রংপুর জেলা শহর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মাহিগঞ্জে তাজহাট জমিদারবাড়িটি অবস্থিত। স্থানীয়রা তাজহাট রাজবাড়ি বলে জানেন। পাঞ্জাবের রত্নব্যবসায়ী মান্না লাল রায় ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশের রংপুর এলাকায় আগমন করেন।
মান্না লাল রায় রংপুরের মাহিগঞ্জে এসে সোনা রূপা অলঙ্কার ও রত্নখচিত মুকুট বা তাজ তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন।
মান্না লাল রায় কর্মবীর ছিলেন। নিজ প্রচেষ্টায় ব্যবসা প্রসারিত করে অনেক ধন-সম্পদের মালিক হন। মান্না লাল রায় ক্রমশ এ অঞ্চলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন এবং মাহিগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় অনেক জায়গা জমি ক্রয় করেন। এরপর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মান্না লাল রায় জমিদারী শুরু করেন। জমিদারী পরিচালনার জন্য তখন তিনি মাহিগঞ্জ অঞ্চলে একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেন।
মান্না লাল রায়ের মৃত্যুর পর তার ছেলে গিরিধারী লাল রায় জমিদার হন। জমিদার গিরিধারী লাল রায় নিঃসন্তান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর পালক পুত্র গোবিন্দ লাল রায় জমিদার হন। তিনিও ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর পালিত পুত্র গোপাল লাল রায় জমিদার হন।
গোপাল লাল রায় শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান্ধব আধুনিক মনস্ক ব্যক্তি ছিলেন। পূর্ব-পুরুষদের মতো জমিদারী দেখাশোনার পাশাপাশি তিনিও সোনা-রূপার ব্যবসা করতেন। জমিদার হিসেবে প্রজাদের কল্যাণে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ ও পুকুর খননসহ অনেক জনহিতকর কাজ করেন। এজন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তাকে রাজা উপাধি দেন। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বাহাদুর এবং ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ উপাধিতে ভূষিত হন।

তাজহাট জমিদারবাড়ির নিচতলায় ছিল দরবার হলসহ ব্যবসা ও জমিদারী পরিচালনার জন্য অসংখ্য কক্ষ। ভবনটির নিচতলায় প্রবেশের জন্য চারদিকে দরজা রয়েছে। নিচতলার সামনে ও পেছনের দিকে টানা বারান্দা রয়েছে। বাড়িটির দোতলায় রয়েছে একাধিক শয়ন কক্ষ, অতিথি কক্ষ, ডাইনিং হল, জলসাঘর, দাসদাসী থাকার কক্ষসহ বেশকিছু কক্ষ। দোতলায় ওঠার জন্য বাড়িটির সামনের দিকে রয়েছে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং পেছনের দিকে রয়েছে একটি লোহার সিঁড়ি। লোহার সিঁড়িটি ছাদের উপর থেকে নিচতলা হয়ে মাটির নিচে সুড়ঙ্গপথে নেমে গিয়েছে। বাড়ির সামনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা ও বাগান। তাজহাট জমিদার বাড়িটির উপরে মাঝ বরাবর একটি অষ্টভুজ গম্বুজ রয়েছে। তাজহাট জমিদারবাড়ির দুই পাশে রয়েছে দু’টি পুকুর। বাড়িটির সামনের প্রশস্ত সিঁড়ি ও অষ্টভুজ গম্বুজসহ বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ঢাকার আহসান মঞ্জিলের অনুরূপ। তাজহাট জমিদারবাড়িটি মোঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির পর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তি হয়। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির একবছর পর ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার গোপাল লাল রায় সপরিবারে ভারতে চলে গিয়ে কলকাতায় বসবাস করতে থাকেন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি সভায় যোগদানের জন্য রওয়ানা হন এবং যাত্রাপথে শিয়ালদহ রেলস্টেশনে মৃত্যুবরণ করেন।
জমিদার গোপাল লাল রায় সপরিবারে ভারতে চলে যাওয়ার পর তাজহাট জমিদারবাড়িটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। অবশেষে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাড়িটি সরকারি কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রংপুর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ব্যবহার করে ভবনটি। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বাড়িটিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে। এরপর ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাড়িটি রংপুর জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয় ।
তাজহাট জমিদারবাড়ি জাদুঘরে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের পবিত্র কোরআন শরীফের আরবি পাণ্ডুলিপি, সনাতন ধর্মের হাজার বছরের পুরনো রামায়ণ ও মহাভারতের সংস্কৃতি ভাষার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও রংপুর দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত শিবলিঙ্গ, বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, প্রাচীন ও মধ্যযুগের মুদ্রা, সীলমোহর, শিলাচিত্র, মাটির তৈজসপত্র, ঝাড়বাতি, ঢাল, তলোয়ারসহ কয়েকশত বছর প্রাচীন আসবাবপত্র প্রদর্শনী করা হয়েছে। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের হাতের লেখা চিঠি, বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’, দশ ও এগারো শতকের নানা রকম শিল্পকর্ম, প্রাচীন ও মধ্যযুগের অনেক নির্দশন জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ শতকের শুরুতে নির্মিত শত বছর প্রাচীন তাজহাট জমিদারবাড়িটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি।
লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা