিন পর্যন্ত মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাড়িটিতে একটি হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীসময়ে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র অনত্র স্থানান্তর করা হলে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে সেখানে একটি বিদ্যালয়ের স্থাপন করা হয়। এরপর বিদ্যালয়টিকে কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িটিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে।
লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা