দাবা-কুইন রানী হামিদ
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রবাদপ্রতীম যেসব নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উচ্চারিত হয়, রানী হামিদ তাদের অন্যতম। দীর্ঘ কয়েক দশকের বর্ণিল ক্যারিয়ারে তিনি শুধু জাতীয়পর্যায়েই সাফল্য অর্জন করেননি, বাংলাদেশেকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করেছেন। অধ্যবসায়, মানসিক দৃঢ়তা, কৌশল ও খেলার প্রতি অদম্য ভালোবাসা তাকে পরিণত করেছে দেশের দাবার এক অনন্য প্রতীকে।
রানী হামিদের জন্ম ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। পরবর্তীসময়ে দাবার প্রতি তৈরি হয় গভীর ভালোবাসা। পরিবারের উৎসাহ ও নিজের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে দাবার জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
দাবার বোর্ডে সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন গভীর চিন্তা, ধৈর্য, কৌশল ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। রানী হামিদ এসব গুণকে নিজের শক্তিতে পরিণত করেন। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্রুতই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন এবং বাংলাদেশের নারী দাবার অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
রানী হামিদের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড়ো বৈশিষ্ট্য তার দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য। তিনি বহুবার জাতীয় মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। বিশেষ করে কমনওয়েলথ দাবা প্রতিযোগিতায় তার সাফল্য বাংলাদেশের দাবাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তার খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য ও কৌশল। প্রতিপক্ষের চাল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণ চালানো ছিল তার শক্তির জায়গা। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে তরুণ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রেখেছে।
রানী হামিদের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো বয়সকে উপেক্ষা করে দাবার সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পৃক্ততা। বয়স বাড়লেও তিনি প্রতিযোগিতামূলক দাবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। বরং নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রমাণ করেছেন— ইচ্ছাশক্তি, অভিজ্ঞতা ও খেলার প্রতি ভালোবাসা থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়।
নারী ক্রীড়াঙ্গনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। এমন একসময়ে তিনি দাবায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন, যখন নারীদের খেলাধুলায় অংশ গ্রহণের সুযোগ আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। তার সাফল্য পরবর্তীপ্রজন্মের অসংখ্য নারীকে দাবার প্রতি আগ্রহী ও উৎসাহিত করেছে।
রানী হামিদের অর্জন শুধু ট্রফি বা শিরোপার হিসাব নয়। তিনি বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। তার জীবন অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন পূরণের অনন্য উদাহরণ।
দাবার বোর্ডে ‘রানী’ যেমন শক্তিশালী ঘুঁটি, বাংলাদেশের দাবায় রানী হামিদের অবস্থানও তেমনি উজ্জ্বল। নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুরা যখন আন্তর্জাতিক সাফল্যের স্বপ্ন দেখেন, তাদের সামনে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন এই কিংবদন্তি দাবাড়ুু। বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে তাই রানী হামিদ শুধু একজন খেলোয়াড়ই নন— তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ঐতিহ্য ও অনুপ্রেরণার নাম।

ব্যাডমিন্টনের আইকন
কামরুন নাহার ডানা
বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে কামরুন নাহার ডানা এক উজ্জ্বল নাম। ব্যাডমিন্টন কোর্টে অসাধারণ সাফল্যের পাশাপাশি দেশের নারী ক্রীড়ার বিকাশে তার ভূমিকা তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে সংগঠক হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন।
গত শতকের সাতের দশকে যখন মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ আজকের মতো স্বাভাবিক ছিল না, তখনই ব্যাডমিন্টনকে ভালোবেসে ক্রীড়াঙ্গনে পা রাখেন ডানা। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ব্যাডমিন্টন খেলতে শুরু করেন। সে সময় মেয়েদের খেলাধুলায় সামাজিক বাধা ছিল অনেক বেশি। পরিবার থেকে সহযোগিতা পেলেও সমাজের একটি অংশ নারী খেলোয়াড়দের ভালো চোখে দেখত না। সেই প্রতিকূল পরিবেশেই নিজের প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
ব্যাডমিন্টনে তার সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। ওই বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে মিশ্র দ্বৈতে মনোয়ার উল আলম বাবুলের সঙ্গে জুটি গড়ে প্রথম জাতীয় শিরোপা জেতেন তিনি। এরপর প্রায় একদশক ধরে জাতীয়পর্যায়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি মোট ১৩টি জাতীয় শিরোপা জিতেছেন— নারী এককে তিনবার, নারী দ্বৈতে চারবার এবং মিশ্র দ্বৈতে ছয়বার।
তার খেলোয়াড়ি জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘ট্রিপল ক্রাউন’ অর্জন। একই জাতীয় আসরে নারী একক, নারী দ্বৈত ও মিশ্র দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্ব তিনি তিনবার অর্জন করেন। ফলে বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টনে তিনি শুধু একজন সফল খেলোয়াড় নন, বরং একটি যুগের প্রতিনিধিত্বকারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তবে, ডানার অবদান শুধু ব্যাডমিন্টন কোর্টেই সীমাবদ্ধ নয়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি নারী ক্রীড়ার উন্নয়নে সংগঠক হিসেবে সক্রিয় হন। বিশেষ করে নারী ফুটবলের শুরুর দিকের কঠিন সময়ে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩-’০৮ সময়কালে নারী ফুটবল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই স্মরণ করেছেন। নানা সামাজিক বাধা ও হুমকির মধ্যেও মেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে নিয়ে আসার উদ্যোগে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেন।
২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে নারী ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্বে থাকাকালে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল চালুর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে আলোচিত হন। সেই সময় নারী ফুটবলের পাশে স্পনসরদের দাঁড় করানোও সহজ ছিল না। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি।
নারী ক্রীড়াবিদদের অধিকার ও সমান সুযোগ নিয়েও বরাবর সোচ্চার ডানা। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। তার মতে, ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের যোগ্য অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাডমিন্টন অঙ্গনেও তার সম্পৃক্ততা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশ সিনিয়র ইন্টারন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চ্যালেঞ্জের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন। অর্থাৎ খেলোয়াড় হিসেবে যে কোর্ট থেকে তার পথচলা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ সময় পরও সেই ব্যাডমিন্টন অঙ্গনের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
কামরুন নাহার ডানার জীবন তাই শুধু শিরোপা জয়ের গল্প নয় ; এটি প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ব্যাডমিন্টন কোর্টে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি নারী ক্রীড়ার বিকাশে তার সাহসী ভূমিকা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। নতুন প্রজন্মের নারী খেলোয়াড়দের জন্য তার জীবন ও কর্ম হতে পারে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
লেখা : শহিদুল ইসলাম এমেল