দুই ঈদে রেকর্ড পরিমাণ নাটক নির্মাণ হলেও ঈদের পর থেকে কমে আসছে নাটক নির্মাণ। গতবছর যেখানে ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত নাটক আপলোড হলেও এখন আর সেইভাবে ইউটিউবে নাটক আপলোড করতে দেখা যাচ্ছে না। সে-কারণে শিল্পীদেরও ব্যস্ততা কমে এসেছে। অনেকে এই সুযোগে পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের বাইরে। এতে সমস্যায় পড়েছেন পার্শ্ব অভিনয়শিল্পীরা। হাতেগোনা কয়েকজন তারকাশিল্পী ছাড়া অধিকাংশ শিল্পীই অলস সময় কাটাচ্ছেন।
বলতে গেলে ঈদুল আজহার পর তেমন করে জমে ওঠেনি নাটকপাড়া। ফলে শুটিং হাউজগুলোও বেশিরভাগ সময় খালি থাকছে। একইসঙ্গে শিল্পী থেকে শুরু করে নির্মাতা এবং প্রোডাকশন সংশ্লিষ্ট অনেকেই বেকার সময় পার করছেন। দর্শকপ্রিয় শিল্পীরা অধিক পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করার ফলে, তাদের আর্থিক সমস্যা হয়তো হচ্ছে না; তবে পার্শ্বচরিত্রের অনেকেই কাজ না-থাকায় পড়েছেন আর্থিক সংকটে। এছাড়া কিছু কাজ হলেও, সেখানে চরিত্রের সংখ্যা কম থাকায় কাজ পাচ্ছেন না অনেকেই। এমন অভিযোগও সম্প্রতি করেছেন একাধিক শিল্পী। দর্শকপ্রিয় বা বেশি ভিউ শিল্পীদের পারিশ্রমিক বৈষম্যের কারণেই পার্শ্বশিল্পীদের কাজ কমছে বলেও জানান অনেকে।
যদিও এই অভিযোগ নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরেই নাটকে এমন বৈষম্য বিরাজ করছে। দর্শকপ্রিয় শিল্পীর পারিশ্রমিক মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় নাটক নির্মাণেও অনেকেই পিছিয়ে যাচ্ছেন, এমন খবরও সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাড়ানো নিয়েও অনেকেই কথা বললেও এর কোনো সুরাহা হয়নি। ভিউ-বাণিজ্যের দিক বিবেচনা করে অনেকেই বাড়িয়েছেন পারিশ্রমিক। আবার অনেক প্রযোজনা সংস্থাও সে-সব শিল্পী নিয়েই কাজ করছেন। ফলে তাদের বেশি টাকা দিতে গিয়ে কমিয়ে ফেলছেন অন্যান্য চরিত্র। এ-কারণে এখন নাটক হয়ে গেছে প্রধানত নায়ক-নায়িকানির্ভর। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল। এই বছরের মাঝামাঝিতে এসে হঠাৎ করে কমে যায় নাটকের কাজ। এই প্রসঙ্গে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ ও নির্মাতারা বলেন, ‘আগে ইউটিউব থেকে যেভাবে আয় হতো, এখন সেটা হচ্ছে না। আবার অনেকে তাদের সম্মানীও অনেক বাড়িয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশে সময় কাটাচ্ছেন।’
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু বলেন, ‘ঈদের পর সময়টা একটু খারাপ যায়, কাজ কম হয়। সবাই টানা ঈদের কাজ করে একটু ছুটি কাটায়। তবে, সময়টা সত্যিই একটু খারাপ যাচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থা প্রতিবার ইন্ডাস্ট্রি কাটিয়ে ওঠে, এবার কতটা কাটিয়ে উঠতে পারবে সেটা বলা যাচ্ছে না।’ ইন্ডাস্ট্রির খারাপ অবস্থায় আছে বা সংকটাপন্ন এমন মানতে নারাজ কেউ কেউ। কারও মতে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়টিও নাটক নির্মাণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সব সেক্টরের মতো সংস্কৃতি অঙ্গনেও বিগত সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করত। সেটা বন্ধ হওয়ায় কাজ কিছুটা কমেছে। তবে, তারা আশা করছেন খুব শিগ্গিরই আবার জমজমাট হবে এই অঙ্গন।

তাছাড়াও স্পন্সরের অভাব, শিল্পীদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং ইউটিউব-কেন্দ্রিক রকমারি বাণিজ্যিক সমীকরণের কারণে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমের নাটক নির্মাণ কিছুটা কমে গেছে। অনেক ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা তাই অলস সময় পার করছেন।
নাটক নির্মাণ কমে যাওয়ার মূল কারণ বাজেট ও স্পন্সর সংকট: উপযুক্ত প্রডাকশন বাজেট ও পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপনের বা স্পন্সরের অভাব রয়েছে, যা মানসম্মত কাজ তৈরি বড়ো বাধা। পারিশ্রমিক বৃদ্ধি: ভিউ শিল্পীদের পারিশ্রমিক অনেক বেড়ে যাওয়ায় মোট বাজেটের একটা বড়ো অংশ তাদের পেছনেই চলে যায়, ফলে নির্মাণের অন্যান্য খাতে টান পড়ে। শিল্পীসংকট ও সিন্ডিকেট : নাটকে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ তারকার উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু বৃত্ত বা সিন্ডিকেটের আধিপত্য নতুন কাজের পরিধি সংকুচিত করছে। এছাড়াও টেলিভিশন থেকে নাটক পুরোপুরি ইউটিউব বা ওটিটিমুখী হওয়ায় নির্মাণ ও প্রচারের ধরন পাল্টেছে, যার ফলে অনেক নির্মাতা ও শিল্পী বেছে বেছে কাজ করছেন।
কেউ কেউ আবার গল্পের দিকে না-তাকিয়ে অতিরিক্ত অর্থের আশায় একদিনে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে অপূর্ব, জোভান, আরজে ফারহান, তৌসিফ মাহবুব অভিনীত একটি নাটকের বাজেট দাঁড়ায় ১০ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আবার মোশাররফ করিম, নীলয় আলমগীর, খায়রুল বাশার, ইয়াস রোহান, আরশ খানদের নাটকে খরচ হয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
যেখানে কয়েক বছর আগেও একটি নাটকে খরচ হতো ২ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা। তখন স্পন্সরও বেশ ভালো ছিল। টেলিভিশনে অনায়াসে ভালো ভালো নাটক প্রচার করতে পারতেন। বাজেট বেড়ে যাওয়ার কারণে কয়েকটি টেলিভিশন ছাড়া দর্শকপ্রিয় শিল্পীদের নাটক প্রচার করতে পারছে না। নাম প্রকাশ না-করার শর্তে একটি টেলিভিশনের হেড অব প্রোগ্রাম বলেন, যাদের ভিউ বেশি হয়, তারা নিজেদের মতো সম্মানী বাড়িয়ে নিয়েছেন, এর কোনো নীতিমালা না-থাকায় বিপাকে পড়েছে চ্যানেলগুলো। যার কারণে বিভিন্ন দিবসে আমরা আর তেমন করে নাটক প্রচার করতে পারছি না। শিল্পীরাও এখন ইউটিউব নির্ভর হয়ে গেছে, তারপরও আবার কোন ইউটিউবে নাটকটি প্রচার হবে, সে অনুযায়ী কাজ করেন। যেসব ইউটিইবে সাবস্ক্রাইবার কম, সে ইউটিউবে কাজ করেন না। এতে যদি তার নাটকের ভিউ কমে যায় তাহলে তো তাকে নিয়ে কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, বেশি সাবস্ক্রাইবার ইউটিউব চ্যানেল কর্র্তৃপক্ষ। সবমিলিয়ে এক দুঃসময় পার করছেন চ্যানেলগুলো।