
মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। আকারে ছোটো হলেও শরীরকে সুস্থ ও সচল রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিদিন দু’টি কিডনি প্রায় ১৮০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে শরীর থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা এবং শরীরের লবণ ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষায়ও কিডনির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই একে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। তবে, সচেতন জীবনযাপন ও কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে দীর্ঘদিন কিডনি সুস্থ রাখা সম্ভব।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
কিডনি ভালো রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। পানি শরীরের বিষাক্ত বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয় এবং কিডনির ওপর চাপ কমায়। তবে, সবার জন্য পানির চাহিদা এক নয়। আবহাওয়া, বয়স, শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ২-৩ লিটার পানি পান করা উপকারী হতে পারে।
লবণ কম খান
অতিরিক্ত লবণ উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করে, যা কিডনি ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ। রান্নায় অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার না করা, টেবিল সল্ট এড়িয়ে চলা এবং চিপস, আচার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্টফুড কম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস কিডনি বিকলের সবচেয়ে বড়ো দু’টি কারণ। যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
তাজা শাকসবজি, মৌসুমি ফল, আঁশসমৃদ্ধ খাবার, পরিমিত মাছ ও চর্বিহীন মাংস কিডনির জন্য উপকারী। অন্যদিকে অতিরিক্ত তেল-চর্বি, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি এবং অতিরিক্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘদিন বেশি খেলে কিডনির ওপর চাপ বাড়তে পারে। সুষম খাদ্য গ্রহণই সুস্থ কিডনির অন্যতম চাবিকাঠি।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে কিডনি সুস্থ থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে।
ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
ধূমপান রক্তনালিকে সংকুচিত করে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। একইভাবে অতিরিক্ত মদ্যপানও কিডনির জন্য ক্ষতিকর। তাই সুস্থ কিডনির জন্য ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ পরিহার করাই উত্তম।
ওষুধ সেবনে সতর্ক থাকুন
অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন সেবন করেন। বিশেষ করে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তাই যেকোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, যা কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ধ্যান, প্রার্থনা বা পছন্দের কাজে সময় দেওয়া উপকারী।
প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
অনেকেই দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখেন। এটি মূত্রনালিতে সংক্রমণ এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রস্রাব করা উচিত।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় বোঝা যায় না। তাই বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের রোগী, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ কিংবা যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের বছরে অন্তত একবার রক্তে ক্রিয়েটিনিন, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করানো উচিত।
সচেতনতাই সর্বোত্তম প্রতিরোধ
কিডনি একবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তখন ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তাই রোগ হওয়ার অপেক্ষা না-করে এখন থেকেই সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সুস্থ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান, ধূমপান পরিহার, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা- এই কয়েকটি অভ্যাসই কিডনিকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ কিডনি মানেই সুস্থ শরীর, কর্মক্ষম জীবন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। তাই আজ থেকেই কিডনির যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।