দুঃসময়ের চালচিত্র একজন রিফাত চৌধুরীর গল্প

30 Sep 2026, 02:27 PM আকাশলীনা শেয়ার:
দুঃসময়ের চালচিত্র একজন রিফাত চৌধুরীর গল্প


সময়টা বোধহয় অবক্ষয়ের। নিজের স্বার্থ ছাড়া আমরা এখন আর কিছুই বুঝি না। একদিন যিনি পরম বন্ধু ছিলেন একসময় তিনি যখন বিপদগ্রস্ত, তখন আমরা যেন তাকে আর চিনতেই চাই না। কিংবা দায়সারা দায়িত্ব পালন করে হাত গুটিয়ে নিই। আকাশলীনায় আমরা সাধারণত কোনো শিল্পীর প্রতিকৃতি আঁকবার চেষ্টা করি শব্দের তুলিতে। এবারে বলছি এক ভিন্ন গল্প, একজন অভিনেয়শিল্পী ও কবির নিদারুণ কষ্টের কাহিনি। এতে হয়ত কবি ও অভিনয়শিল্পী রিফাত চৌধুরীর কিছু-যাবে আসবে না কিন্তু আমরা দায় এড়ানোর চেষ্টা করতে পারবো। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...


কবি ও অভিনেতা দুই মাধ্যমেই পরিচিত রিফাত চৌধুরী। পর্দার ঝলমলে আলোর পেছনে থাকে অনেক লুকানো গল্প, যেখানে কখনো কখনো ঢাকা পড়ে যায় অবমূল্যায়ন, আর্থিক অনটন আর চরম নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা। আমাদের নাট্যাঙ্গনের জ্যেষ্ঠ গুণী ব্যক্তিত্ব, কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরী তেমনই এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি এখন। যিনি প্রায় ছয় শতাধিক খণ্ডনাটক, টেলিফিল্ম ও ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে তিন দশকের বেশি সময় দর্শকদের বিনোদন দিয়েছেন। কখনো হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, কখনো আবার ভাবিয়েছেনও। গুণী এই শিল্পী-কবি এখন অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অর্থাভাব, চিকিৎসাবিহীন প্রহর আর শোবিজের সহকর্মীদের চরম উদাসীনতা তাকে এক গভীর কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

রিফাত চৌধুরী মূলত নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও অভিনয়ে তার দক্ষতা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে। নাটকে তাকে প্রায়ই একজন হাস্যরসাত্মক, স্পষ্টবাদী বা কিছুটা আত্মভোলা প্রবীণ মানুষের চরিত্রে দেখা যেত, কিন্তু সেই হাসিমুখের মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনে জমে ছিল নিদারুণ একাকিত্ব ও কষ্টের পাহাড়।

তিনি কেবল শারীরিক ব্যাধিতে ভুগছেন না, ভুগছেন এক চরম অবমূল্যায়নেও। শত শত নাটকের স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করা এই শিল্পী এখন হাসপাতালের নির্জন কেবিনে বসে ভাবছেন জীবনের অপ্রাপ্তির হিসাব।

শিল্পী যখন মঞ্চে কিংবা পর্দায় তার অভিনয়-নৈপুণ্য দিয়ে আমাদের আনন্দিত করেন তখন আমরা বাহবা দিই। ভাবটা এমন যে, কাছে পেলে পিঠ চাপড়ে বলতাম, আহ্ বেশ বেশ। কিন্তু একজন শিল্পী যখন অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পান, তখন আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই।

শারীরিক অসুস্থতার তীব্র অবনতি ঘটলে সম্প্রতি একা একাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান রিফাত চৌধুরী। ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুইদিন কোনো বেড পাননি তিনি, কাটাতে হয়েছিল হাসপাতালের সাধারণ ফ্লোরেই। বারান্দা ও ফ্লোরের কোলাহলে যখন জীবনের সাথে লড়াই করছিলেন, তখন আর্থিক অসচ্ছলতা তার সুচিকিৎসার পথকে আরো কঠিন করে তুলেছে।

সংবাদ মাধ্যমে তার এই দুর্দশার চিত্র উঠে আসার পর অনেকে নড়েচড়ে বসেছেন। সেইসাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে মেডিসিন ইউনিট ৩-এর ১০ম তলার ১০৩ নম্বর কেবিনে স্থানান্তরিত করেছে। বর্তমানে সেখানে তিনি বেড রেস্টে আছেন এবং মূল পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা হচ্ছে। তবে, কেবিন মিললেও ওষুধ ও টেস্টের পেছনে খরচ সামলানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তার একেবারেই নেই। অথচ অনেক অভিনেতাই আছেন, যাদের সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তিনি, সেই সহকর্মীর অনেকে একদিনে সম্মানী হিসেবে ৩ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন। তাদের দুয়েকজন পাশে থাকলে রিফাত চৌধুরীর মতো গুণী এই শিল্পীর চিকিৎসা হয় সুন্দরভাবে।

গণমাধ্যমের সামনে রিফাত চৌধুরীর কণ্ঠে ঝরে পড়েছে বিনোদন অঙ্গনের চরম অনৈক্যের কষ্ট। বর্তমান সময়ে শোবিজের বাজার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে নামি অনেক অভিনেতা একদিনের সিডিউলের জন্যই প্রায় ৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি হাঁকান। অথচ তাদের একজন সহকর্মী টাকার অভাবে চিকিৎসা শুরু করতে পারছেন না।

যেসব শিল্পী-কলাকুশলীদের সঙ্গে তার একসময় চমৎকার বোঝাপড়া ছিল, যাদের সঙ্গে একই সেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেছেন, তাদের কারোরই আজ তার দিকে ফিরে তাকানোর মতো সময় নেই। একাকিত্ব আর প্রিয় মানুষদের উদাসীনতায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শোবিজের চকচকে পর্দার পেছনের এই মেকি ভালোবাসা কেবলই নাটকের স্ক্রিপ্ট, বাস্তব জীবনে যার অস্তিত্ব খুবই কম।

গণমাধ্যমে খবরটি প্রচারিত হওয়ার পর বেশ কয়েকজন সহকর্মী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সাধারণ ভক্ত তার খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন এবং অনেকেই তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এরমধ্যে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিফাত চৌধুরীর শারীরিক ও আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরে সর্বসাধারণ ও শিল্পীদের প্রতি তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

যেহেতু রিফাত চৌধুরীর নিজস্ব কোনো ব্যাঙ্ক বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট নেই, তাই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সুচিকিৎসার খরচ জোগাতে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ নিয়েছেন। আশার কথা হলো, অভিনয়শিল্পী সংঘসহ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকেও সহায়তার ইঙ্গিত এসেছে।


এক নজরে রিফাত চৌধুরী

ক্যারিয়ার ও সাহিত্যের দ্বৈত পরিচয়

অভিনয় এবং কবিতা— এই দু’টি মাধ্যমকে সমান্তরালভাবে ধারণ করেছেন রিফাত চৌধুরী। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে, ফোর টুয়েন্টি, হাউজফুল, সিক্সটি নাইন, পাটিগণিত, ক্যারাম, এইম ইন লাইফ, বাই সাইকেল, মুড়ির টিন, মাকড়সা প্রভৃতি।


কবিতা ও সাহিত্য

গত শতকের আটের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলিঙ্গনের নাম’। এ পর্যন্ত তার অন্তত ২৯টি কাব্যগ্রন্থ ও সাহিত্যের বই প্রকাশিত হয়।


এক জীবন, দু’টি সত্তা

রিফাত চৌধুরীর মতো একজন গুণী কবি ও অভিনয়শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখা কেবল তার পরিবারের একার দায়িত্ব নয় ; বরং তা আমাদের পুরো সংস্কৃতি অঙ্গন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দরকার কেবল মুখে আশ্বাস দেওয়া নয়, দ্রুততার সাথে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে তাকে পুনরায় স্বাভাবিক জীবন ও সাহিত্য-অভিনয়ের অঙ্গনে ফিরিয়ে আনা।

আনন্দভুবন এই গুণী মানুষের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে।