সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় রবীন্দ্র কাছারি বাড়িটি অবস্থিত। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি জমিদারি শুরু করেন।
নাটোরের জমিদার রানি ভবানী ও তার দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণের শাসনামলে শাহজাদপুর পরগনা তাদের জমিদারির অংশ ছিল। রানি ভবানীর পরবর্তী বংশধরগণ দক্ষ জমিদার ছিলেন না। তারা সময়মতো রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে শাহজাদপুর পরগনাসহ অনেক অঞ্চলের জমিদারি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর বেশ কয়েক বছর ইংরেজ নীলকরেরা কুঠি নির্মাণ করে ব্যবসা করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৪/৩৮ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাদপুর পরগনার জমিদারি নিলামে তুললে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কুঠিবাড়িসহ শাহজাদপুর পরগনার জমিদারি কিনে নিয়ে তার জমিদারিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তার পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির দায়িত্ব পান। তিনি ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়া শিলাইদহ কুঠিবাড়িসহ জমিদারি কিনে নেন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব প্রদান করেন। জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়েই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে আসেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর কাছারি বাড়ির নীলকুঠির পূর্ব দিকে বসবাসের জন্য নতুন একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করেন। শাহজাদপুর কাছারি বাড়িটির পাশ দিয়ে একসময়ে করতোয়া নদীর শাখা খোন্দকার জোলা প্রবাহিত হতো। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নদী দিয়েই নৌকাযোগে শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে আসতেন। কিছুকাল আগে নদীটি ভরাট হয়ে গিয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র আট বছর জমিদারি দেখাশোনা করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে অবস্থানকালে কালজয়ী অনেক কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক রচনা করেছেন। এরমধ্যে তার ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের বৈষ্ণব কবিতা, দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয় যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, ভরা ভাদ্রে, প্রত্যাখ্যান, লজ্জা। চিত্রা কাব্যগ্রন্থের চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীত। ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের নদীযাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, যাত্রী, প্রার্থনা, মানসলোক, কাব্য, তূর্ণ, প্রথম চুম্বন, স্মৃতি বিলয়, স্বার্থ, ইছামতি নদী, প্রেয়সী, শান্তি মন্ত্র, কালিদাসের প্রতি, কুমার সম্ভব গান, শুশ্রূষা, আশিষ গ্রহণ, বিদায় ও শেষ চুম্বন। ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থে নব বিরহ, লজ্জিতা, বিদায়, হতভাগ্যের গান, কাল্পনিক, সংকোচ, মানস, প্রতিভা। এছাড়া ছোটো গল্পের মধ্যে পোস্ট মাস্টার, রাম কানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, ছুটি, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথিসহ ৪৪টি ছোটো গল্প। এছাড়াও বিসর্জন নাটক, ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি পত্রসহ অসংখ্য প্রবন্ধ, ছড়া ও হৃদয়গ্রাহী গান রচনা করেছিলেন।

শাহজাদপুর কাছারি বাড়ির ভেতরে পশ্চিম দিকে পুরাতন নীলকুঠি একতলা ভবনটি এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। একতলা ভবনটির কক্ষগুলোতে খাজনা আদায় করা হতো। ভবনটিতে টালী ইটের নক্শা করা ছাদ ছিল। কালের আবর্তে ছাদটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। একতলা ভবনের পূর্বদিকে দোতলা ভবনটি উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মাণ করা হয়। ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় রীতিতে নির্মিত ভবনটি দৈর্ঘ্যে ২৬.৮৫ মিটার এবং প্রস্থে ১০.২০ মিটার। ১৪ কক্ষবিশিষ্ট দোতলা ভবনটির উচ্চতা ৮.৭০ মিটার। ভবনটির উভয় তলায় দুইপাশে একই মাপের টানা বারান্দা রয়েছে। ভবনটির বারান্দার জোড়া খাম, ছাদ ও দেয়ালের পোড়া মাটির নক্শা স্থাপনাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। জমিদারি কাজে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুরে এলে এই ভবনেই বসবাস করতেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাদপুর কাছারি বাড়িটিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সরকার রবীন্দ্র-কাছারি বাড়ির দোতলা ভবনটিকে সংস্কার করে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে। কাছারি বাড়ির জাদুঘরের দোতলার সাতটি কক্ষের মধ্যে ছয়টিকে প্রদর্শনী গ্যালারি বানানো হয়েছে। গ্যালারিগুলোতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত পোশাক, খড়ম, প্রদীপ, চিলমচি, টেনিস খেলার ব্যাট, বসার আসন, টেবিল-চেয়ার, খাট, পালঙ্ক, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, গোল টেবিল, আলনা, সোফা, দেবতার আসন, ঘড়ি, পিয়ানো, সিরামিকের তৈজসপত্র, শ্বেতপাথরের বেসিন, সসপেন, ফ্রাইপেন চায়ের কেতলি, লবণের বয়াম, পিতল ও কাঁসার পাত্রসহ জমিদারির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সিলমোহর ব্যবহার করা হয়েছে। নিচতলার সাতটি কক্ষের মধ্যে তিনটিকে ছবি প্রদর্শনীর গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে। গ্যালারি তিনটিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির অনুলিপি ও একটি চিঠিসহ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানারকম কর্মযজ্ঞের বেশ কিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার রবীন্দ্র-কাছারি বাড়িটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতান্ত্বিক নিদর্শন।
লেখক : গবেষক, লেখক এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা