আরেফিন বাদল-এর ৭৯তম জন্মদিন আজ

25 Sep 2026, 12:46 AM জন্মদিন শেয়ার:
আরেফিন বাদল-এর ৭৯তম জন্মদিন আজ

কথাসাহিত্যিক আরেফিন বাদলের ৭৯তম জন্মদিন আজ। বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় ধরে বহুমুখী অবদান রেখে চলেছেন তিনি। ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে আজ পর্যন্ত সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীল নানা কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব।

ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, গবেষণা ও প্রবন্ধ—সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ও গবেষণাধর্মী বই পাঠকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৯৪ সালে আরেফিন বাদলের প্রযোজনায় নির্মিত হয় দেশের প্রথম টিভি প্যাকেজ নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’। নাটকটি তাঁর সৃজনশীল কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান 'সাইট অ্যান্ড সাউন্ড' [১৯৯৪]-এর ব্যানারে প্রায় দুই ডজন নাটক, ধারাবাহিক নাটক, ম্যাগাজিন, প্রামাণ্যচিত্রের রচয়িতা ও নির্মাতাও তিনি।

সম্পাদক হিসেবেও তাঁর রয়েছে দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত পাক্ষিক ‘তারকালোক’, মাসিক ‘কিশোর তারকালোক’, সাপ্তাহিক ‘আগামী’ এবং মাসিক ‘তারকালোক ডাইজেস্ট’ একসময় পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৯৭ সালে দেশে প্রথম এসব প্রকাশনায় কম্পিউটারের মাধ্যমে বাংলা বর্ণমালা বা ডিটিপির (DTP) বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করেন তিনি।

কর্মজীবনে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থায় সাংবাদিকতা করেছেন আরেফিন বাদল। সরকারি চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাক্ষিক ‘প্রতিরোধ’ এবং বাংলাদেশ স্কাউটের মুখপত্র মাসিক ‘অগ্রদূত’-এর সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।

আরেফিন বাদলের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘প্রসবোন্মুখ যন্ত্রণাবিদ্ধ’ [১৯৭৮], ‘আগামীকাল ভালোবাসার’ [১৯৮০], ‘Short Stories’ [১৯৮১], ‘অন্তুর বর সাজা’ [১৯৯০], ‘নিত্যদিন কালগোনা’ [২০০৪], ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ [২০১০] এবং ‘গল্প সমগ্র’ [২০১৮]।

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস— ‘নিসর্গের সন্তানেরা’ [১৯৮১], ‘ইমুবাবু’ [১৯৯৮], ‘ঐ আসে আমিরালী’ [১৯৯৯], ‘সারা’র ব্রীজ’ [১৯৯৯], ‘হাকিম উদ্দিন তরফদার’ [২০০১], ‘অতঃপর একটি স্যুটকেস’ [২০১৭], ‘উপন্যাস সমগ্র’ [২০১৮], ‘এবং মাতৃত্ব’ [২০১৯] ও ‘বিশ শব্দের গল্প’ [২০২০]। 

এছাড়া কিশোর সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘অন্তুর বর সাজা’।

কথাসাহিত্যের পাশাপাশি গবেষণা ও অন্যান্য বিষয়েও তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। এর মধ্যে  ‘ঐতিহাসিক প্রেমপত্র’ [১৯৭৬], ‘মওলানা ভাসানী’ [১৯৭৭], ‘রবীন্দ্রনাথের জীবনে নারী’ [১৯৯৯], ‘চাষী-মজুরের মওলানা ভাসানী’ [২০২২], ‘বাংলাদেশ-ভারত কনফেডারেশন: একাত্তরে ইন্দিরাকে ভাসানীর চিঠি’ [২০২৩], 'Rabindranath's Fascinating Beau' (translated by Sazzad Haider) [২০২৩], ‘মুক্তিযুদ্ধ একাত্তর ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি: ভাসানীর  কনফেডারেশন থিউরি’ [২০২৫], ‘তারকালোক আমি এবং আমরা’ [২০২৫] এবং ‘ভাসানীবাদ’ [২০২৬]।

নাট্যকার হিসেবেও আরেফিন বাদলের রয়েছে পরিচিতি। তাঁর উল্লেখযোগ্য টিভি নাটক ‘কাছের মানুষ কাঁদে’ [১৯৮৯], ‘ঐ আসে আমিরালী’ [১৯৮৯], ‘ইমুবাবু’ (১৯৯৭), ‘আপন অস্তিত্বে’ [২০০৭] এবং ‘নেতা ঘেমে যাচ্ছেন’ [২০০৮] সহ আরও বেশকিছু নাটক।

আরেফিন বাদলের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম নিয়ে ২০২০ সালে টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগার থেকে সবুজ মাহমুদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার ‘আরেফিন বাদল সংখ্যা : যমুনা’। বিভিন্ন গুণীজনের লেখা সমৃদ্ধ এই গ্রন্থে তাঁর জীবন, কর্ম এবং সময়ের নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সমকালীন বিষয় উঠে এসেছে। ফলে বইটিকে গত পাঁচ-ছয় দশকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন আরেফিন বাদল। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার ও সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর বহুমুখী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে ‘ভাসানী পদক’ [১৯৮৭], ‘ময়মনসিংহ লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পুরস্কার’ [২০০৬], বাচসাসের  সাংবাদিকতায় ‘বিশেষ সম্মাননা’ [২০১২], চ্যানেল আই ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’ [২০১৪], ‘বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার' [২০১৪], ‘টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কার’ [২০১৬], ‘আনন্দ আলো সম্মাননা’ [২০১৬], ভাসানী পরিষদের ‘বিশেষ সম্মাননা পদক’ [২০২২], ‘গুণীজন সম্মাননা’ [২০২৩] এবং ‘আজাদ প্রোডাক্ট অ্যাওয়ার্ড—মাই ড্যাড ওয়ান্ডারফুল’ [২০২৩-২৪]।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে তিনি ভাসানী গবেষণা প্রকল্পের প্রকল্প প্রধান। তিনি বাচসাস ও বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য।

আরেফিন বাদল ১৯৪৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পোড়াবাড়ি গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

সাহিত্য, সাংবাদিকতা, গবেষণা, নাটক ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের নিরলস কাজের মধ্য দিয়ে আরেফিন বাদল নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর ৭৯তম জন্মদিনে আনন্দভুবনের পক্ষ থেকে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। পরিশেষে তাঁর সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও সৃজনশীল জীবনের ধারাবাহিকতা কামনা করি।

লেখা: শহিদুল ইসলাম এমেল