আবৃত্তির মূল শক্তি ভাবনা ও বোধ : সৈয়দ ফয়সল আহমদ

25 Jun 2026, 02:04 PM আবৃত্তি শেয়ার:
আবৃত্তির মূল শক্তি ভাবনা ও বোধ : সৈয়দ ফয়সল আহমদ


বাংলাদেশের আবৃত্তি অঙ্গনের পরিচিত মুখ সৈয়দ ফয়সল আহমদ। চা-বাগানের নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের আবৃত্তিজীবন শুরু হয়েছিল একেবারেই অনানুষ্ঠানিকভাবে। বন্ধুদের উৎসাহ, কবিতার প্রতি ভালোবাসা আর পরবর্তীসময়ে দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন নিবেদিত আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে। আবৃত্তির পাশাপাশি নাটক, বেতার উপস্থাপনা, সংবাদ পাঠ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। বর্তমানে তিনি ‘শ্রুতিঘর’ আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং মিরপুরে ‘ইচ্ছামতী’ নামে শিশুদের একটি আবৃত্তি বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। আবৃত্তিকে তিনি শুধু কণ্ঠস্বরের শিল্প হিসেবে দেখেন না; বরং কবিতাকে বুঝে, অনুধাবন করে এবং চিন্তার গভীরে গিয়ে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক সৃজনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেন। সৈয়দ ফয়সল আহমদকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


আবৃত্তির পথে যাত্রা

সৈয়দ ফয়সল আহমদ জানান, ছেলেবেলায় তিনি নিজে আবৃত্তি করতেন না, তবে বেতারে নাটক ও কবিতা আবৃত্তি শুনতেন। সেই শ্রবণ-অভিজ্ঞতাই পরবর্তীসময়ে তাকে কবিতার জগতে টেনে আনে। সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে মিলে আবৃত্তি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে তার আবৃত্তি-জীবনের সূচনা।

তিনি বলেন, “১৯৯১ সাল থেকে এমসি কলেজে মনিকাঞ্চন মিলা, কুহেলী, মাধবী, আবুল খায়ের, ইমন এমন অনেক বন্ধুদের সাথে মূলত কবিতার সঙ্গে আমার পথচলা শুরু। বন্ধুদের উৎসাহ এবং শ্রোতাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই আমাকে আবৃত্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলে।”

১৯৯৩ সালে তিনি সাংগঠনিক আবৃত্তিচর্চায় সিলেটের ‘উর্বশী আবৃত্তি পরিষদ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। একবছর পর ‘কথাকলি সিলেট’ নাট্যসংগঠনে যুক্ত হয়ে নাটক, আবৃত্তি ও সংগীত- তিন ক্ষেত্রেই কাজ শুরু করেন। অভিনয় করেন ‘ক্ষত বিক্ষত’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’, ‘অন্তরীণ’, ‘ঘর লোপাট’, ‘দর্পণ’সহ আরো কয়েকটি নাটকে। ‘কথাকলি সিলেট’-এ আবৃত্তি প্রযোজনার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রে অনুষ্ঠান ঘোষণা, বেতার উপস্থাপনা এবং সংবাদ পাঠের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

২০০৩ সালে ঢাকায় আসার পর কিছুদিন আবৃত্তি থেকে দূরে থাকলেও চাকরিসূত্রে চট্টগ্রামে অবস্থানকালে ‘উত্তরাধিকার’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছর সাম্পান নাইয়া, প্রেমপূরাণসহ কয়েকটি নাটকে কাজ করেন।

পরে ঢাকায় ফিরে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দে ‘আনন্দন’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন এবং ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে বন্ধুদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আবৃত্তি সংগঠন ‘শ্রুতিঘর’, যার সঙ্গে তিনি এখনো সম্পৃক্ত।


প্রথম আবৃত্তি ও অনুপ্রেরণা

নিজের প্রথম আবৃত্তির স্মৃতি মনে করতে গিয়ে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতাটিই ছিল তার প্রথম আবৃত্তি। সে সময় আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তফার ক্যাসেট শুনে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’ও তিনি আবৃত্তি করতেন।

তিনি জানান, তখনকার সময়ে আজকের মতো অনলাইনে কবিতা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। পরিবারের বইয়ের সংগ্রহ এবং পাঠ্যবই-ই ছিল কবিতাচর্চার প্রধান মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’, নজরুলের ‘সঞ্চিতা’ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাই ছিল তার সাহিত্যজগতের প্রথম পাঠ।


অনুকরণ-অনুসরণ থেকে নিজস্বতার সন্ধানে

আবৃত্তির দর্শন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সৈয়দ ফয়সল আহমদ বিশেষভাবে স্মরণ করেন প্রয়াত আবৃত্তিশিল্পী ও নির্দেশক হাসান আরিফকে।

তার ভাষায়, “একসময় মনে হতো কোনো বিখ্যাত আবৃত্তিশিল্পীর কণ্ঠস্বর অনুকরণ করতে পারলেই ভালো আবৃত্তি হয়। কিন্তু হাসান আরিফের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, শিল্পের জন্ম কণ্ঠে নয়, মস্তিষ্কে। কবিতাকে বুঝতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়, তারপর তা নিজের অনুভব ও উপলব্ধি দিয়ে প্রকাশ করতে হয়।”

তিনি মনে করেন, আবৃত্তি মূলত একটি ত্রিমাত্রিক শিল্প। প্রথমত কবির সঙ্গে শিল্পীর বোঝাপড়া, দ্বিতীয়ত কবিতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করা এবং তৃতীয়ত সেই অনুভব শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।


কণ্ঠস্বর, আবেগ ও আবৃত্তি

আবৃত্তিতে কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, “কণ্ঠস্বর হচ্ছে ভাব প্রকাশের বাহন। আপনি কবিতাকে যতই বুঝুন-না-কেন, সেই উপলব্ধি শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে হলে কণ্ঠস্বরের উপযুক্ত ব্যবহার জানতে হবে।” তবে, তিনি এও মনে করেন যে, আবেগ কোনো আলাদা বিষয় নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ, দুঃখ, প্রেম, বিরহ, আনন্দ কিংবা বেদনার অভিজ্ঞতাই স্বাভাবিকভাবে আবৃত্তিতে আবেগের জন্ম দেয়।

তিনি বলেন, “কবিতা যদি আমাকে স্পর্শ করে, তবে সেই স্পর্শের জায়গা থেকেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আবেগ আসবে।”


কোন ধরনের কবিতা বেশি টানে

প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ কিংবা রাজনৈতিক কবিতা- কোন ধরনের কবিতা পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব ধরনের কবিতাই তার প্রিয়। তবে, সমাজ, গণমানুষ এবং সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে যে কবিতাগুলো লেখা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, কবিতা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; সমাজ-বাস্তবতার প্রতিফলনও বটে।


স্মরণীয় পরিবেশনা

দীর্ঘ আবৃত্তিজীবনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সৈয়দ ফয়সল আহমদ। হাসান আরিফের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ‘শ্রুতিঘর’ ও ‘ব্যতিক্রম’ আয়োজিত ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিবেশিত আবৃত্তি প্রযোজনাকে তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থিত সেই প্রযোজনাগুলো দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

‘হরবোলা’র আমন্ত্রণে জাতীয় জাদুঘরে, ‘মুক্তবাক’র আমন্ত্রণে ‘ছায়ানট মিলনায়তনে’ ‘স্বপ্নঘুড়ি দিলাম ছাড়ি অনুষ্ঠানে ‘অনুসূর্যের গান’ পর্বে আবৃত্তি পরেবেশনা, ‘প্রগতি লেখক সংঘ মৈলভীবাজার’-এর আমন্ত্রণে দেড় ঘণ্টাব্যাপী একক আবৃত্তি পরেবেশনা, ‘মুক্তবাক’র আয়োজনে নজরুলের জীবনভিত্তিক কাব্যনাট্য ‘আয় দুখু আয়’ এবং সম্প্রতি রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার আয়োজনে রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ গীতিনৃত্যনাট্যে রাজার অভিনয় স্মরণীয় পরিবেশনার মধ্যে অন্যতম।

এছাড়া জীবনানন্দ দাশের ‘অন্ধকার’ কবিতার তার একক আবৃত্তিও বিশেষ প্রশংসিত হয়। ইউটিউবে প্রকাশিত সেই পরিবেশনা অল্প সময়ে দেড় লাখেরও বেশি দর্শক শুনেছেন।

তিনি বলেন, “মানুষ যখন বলে কবিতাটি তাকে স্পর্শ করেছে, তখন মনে হয় আমার কাজ সার্থক হয়েছে। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।”


আবৃত্তি অঙ্গনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের আবৃত্তি অঙ্গনের অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে না-পারার বিষয়টি। তার মতে, একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন মূলত সিভিল সোসাইটির অংশ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব শিল্পচর্চাকে প্রভাবিত করে এবং শিল্পীরা স্বাধীনভাবে সত্য উচ্চারণের সুযোগ হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তিনি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, আবৃত্তিশিল্পীদের দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও মানসম্মত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।


ভবিষ্যৎ-স্বপ্ন

আবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে না-থাকলেও আবৃত্তি নিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘ইচ্ছামতী’ আবৃত্তি শিক্ষায়তনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কবিতা ও আবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চান। অবসরজীবনে তিনি আরো বেশি সময় দেবেন কবিতা, দর্শন এবং আবৃত্তির গবেষণায়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মতো বাংলাদেশেও আবৃত্তিকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল শিল্পভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি।


ফয়সলসমগ্র

সৈয়দ ফয়সল আহমদের জন্ম সিলেট অঞ্চলের একটি চা-বাগানে। তার মা রাবেয়া বেগম চৌধুরী ঘরকন্না সামলাতেন আর বাবা সৈয়দ আলী আফসার ছিলেন মৌলভীবাজারের ডানকান ব্রাদার্সের একটি চা-বাগানের দায়িত্বে। শৈশবের একটি বড়ো অংশ কেটেছে বিদ্যুৎহীন চা-বাগানের নির্মল-শান্ত পরিবেশে। তখন ছিল সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ। যেখানে বই ও বেতারই ছিল জ্ঞান ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।

সুনামগঞ্জের ছাতক পেপার মিলস উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকশিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীসময়ে হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্টে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবনে তিনি বর্তমানে ‘ডট কন্সাল্টিং’ নামে একটি কন্সাল্টেন্সি ফার্মের ফাউন্ডার ও সিইও হিসাবে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যাসন্তানের জনক। তার মেয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

আবৃত্তি, সাহিত্য ও শিল্পকলাচর্চার প্রতি গভীর নিষ্ঠা নিয়ে তিনি নিরলস কাজ করে চলেছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে কবিতা ও শিল্পবোধ পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে।