জীবনের সব ভ্রমণ বিমানবন্দর থেকে শুরু হয় না। কোনো কোনো ভ্রমণ শুরু হয় মনের ভেতর অন্ধকার একটি ঘরে, যেখানে আলো ঢোকার জানালাটিও তখন খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার নেপাল যাত্রার শুরুটাও আসলে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নয়। এর শুরু ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে, ঢাকায় আমার নিজের কর্মস্থলে- কাগজ, বই, হিসাবের খাতা আর দুশ্চিন্তায় ভরা একটি সময়ে।
কোভিড মহামারী তখন পৃথিবীর অনেক হিসাবেই বদলে দিয়েছে। মানুষের জীবন থমকে ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা ছিল প্রায় অচল। আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মূর্ধন্য’ও তার বাইরে ছিল না। অমর একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হয়েছে, কিন্তু মেলা-পরবর্তী যে আনন্দ ও আশাবাদ একজন প্রকাশকের মনে থাকার কথা, তার বদলে আমার ভেতরে জমেছিল অনিশ্চয়তা। বই প্রকাশ করছি, পরিকল্পনা করছি, কর্মীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি- কিন্তু সামনের পথ যেন কুয়াশায় ঢাকা।
প্রকাশনা ব্যবসার সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা জানেন- বইয়ের ঘ্রাণ যতই মধুর হোক, অবিক্রীত বইয়ের স্তূপ কিন্তু মাঝেমধ্যে বেশ কঠিন বাস্তবতার গন্ধ ছড়ায়। একদিকে কাগজ ও মুদ্রণের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমছে। হিসাবের খাতা খুললেই মনে হতো, সংখ্যাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রƒপের হাসি হাসছে। প্রতিটি সকাল নতুন উদ্যমে শুরু করার কথা, অথচ আমার সকাল শুরু হতো আগের দিনের দুশ্চিন্তা নিয়েই।
এই ব্যবসায়িক অস্থিরতা ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তিতে পরিণত হয়েছিল। কাজ করছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলছি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি- সবই চলছিল। কিন্তু নিজের ভেতরে যেন কোথাও একটি চাকা আটকে গিয়েছিল। বাইরে থেকে আমাকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে আমি ক্রমেই ক্লান্ত, হতাশ ও দিকহারা হয়ে পড়ছিলাম।
এই অবস্থায় আমার বড়ো ভাই সুশান্ত শুভ একদিন ভাবাতীত ধ্যান বা ট্রান্সসেন্ডেন্টাল মেডিটেশনের কথা বললেন। প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। আমাদের জীবনে উপদেশ দাতার অভাব নেই। কেউ ব্যবসা বাড়ানোর উপায় বলেন, কেউ শরীর ভালো রাখার, কেউ আবার এককাপ চা হাতে নিয়ে পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করে দেন। তাই ‘ধ্যান করো, ভালো লাগবে’- এই কথাটিও প্রথমে সেই সাধারণ উপদেশগুলোর একটি বলেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু বড়ো ভাই শুধু পরামর্শ দিয়ে থেমে যাওয়ার মানুষ নন। তিনি অনুপ্রেরণা, বোঝানো এবং প্রয়োজনীয় মাত্রায় জোরজবরদস্তি- সব কৌশলই প্রয়োগ করলেন। তার সেই মধুর অত্যাচারের ফলে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে আমি ভাবাতীত ধ্যান শিখলাম।
ধ্যান শেখার দিনই যে আমার চারপাশের সব সমস্যা উধাও হয়ে গেল, তা নয়। ব্যাংকের হিসাব আগের মতোই ছিল, ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জও রাতারাতি কমেনি। কিন্তু পরিবর্তন শুরু হয়েছিল অন্য জায়গায়- আমার ভেতরে। নিয়মিত ধ্যানের মাধ্যমে গভীর বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তির একটি নতুন অভিজ্ঞতা পেতে শুরু করলাম। এতদিন পরিস্থিতি আমাকে যেদিকে ঠেলে দিত, সেদিকেই ভেসে যেতাম। ধ্যান আমাকে প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরে স্থির হয়ে দাঁড়ানোর জায়গা দিল।
জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তখনো ছিল, এখনো আছে। তবে সেগুলোকে দেখার চোখ বদলাতে শুরু করল। বুঝতে পারলাম, ঝড় থামার অপেক্ষায় বসে থাকাই শান্তি নয় ; ঝড়ের মধ্যেও নিজের কেন্দ্রটুকু স্থির রাখতে পারার নামও শান্তি। এই উপলব্ধিই আমাকে ধ্যানের আরো গভীর পথে নিয়ে গেল।

ঢাকা থেকে কৌশানী, হায়দ্রাবাদ ও অসম
২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ভারতের উত্তরাখণ্ডের কৌশানীতে গিয়ে ভাবাতীত ধ্যানের প্রথম অ্যাডভান্সড টেকনিক শিখলাম। হিমালয়ের সৌন্দর্যের সঙ্গে সেটিই ছিল আমার প্রথম গভীর ধ্যানভ্রমণ। কৌশানীর পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের তুষারশৃঙ্গ দেখার সময় মনে হয়েছিল, প্রকৃতি যেন মানুষের অহংকারকে ছোটো করে দেওয়ার জন্যই পাহাড় সৃষ্টি করেছে। আমরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে কত ব্যস্ত, অথচ পাহাড় নির্বিকারভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে থাকে !
এরপর ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের শেষ থেকে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের শুরু পর্যন্ত হায়দ্রাবাদে আয়োজিত ‘১০,০০০ ফর ওয়ার্ল্ড পিস প্রোগ্রাম’-এ অংশ নিয়ে দ্বিতীয় অ্যাডভান্সড টেকনিক শেখার সুযোগ হয়। হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত ধ্যানের পরিবেশ আমার কাছে একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। এত মানুষের মাঝেও একধরনের গভীর নীরবতা অনুভব করেছিলাম।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে ভারতের অসমে গিয়ে তৃতীয় অ্যাডভান্সড টেকনিক শিখি। এভাবে ধ্যান আমার কাছে শুধু প্রতিদিন দু’বার অনুশীলনের বিষয় হয়ে থাকল না ; এটি ধীরে ধীরে জীবনকে বোঝার এবং নিজেকে জানার একটি চলমান সফরে পরিণত হলো।
২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে আমার ধ্যানচর্চার অগ্রগতি দেখে আমাকে টিএম শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত হলাম। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৩৮ দিনের জন্য নেপালে যাই ‘টিএম সিদ্ধি’ এবং ফ্লাইং ব্লকের কোর্সে অংশ নিতে।
আমি তখনো বুঝিনি, এই সফরে ধ্যানের পাশাপাশি পাহাড়ি রাস্তা, জঙ্গল, ঝরনা, বৃষ্টি, মন্দির, মোটরসাইকেল এবং নেপালের বাজারদর- সবাই মিলে আমার জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা করে রেখেছে।
যে রাস্তা দেখলে প্রার্থনা আপনাআপনি চলে আসে
কাঠমাণ্ডু থেকে চম্পাদেবী হিলের দিকে যাত্রার শুরুতেই নেপাল আমাকে জানিয়ে দিল- এখানে সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে হৃদয় শক্ত রাখতে হবে।
পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া রাস্তা এত খাড়া, সরু ও আঁকাবাঁকা যে প্রথম দিকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছিলাম, পরে বুঝলাম বাইরে তাকানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও উপকারী নয়। একপাশে পাহাড়ের দেয়াল, অন্যপাশে গভীর খাদ। মাঝখানে আমাদের গাড়িটি এমনভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, যেন রাস্তার সঙ্গে তার বহুদিনের ব্যক্তিগত সমঝোতা আছে।
চালকের মুখে কোনো উদ্বেগ নেই। তিনি স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, মাঝে মাঝে কথা বলছেন। আর আমি মনে মনে জীবনের সব ভালো কাজের তালিকা তৈরির চেষ্টা করছি। কোনো কোনো বাঁকে মনে হচ্ছিল, সামনের চাকা রাস্তায় আছে ঠিকই, কিন্তু পেছনের চাকা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না- সে রাস্তার সঙ্গে থাকবে, না নিচের উপত্যকা দেখতে যাবে।
আমাদের দেশে কোনো গাড়ি একটু জোরে ব্রেক কষলেই যাত্রীরা চালকের দিকে তাকান। চম্পা দেবীর রাস্তায় আমি চালকের দিকে তাকাইনি ; তাকিয়েছি তার দুই হাতের দিকে। তিনি স্টিয়ারিং ঠিকভাবে ধরে আছেন কি না, সেটিই তখন আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
স্থানীয় নেপালিরা অবশ্য এসব পথ দিয়ে এমন সহজভাবে ওঠানামা করেন, যেন তারা সমতল মাঠে হাঁটছেন। বিশেষ করে স্থানীয় পণ্ডিতদের দুর্গম পাহাড়ি পথে সাবলীল যাতায়াত দেখে বিস্মিত হতাম। তাদের পায়ে সাধারণ জুতা, হাতে হয়তো একটি ব্যাগ, মুখে প্রশান্তি। আর আমি ভালো জুতা পরে, প্রস্তুতি নিয়ে হাঁটতে বের হয়েও কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন চেহারা করতাম, যেন এভারেস্টের চূড়ায় অক্সিজেন শেষ হয়ে গেছে।
চম্পা দেবী হিল কাঠমাণ্ডু উপত্যকার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের একটি বনাচ্ছাদিত পাহাড়ি অঞ্চল। এর উচ্চতা প্রায় ২,২৮৫ মিটার এবং পাহাড়ের চূড়ায় দেবী চম্পার একটি পবিত্র মন্দির রয়েছে। এ অঞ্চল থেকে কাঠমাণ্ডু উপত্যকা ও পরিষ্কার আবহাওয়ায় হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ দেখা যায়।
তবে জুন ও জুলাই নেপালের বর্ষাকাল। ফলে পাহাড় তখন সবুজে ভরা হলেও পথ ভেজা, পিচ্ছিল এবং কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। আমার অ্যাডভেঞ্চারের জন্য প্রকৃতি যেন বাড়তি আয়োজন করেই রেখেছিল।
মহর্ষি বৈদিক ইন্সটিটিউট মেঘের কাছাকাছি এক আশ্রয়
কঠিন পাহাড়ি পথ পেরিয়ে মহর্ষি বৈদিক ইন্সটিটিউটের সুবিশাল ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর পর প্রথম যে অনুভূতি হয়েছিল, তা হলো- এত সুন্দর জায়গায় আসার জন্য ওই ভয়ঙ্কর রাস্তাকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।
পাহাড়ের ঢালে নির্মিত ক্যাম্পাসটি যেন শহরের কোলাহল থেকে আলাদা একটি নিজস্ব জগৎ। চারদিকে সবুজ পাহাড়, ঘন গাছপালা, মেঘ, বৃষ্টি আর গভীর নীরবতা। ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঝরনার শব্দ দিনরাত শোনা যেত। কখনো সেই শব্দ কোমল, কখনো প্রবল। বৃষ্টি নামলে ঝরনা ও মেঘের গর্জন একসঙ্গে মিশে এমন আবহ তৈরি করত, মনে হতো প্রকৃতি নিজেই কোনো বিশাল বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে।
আমাদের সিদ্ধি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন মীনরাজ স্যার। তিনি অত্যন্ত আন্তরিক এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তার কথা বলা, বোঝানোর ধরন এবং প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর প্রতি মনোযোগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি শুধু উত্তর দিতেন না ; এমনভাবে ব্যাখ্যা করতেন, যাতে প্রশ্নটির পেছনের জিজ্ঞাসাটিও পরিষ্কার হয়ে যায়।
সেখানে দিনের একটি বড়ো অংশ কাটত ধ্যান, বিশ্রাম, জ্ঞানচর্চা এবং নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মধ্যে। বাইরের পাহাড়ি নীরবতা ও ভেতরের ধ্যান- দু’টির মধ্যে আশ্চর্য এক মিল ছিল। ধ্যানে মন যখন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর স্তরের দিকে যায়, তখন বাইরের শব্দ থেকেও মানুষ যেন দূরে সরে আসে। আবার ধ্যান শেষে চোখ খুললে দেখা যেত, প্রকৃতিও নীরবে বসে আছে।
আমাদের খাবার ছিল সম্পূর্ণ নিরামিষ ও যতটা সম্ভব অর্গানিক। প্রতিদিন প্রতি বেলায় তাজা রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হতো। দীর্ঘদিন বাইরে থাকলে অনেক সময় খাবারের একঘেয়েমি মানুষকে বাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এখানে খাবার ছিল সরল, স্বাস্থ্যকর এবং বৈচিত্র্যময়। নেপালি নিরামিষ রান্নায় মসলা তুলনামূলকভাবে সংযত, কিন্তু স্বাদে নিজস্বতা আছে। ডাল, ভাত, সবজি, বিভিন্ন ধরনের আচার ও স্থানীয় উপকরণের ব্যবহারে প্রতিটি বেলায় পরিচিতির মধ্যেও নতুনত্ব পেতাম।
তবে, নেপালের বাজারদর আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি আর্থিক সচেতনতাও জরুরি। তুলনামূলকভাবে প্রায় সবকিছুর মূল্যই আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে। কোনো পণ্যের মূল্য শুনে কখনো মনে হয়েছে, বিক্রেতা হয়তো ভুল করে বাংলাদেশি টাকার সঙ্গে একটি শূন্য বেশি যোগ করেছেন। পরে বুঝেছি, ভুল তার নয় ; আমার প্রত্যাশার।

জঙ্গলে একা এবং কল্পনার হিংস্র প্রাণীরা
ক্যাম্পাসের আশপাশে হাঁটতে আমার খুব ভালো লাগত। একদিন একা চম্পা দেবী হিলের পথে হাঁটতে বের হলাম। শুরুতে ব্যাপারটি বেশ রোমান্টিক মনে হচ্ছিল- ঘন সবুজ জঙ্গল, ভেজা মাটির গন্ধ, পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি, দূরে ঝরনার গান। মনে হচ্ছিল প্রকৃতির সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটাব।
কিছুদূর যাওয়ার পর সেই রোমান্টিক অনুভূতি দ্রুত গোয়েন্দা কাহিনিতে পরিণত হলো। চারদিকে এত নির্জন যে, নিজের পায়ের শব্দও সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। শুকনো একটি পাতা নড়লেই ভাবছিলাম, নিশ্চয়ই কোনো সাপ। ঝোপের ভেতর শব্দ হলেই মনে হচ্ছিল, অজানা কোনো হিংস্র প্রাণী আমাকে লক্ষ্য করছে। বাস্তবে প্রাণীটি হয়তো একটি নিরীহ পাখি বা কাঠবিড়াালি ছিল, কিন্তু আমার কল্পনায় সে মুহূর্তেই বাঘের নিকটাত্মীয় হয়ে উঠছিল।
ভেজা পথে পা পিছলে গেলে মনে হতো, এটাই বুঝি জীবনের শেষ মুহূর্ত। আবার উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাহস দিতাম- আমি তো উচ্চতর ধ্যান শিখতে এসেছি, সামান্য জঙ্গলে ভয় পেলে চলবে কেন ? ঠিক পরের মুহূর্তে কোনো অচেনা শব্দ শুনেই সব উচ্চতর চিন্তা নিচে নেমে আসত।
স্থানীয় পণ্ডিতদের প্রতিদিন এই পথ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেখে নিজের ওপর কিছুটা লজ্জাও হতো। তারা পাহাড় বেয়ে ওঠেন, নামেন, কথা বলেন- কোনো ক্লান্তি নেই। আর আমি একদিন একা উঠতে গিয়ে বারবার ভাবছি, আমার স্মরণসভায় কে বক্তৃতা দেবেন !
তবু এই ভয়টির মধ্যেও একধরনের আনন্দ ছিল। শহরের জীবনে আমরা নিরাপত্তার এত স্তরের মধ্যে থাকি যে, নিজের সহজাত অনুভূতিগুলো অনেকটাই হারিয়ে ফেলি। পাহাড়ি জঙ্গলে একা হাঁটার সময় প্রতিটি শব্দ, গন্ধ ও নড়াচড়া খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করছিলাম। ভয় আমাকে দুর্বল করার পাশাপাশি সচেতনও করে তুলেছিল। হয়তো প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার অর্থই হলো- নিজের সাহস ও সীমাবদ্ধতা দুটোকেই নতুন করে আবিষ্কার করা।
টমের সঙ্গে পাদমন্দির ও পাহাড়ি ফলের সন্ধানে
টমের সঙ্গে একদিন চম্পা দেবী হিলের পাদদেশের মন্দির দেখতে গিয়েছিলাম। পাহাড়ি পথ, ছোটো ছোটো বসতি এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন দেখতে দেখতে আমাদের পদযুগল এগোচ্ছিল। নেপালের ধর্মীয় স্থানগুলোতে প্রকৃতি ও উপাসনা যেন আলাদা নয়। কোথাও মন্দির পাহাড়ের সঙ্গে মিশে আছে, কোথাও গুহা, ঝরনা বা প্রাচীন গাছ নিজেই পবিত্রতার অংশ হয়ে উঠেছে।
পথে প্রচুর স্থানীয় কাঁচা নাশপাতি দেখতে পেলাম। কোথাও গাছে ঝুলছে, কোথাও বাজারে সাজানো। নাশপাতির সেই প্রাচুর্য দেখে মনে হচ্ছিল, নেপালে কেউ হয়তো ফলটির উৎপাদন কমানোর কথা কখনো ভাবেনি। স্থানীয় অ্যাভোকাডো, নানা ধরনের হার্বস এবং হজমে সহায়ক বলে পরিচিত কিছু ফলও দেখলাম এবং স্বাদ নিলাম। নতুন ফল খাওয়ার সময় আমি সাধারণত দু’টি বিষয় ভাবি- এক, স্বাদ কেমন ; দুই, পরে শরীর আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে কি না।
টমের সঙ্গে সেই হাঁটা শুধু একটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা ছিল না। পথের গাছপালা, ফল, মানুষের বাড়ি এবং পাহাড়ি জীবনের ছোটো ছোটো দৃশ্য আমাকে নেপালকে পর্যটকের চোখের বাইরে গিয়ে দেখতে সাহায্য করেছিল।
সোমনাথের সঙ্গে ‘হোয়াইট হাউজ’ অভিযান
সোমনাথের সঙ্গে একদিন ‘হোয়াইট হাউজ’ নামে পরিচিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গেলাম। নাম শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো অনির্ধারিত বৈঠক আছে। পরে বুঝলাম, নেপালের পাহাড়ে নামের সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক সবসময় সরলরেখায় চলে না।
সেখানে পৌঁছানোর পথও যথেষ্ট কঠিন। কখনো খাড়া উতরাই, কখনো পিচ্ছিল পথ, কখনো মনে হচ্ছিল সামনে আর কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু প্রতিটি কঠিন বাঁকের পরই নতুন দৃশ্য খুলে যাচ্ছিল। নিচে কাঠমাণ্ডু উপত্যকা, দূরে পাহাড়ের সারি, মাঝে মাঝে মেঘ এসে সব ঢেকে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আবার মেঘ সরে গিয়ে শহরটি দৃশ্যমান হচ্ছে।
পাহাড়ের সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই- সে পুরো দৃশ্য একবারে দেয় না। একটু পরপর পর্দা সরায়, আবার টেনে দেয়। যেন প্রকৃতি নিজেই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল জানে।
মাধব প্রসাদ আরিয়াল স্যারের জিপে কাঠমাণ্ডু দর্শন
নেপালে আমার ৩৮ দিনের অবস্থানকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছেন মাধব প্রসাদ আরিয়াল স্যার এবং তার স্ত্রী চেতনা আরিয়াল। তাদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা এবং আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
মাধব স্যারের জিপে আমরা কাঠমাণ্ডু ও আশপাশের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরেছি- স্বয়ম্ভুনাথ, বুডানীলকণ্ঠ, ইসকন মন্দির, বৌদ্ধনাথ স্তূপ, পশুপতিনাথ মন্দির, পাটনের কৃষ্ণ মন্দির এবং সাঙ্গা মহাদেব।
পাহাড়ের ওপর অবস্থিত স্বয়ম্ভুনাথ নেপালের অন্যতম পবিত্র বৌদ্ধ স্তূপ। ওপরে উঠলে কাঠমাণ্ডু শহরকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। স্তূপের চারদিকে প্রার্থনাচক্র, মন্দির, ভক্ত ও পর্যটকের ভিড়। সেইসঙ্গে রয়েছে অসংখ্য বানর, যারা নিজেদের ওই এলাকার স্থায়ী প্রশাসক মনে করে। মানুষের হাতে খাবার দেখলে তাদের আগ্রহ আধ্যাত্মিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
বৌদ্ধনাথ স্তূপের বিশাল সাদা গম্বুজ এবং তার ওপরে আঁকা বুদ্ধের সর্বদর্শী চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, কোলাহলের মাঝেও কেউ গভীরভাবে সবকিছু দেখছেন। স্তূপ ঘিরে মানুষ ঘড়ির কাঁটার দিকে হাঁটছেন, প্রার্থনাচক্র ঘোরাচ্ছেন, কেউ মন্ত্র জপ করছেন। এত মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও সেখানে এক ধরনের ছন্দময় প্রশান্তি রয়েছে।
বুডানীলকণ্ঠে জলের মধ্যে শায়িত বিষ্ণুমূর্তি দেখলাম। পাথরে নির্মিত বিশাল মূর্তিটি শান্তভাবে শুয়ে আছে। চারপাশে ভক্তদের প্রার্থনা, ফুল ও ধর্মীয় আচার। নেপাল পর্যটন বোর্ডও বুডানীলকণ্ঠকে কাঠমাণ্ডু উপত্যকার উল্লেখযোগ্য বৈষ্ণব তীর্থগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে।
পশুপতিনাথ মন্দিরে গিয়ে ধর্ম, জীবন ও মৃত্যুকে যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির শিবভক্তদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। একদিকে মন্দিরে পূজা, অন্যদিকে শ্মশানঘাটের আগুন- মানুষের আগমন ও প্রস্থানের মাঝখানে নদী বয়ে চলছে। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, জীবন নিয়ে আমাদের এত আয়োজন, অথচ শেষ পর্যন্ত সবকিছুই এক গভীর প্রবাহের অংশ।
পাটনের কৃষ্ণ মন্দির ও আশপাশের প্রাচীন স্থাপত্য আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। ইট, পাথর, কাঠ ও ধাতুর কাজ দেখে বোঝা যায়, নেপালের ঐতিহ্য শুধু মন্দিরে নয়, কারিগরদের হাতেও বেঁচে আছে। পাটন যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর- তবে সেখানে জাদুঘরের মতো নীরব থাকা সম্ভব নয় ; চারপাশে মানুষ, দোকান, মোটরসাইকেল এবং কবুতর সবাই নিজ নিজ কর্মসূচিতে ব্যস্ত।
সাঙ্গায় বিশাল মহাদেব মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ছোটো মনে হচ্ছিল। পাহাড়ের পটভূমিতে শিবের বিশাল আকৃতি দূর থেকেই দেখা যায়। কাছাকাছি গিয়ে মনে হলো, মানুষ হয়তো নিজের ভক্তির বিশালতাকে দৃশ্যমান করার জন্যই এমন বিরাট মূর্তি নির্মাণ করে।
মাধব স্যার শুধু আমাদের দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাননি ; স্থানীয় বাজার, নিরামিষ খাবার এবং কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও দিয়েছেন। তবে, কেনাকাটার সময় আবারও নেপালের মূল্যস্তর আমার আধ্যাত্মিক স্থিরতার পরীক্ষা নিয়েছে। কোনো কিছু পছন্দ হওয়ার পর দাম শুনে সেটিকে অপছন্দ করার দক্ষতা এই সফরেই অর্জন করেছি।
রাকেশের মোটরসাইকেলে দেবতা
গুহা ও পাহাড়ি বাতাস
রাকেশের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলে করে দক্ষিণকালী মন্দির, নারায়ণ মন্দির এবং গুরু রিনপোচে বা পদ্মসম্ভবের গুহা দর্শন আমার ভ্রমণের আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
পাহাড়ি রাস্তায় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা এক বিশেষ ধরনের সাধনা। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে বাঁক এলেই শরীর কোন দিকে হেলাতে হবে, সেই জটিল হিসাব। রাকেশ অবশ্য নিশ্চিন্তে চালাচ্ছিল। আমি পেছনে বসে কখনো দৃশ্য দেখছিলাম, কখনো জীবনের স্থায়িত্ব নিয়ে দার্শনিক হচ্ছিলাম।
দক্ষিণকালী মন্দির কাঠমাণ্ডু উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তের বনঘেরা গিরিখাতে অবস্থিত এবং দেবী কালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। কাছের ফারপিং অঞ্চল হিন্দু ও বৌদ্ধ- দুই ধারারই পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত।
গুরু রিনপোচের গুহায় গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি হলো। তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গুরু পদ্মসম্ভব এই অঞ্চলের গুহায় গভীর সাধনা করেছিলেন। গুহার ভেতরের নীরবতা সাধারণ নীরবতা নয়। পাথরের দেয়াল, মৃদু আলো, ধূপের ঘ্রাণ এবং শত শত বছরের সাধনার স্মৃতি- সব মিলিয়ে মনে হয়, সময় সেখানে ধীরে চলে।
আমরা স্থানীয় কিছু পণ্যও কিনলাম। স্থানীয় বাজারে ঘোরার আনন্দ হলো, প্রয়োজনীয় জিনিসের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় অথচ আকর্ষণীয় জিনিসই বেশি চোখে পড়ে। বাড়ি ফেরার পর যেগুলোর ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায় না, ভ্রমণের সময় সেগুলোই সবচেয়ে জরুরি মনে হয়।
একটি পূর্ণিমা, একটি শহর এবং গভীর নীরবতা
আমার নেপাল সফরের সবচেয়ে অপার্থিব অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল পূর্ণিমার রাত। চম্পা দেবী হিল থেকে নিচে পুরো কাঠমাণ্ডু শহর দেখা যাচ্ছিল। আকাশে পূর্ণ চাঁদ, নিচে অসংখ্য আলো। দূরের শহরটিকে তখন ব্যস্ত নগরী মনে হচ্ছিল না ; মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ভেতর কেউ অসংখ্য প্রদীপ সাজিয়ে রেখেছে। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো পড়ছে, গাছপালা নীরব, বাতাস প্রায় স্থির।
চারদিকে এমন গভীর নীরবতা ছিল যে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পিন-ড্রপ সাইলেন্স’- একটি পিন পড়লেও হয়তো শব্দ শোনা যেত। শহর চোখের সামনে, অথচ শহরের কোনো আওয়াজ নেই। মানুষ আছে, গাড়ি চলছে, জীবন চলছে- কিন্তু দূরত্ব সব শব্দকে নিঃশব্দ ছবিতে পরিণত করেছে।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, ধ্যানও হয়তো আমাদের মনের সঙ্গে একই কাজ করে। চিন্তা, উদ্বেগ ও স্মৃতি সবই থাকে ; কিন্তু আমরা যখন গভীরে যাই, তখন তাদের শব্দ আর আগের মতো তীব্র থাকে না। আমরা নিজের জীবনকে একটু দূর থেকে দেখতে পারি- চম্পা দেবীর পাহাড় থেকে কাঠমাণ্ডুকে দেখার মতো। সেই পূর্ণিমার রাতে বাইরের চাঁদের আলো এবং ভেতরের নীরবতা একাকার হয়ে গিয়েছিল।
যে মানুষগুলো নেপালকে আপন করে দিয়েছিল
কোনো দেশকে শুধু পাহাড়, মন্দির ও স্থাপত্য দিয়ে মনে রাখা যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষই একটি স্থানকে আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত রাখে।
নেপালের মানুষের গায়ের রং বাংলাদেশের মানুষের মতোই। অনেককে দেখলে প্রথম মুহূর্তে আলাদা দেশের মানুষ বলে মনে হয় না। তবে, আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাদের সহজ-সরল আচরণ। অধিকাংশ মানুষ হাসিমুখে কথা বলেন এবং সহজেই মিশে যান। ভাষার কিছু পার্থক্য থাকলেও আন্তরিকতার ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
মহর্ষি বৈদিক ইন্সটিটিউটের প্রতিটি মানুষ ছিলেন ভীষণ সহযোগিতাপরায়ণ। কেউ পথ দেখিয়েছেন, কেউ খাবারের খোঁজ নিয়েছেন, কেউ কোনো প্রয়োজন আছে কি না জানতে চেয়েছেন। দীর্ঘ ৩৮ দিনেও নিজেকে বাইরের মানুষ মনে হয়নি।
মাধব প্রসাদ আরিয়াল স্যার ও চেতনা আরিয়ালের বাসায় একদিনের নৈশভোজ ছিল বিশেষ স্মরণীয়। বাড়ির পরিবেশ, আন্তরিক আপ্যায়ন, আলাপ এবং ঘরোয়া খাবার- সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, আমি কোনো আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণে নই ; পরিচিত আত্মীয়ের বাড়িতে বসে আছি।
নেপালে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে- প্রায় সবার বাড়িতেই একটি করে পোষা প্রাণী, বিশেষ করে কুকুর রয়েছে। কোথাও ছোটো, কোথাও বড়ো, কোথাও শান্ত, কোথাও মালিকের চেয়ে অতিথি সম্পর্কে বেশি অনুসন্ধিৎসু। ফলে কোনো বাড়িতে ঢোকার আগে মানুষটির সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি বাড়ির কুকুরটির অনুমোদন লাভ করাও জরুরি।
বাড়ি মনে না পড়ার অপরাধ
সাধারণত দীর্ঘ সফরে কয়েকদিন পরই বাড়ির খাবার, নিজের বিছানা, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মহর্ষি বৈদিক ইন্সটিটিউটের ক্যাম্পাসে টানা ৩৮ দিন থেকেও আমার ভ্রমণক্লান্তি বা তীব্র হোমসিকনেস হয়নি।
এর অর্থ এই নয় যে, পরিবারকে মনে পড়েনি। অবশ্যই পড়েছে। কিন্তু ক্যাম্পাসের পরিবেশে এমন একধরনের আপনত্ব ছিল, যার কারণে নিজেকে কোথাও আটকে থাকা মানুষ মনে হয়নি। বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে, এই পাহাড়, ঝরনা, বৃষ্টি, ধ্যান ও নীরবতার মধ্যে আমি অনন্তকাল থেকে যেতে পারব।
শহরে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করি, অথচ দিনের শেষে মনে হয় কিছুই করা হয়নি। সেখানে প্রতিদিনের কর্মসূচি ছিল নিয়মবদ্ধ, কিন্তু সময়ের ওপর চাপ ছিল না। ধ্যান, বিশ্রাম, জ্ঞান, হাঁটা, প্রকৃতি দেখা এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলা- সবকিছুই যেন নিজের স্বাভাবিক গতিতে চলছিল।
ফেরার দিন যত এগিয়ে আসছিল, আমার ভেতরে একধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল। যে দুর্গম রাস্তা দিয়ে প্রথমদিন ওঠার সময় মনে হয়েছিল আর কোনোদিন এখানে আসব না, ফেরার সময় সেই পথেই মনে হচ্ছিল- আমি আবার কবে ফিরব ?
মানুষের মন সত্যিই অদ্ভুত। আসার সময় খাদ দেখে ভয় পায়, যাওয়ার সময় সেই খাদও আপন মনে হয়।
পাহাড়ের বাইরে আরেকটি পাহাড়
নেপালের সফর আমাকে বুঝিয়েছে, পাহাড় শুধু বাইরেই থাকে না। মানুষের ভেতরেও পাহাড় আছে- ভয়, হতাশা, অহংকার, ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার পাহাড়। বাইরের পাহাড়ে ওঠার জন্য শক্ত পা, সঠিক পথ ও সাহস প্রয়োজন। ভেতরের পাহাড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, আত্মসচেতনতা এবং নিজের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস।
২০২২ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে আমি যখন মানসিক ক্লান্তি ও ব্যবসায়িক হতাশার মধ্যে ছিলাম, তখন জানতাম না সামনে কোন পথ অপেক্ষা করছে। বড়ো ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ধ্যান শেখা থেকে শুরু করে কৌশানী, হায়দ্রাবাদ, অসম এবং অবশেষে নেপালের চম্পা দেবী হিল- প্রতিটি যাত্রাই আমাকে নিজের একটু কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
টিএম সিদ্ধি ও ফ্লাইং ব্লকের ৩৮ দিনের কর্মসূচি আমার কাছে কেবল একটি উচ্চতর ধ্যানের কোর্স ছিল না। এটি ছিল নিজেকে নতুন করে দেখার সময়। পাহাড়ের বিপজ্জনক রাস্তা আমাকে ভয়কে চিনতে শিখিয়েছে। নির্জন জঙ্গল আমাকে সতর্কতা ও সাহসের সম্পর্ক বুঝিয়েছে। ঝরনার অবিরাম শব্দ পরিবর্তনের কথা মনে করিয়েছে। পূর্ণিমার নীরবতা দেখিয়েছে, কোলাহলের মাঝেও স্থিরতা সম্ভব। আর নেপালের মানুষ শিখিয়েছেন, আন্তরিকতা থাকলে অচেনা দেশও ঘর হয়ে উঠতে পারে।
আমি নেপাল থেকে কোনো বিজয়ী পর্বতারোহী হয়ে ফিরিনি। কোনো বিখ্যাত শৃঙ্গ জয় করিনি। বরং পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, জয় করার সবচেয়ে কঠিন জায়গা সম্ভবত নিজের মন।
ফেরার পথে গাড়ি যখন চম্পা দেবী হিলের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে নিচে নামছিল, এবারও খাদ ছিল, বাঁক ছিল, ভয় ছিল। কিন্তু প্রথম দিনের মতো আতঙ্ক ছিল না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে পাহাড় দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই পথটি এখন পরিচিত। হয়তো পথ বদলায়নি ; বদলেছি আমি।
নিচে কাঠমাণ্ডু শহর, ওপরে মেঘে ঢাকা পাহাড়। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। পেছনে পড়ে থাকছে মহর্ষি বৈদিক ইন্সটিটিউটের ক্যাম্পাস, ঝরনার গান, ধ্যানকক্ষ, ভেজা জঙ্গল, পূর্ণিমার আলো এবং কয়েকজন অসাধারণ মানুষ।
আমি জানতাম, দেশে ফিরে আবার কাজ থাকবে, হিসাব থাকবে, সমস্যা থাকবে। কিন্তু এবার সঙ্গে থাকবে আরেকটি জিনিস- নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার পথ।
চম্পা দেবীর সেই পাহাড়ে হয়তো আমি প্রথমবার গিয়েছিলাম একটি কোর্স করতে। কিন্তু ফিরে এসেছি একটি নীরব প্রতিশ্রুতি নিয়ে- আমি আবার সেখানে যাব। বারবার যাব। কারণ, কিছু জায়গা আমরা শুধু দর্শন করি না ; কিছু জায়গা আমাদের ভেতরে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে।
নেপাল আমার কাছে তেমনই একটি জায়গা- হিমালয়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে যেখানে আমি পৃথিবীকে যতটা দেখেছি, তার চেয়ে বেশি দেখেছি নিজেকে।