রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মে [২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ]। কৈশোরে স্বগৃহে উপনিষদ এবং এর পাশাপাশি পারস্যসাহিত্যের চর্চা [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাকবি হাফিজের কবিতার অনুরক্ত বা ভক্ত ছিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে পারস্যের সুফি কবিদের কাব্য পাঠ এবং তা সম্পর্কে আলোচনা হতো নিত্যদিন।], বাংলার পদ্মাতীরবর্তী জনজীবন ও বাউলদর্শন, ইংল্যান্ড-আমেরিকায় অবস্থানকালীন ইউরোপীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির অভিজ্ঞান এবং পরবর্তীকালে নানান দেশের জ্ঞানী-গুণীজনদের সঙ্গে সখ্য ও ভাববিনিময় রবীন্দ্রনাথের মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অল্প বয়সে মা সারদা দেবী [১৮৭৫], প্রিয়তম নতুন ‘বৌঠান’ কাদম্বরী দেবী [১৮৮৪]-কে চিরতরে হারিয়ে ফেলার দুঃখবোধও রবীন্দ্র-মানস গঠনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মা ও প্রিয় ‘বৌঠান’র মৃত্যু কবিকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করে যে, কৈশোর-উত্তীর্ণ বয়সেই কবির কাছে মৃত্যুকে পরম প্রিয়জনের (শ্যাম, শ্রীকৃষ্ণ) সমান বলে প্রতীয়মান হয়। তাই ব্রজবুলি ভাষায় তিনি রচনা করেন, ‘মরণ রে,/ তুঁহুঁ মম শ্যামসমান’ [মরণ]। এই কবিতায় তিনি সুম্পষ্টভাবেই বলেন যে, মৃত্যু অমৃত দান করে।
কুড়ি-একুশ বছর বয়স থেকে কবি গীতিকবিতা লিখতে শুরু করেন [প্রথম সার্থক গীতি কবিতা : ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ১৮৮২]। এর পাশাপাশি শুরু হয় গদ্যরচনাও [প্রথম গল্প ‘ভিখারিণী’ ১৮৭৭; প্রথম উপন্যাস ‘বৌ-ঠাকুরাণীর হাট, ১৮৮৩]। রবীন্দ্রনাথের রচনাসম্ভার বিপুল ও বৈচিত্র্যময়। বিস্ময়কর সৃজনী প্রতিভা দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেন বাংলা সাহিত্যকে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাই তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধি লাভ করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, শিশুসাহিত্য, পত্রসাহিত্য, সর্বোপরি সংগীতে বিপুল সৃজনশীলতা তাঁকে এনে দেয় ঈর্ষণীয় সম্মান। আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে রবীন্দ্রনাথ বায়ান্নটি কাব্যগ্রন্থ, আটত্রিশটি নাটক, তেরটি উপন্যাস এবং আটত্রিশটি গ্রন্থভুক্ত চার শতাধিক প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন রচনা করেন। তাঁর সর্বমোট পঁচানব্বোইটি ছোটোগল্প এবং একহাজার নয়শ’ পনেরটি গান যথাক্রমে ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘গীতবিতান’ নামক সংকলনের অন্তর্ভুক্ত। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়াও তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি অঙ্কন করেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি বা সাহিত্যিক নন, তিনি একজন কর্মযোগী মহান পুরুষ ও দার্শনিক হিসেবেও বিশ্বে নন্দিত। তিনি বাঙালি জাতির চিন্তা, চেতনা এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বায়ন, সংকটের মুহূর্তে মানবিকতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং আধুনিক শিক্ষাদর্শনে তাঁর চিন্তাধারা এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলার ছয়টি ঋতুর যে বৈচিত্র্য তা বাঙালিকে হাতে ধরে চেনান রবীন্দ্রনাথ। এবং, তা কেবল তাঁর কবিতা ও গানেই সীমাবদ্ধ নয়, ঋতুভিত্তিক উৎসব যেমন, ‘বর্ষামঙ্গল’, ‘বসন্তউৎসব’ ‘শারদোৎসব’, ‘বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ-উৎসব’ প্রভৃতি প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে তিনি ঋতুর বৈচিত্র্য, বাঙালির জীবনে ঋতুর প্রভাব, ঋতুতে ঋতুতে চাষাবাদ, ফসল তোলার মৌসুম চিহ্নিত করেন এবং মধ্যবিত্ত সমাজকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।
রবীন্দ্রসাহিত্যে বিশেষত, তাঁর গান ও কবিতায় মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেম একইসূত্রে গাঁথা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নন, বরং তিনি মানুষের মধ্যে বিরাজমান। ঈশ্বরপ্রেম ও মানবপ্রেমের এই একাত্মতার ধারণা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সঞ্চারিত হয় পূর্ব-বাংলার বাউলদর্শনের প্রভাবে। তিনি ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবার পূর্ব-বাংলায় আসেন। জমিদারির দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাস থেকে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রায় একযুগ [১৯৮৯-১৯০১] অবস্থান করেন। পূর্ব-বাংলার গ্রামীণজীবন, নিরন্ন মানুষ, এখানকার শ্রমজীবী মানুষের কঠোর জীবনসংগ্রাম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যহীনতা একদিকে তাঁকে যেমন ব্যথিত ও চিন্তিত করে তোলে অন্যদিকে তেমনি পদ্মানদী, নদীতীরবর্তী নিসর্গ আর মরমি বাউলদর্শন তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। পূর্ব-বাংলায় আসার পর রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন এই বাংলার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কৃষি-সমবায়, কৃষিব্যাঙ্ক, দাতব্য চিকিৎসালয়, আধুনিক চাষাবাদের প্রবর্তন করেন তেমনি লালন ফকির ও গগন হরকরার গান এবং বাউলদের মানবতাবাদী দার্শনিকতায় আকৃষ্ট হন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় যখন ব্রিটিশ-প্ররোচনায় বাংলাকে ভাগ করা হচ্ছিল তখন বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং মাটির টানে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি। গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় [১৯৭১] বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। এ গানের সুর রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেন বাউল সাধক গগন হরকরার [শিলাইদহ ডাকঘরের চিঠি বিলি করতেন] ‘আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ গানের ওপর ভিত্তি করে। লালন-ভক্ত গগন হরকরার সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন এবং তাঁর এই গানটি কবির এতই প্রিয় ছিল যে, ফ্রান্সে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি গানটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনেক রবীন্দ্র-গবেষক মনে করেন, কবির ধর্মদর্শন ও পূর্ব-বাংলার বাউলদর্শন একই সূত্রে গাঁথা- যে-দর্শন মূলত মানবতাবাদ, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও আধ্যাত্মিকতাকে এক মোহনায় দাঁড় করিয়ে দেয়, যা কবির নোবেল বিজয়ী গীতাঞ্জলি : সং অফারিংস গ্রন্থেরও মৌল দর্শন। ১৯১৩ খ্রিষ্টব্দে ‘গীতাঞ্জলি : সং অফারিংস’ (এরঃধহলধষর : ঝড়হম ড়ভভবৎরহমং) গ্রন্থের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেলে বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষা পায় গৌরবময় সম্মান। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী বিপুল হারে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতি সম্পর্কে জানতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে ভালোবাসতেন। পূর্ব-বাংলায় পদ্মানদী, নদীতীরবর্তী গ্রাম, পদ্মায় ভাসমান বোট তাঁর খুবই প্রিয় ছিল। গাছপালাবেষ্টিত শান্তিনিকেতন ছিল কবির গভীর অনুরাগ ও ভালোবাসার তীর্থভূমি। রবীন্দ্রভাবনায় নিসর্গ বা প্রকৃতি কেবলই পটভূমি বা পরিবেশ নয়, বরং এটি এক সজীব, স্পন্দনশীল ও জীবন্ত সত্তা। রবীন্দ্র-রচনায় প্রকৃতি মানবাত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিত্রিত, যেখানে ঋতুচক্রের পরিবর্তন, ফুল, নদী ও আকাশ মানুষের আনন্দ, বেদনা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকে। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মানবসত্তা ও মহাবিশ্বের প্রাণপ্রবাহ একই সূত্রে গাঁথা। ঋতুর পরিবর্তন রবীন্দ্রকাব্যে ও গানে নতুন মাত্রা যোগ করে। বর্ষার স্নিগ্ধতা ও রোমান্টিকতা, বসন্তের পুষ্পিত আনন্দ এবং শরতের শুভ্রতা, গ্রীষ্মের গম্ভীর দাবদাহ তাঁর সাহিত্যকে এক অপরূপ সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। কবির লেখায় প্রকৃতির প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক যোগ তৈরি হয়, তার মূলে রয়েছে উপনিষদের দর্শন। প্রকৃতিকে তিনি স্রষ্টার বিশাল ক্যানভাস হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। মানুষের হাসি-কান্না, বিরহ ও মিলন- প্রকৃতি যেন তার নিজের ভাষায় প্রকাশ করে। তাঁর পত্রসাহিত্য, ছোটোগল্প ও উপন্যাসেও প্রকৃতি ও মানুষ গভীর আবেগে জড়াজড়ি করে আছে।
সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যে নারী বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। রবীন্দ্রনাথের নারী একাধারে প্রেমিকা, মানবী, জননী ও শক্তিরূপিণী। প্রেম ও প্রকৃতির পাশাপাশি তাঁর নারী চরিত্রেরা ব্যক্তিমর্যাদা, আত্মশক্তি এবং সমাজ-সংসারের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি-আকাক্সক্ষী। রবীন্দ্রকাব্যে ও কথাসাহিত্যে তাঁরা কালজয়ী রূপে চিত্রিত। তাঁর কবিতায় নারী ও প্রকৃতি যেন সমার্থক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে নারীর যে অবদমন তাকে স্বীকার করে নিয়ে কবি তাঁর নারীদের প্রতিবাদী ও আত্মমর্যাদাশীল করে সৃজন করেন। নারীকে তিনি রূপায়ণ করেন জগতের প্রাণশক্তিরূপেও।
ভারতবর্ষে বিশ্বায়ন তথা পূর্ব-পশ্চিমের বিনিময় গড়ে তোলার প্রথম কাণ্ডারি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় [১৭৭২-১৮৩৩] তারপর উদ্যোগী হন প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার আধুনিক ভাষ্যকার স্বামী বিবেকানন্দ [১৮৬৩-১৯০২]। এর বাইরে রবীন্দ্রনাথেরই সমবয়সী ঘনিষ্ঠ বন্ধু এশিয়ার প্রথম শিল্পোন্নত দেশ জাপানের চিন্তাবিদ, পণ্ডিত ওকাকুরা কাকুজো [১৮৬২-১৯১৩] বিশ্বয়নের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। এই তিন মনীষীর গভীর প্রভাব পড়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ভীষণ বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের একতায়। একের সঙ্গে অপরের লেনাদেনায়। নানা সাংস্কৃতিক ও ভাষিক ঐতিহ্যের মিলন ঘটবে, সারাবিশ্বের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা এসে প্রকৃতির মাঝে জীবনের পাঠ নেবে- এমন আকাক্সক্ষা থেকেই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ‘বিশ্বভারতী’ প্রতিষ্ঠা করেন।

রবীন্দ্রসাহিত্যের একটি বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে কবির মৃত্যুভাবনা। মৃত্যুকে কবি কখনো বিচ্ছেদ বলে বিবেচনা করেননি। অল্প বয়সে আপনজনের মৃত্যু তাঁকে এমন গভীর ভাবনার জগতে নিবিষ্ট করে যে, মৃত্যুকে তিনি সর্বদা জীবনের সমান্তরাল, জীবনের পূর্ণতা হিসেবে গৌরবান্বিত করেন। কবির যখন ৪২ বছর বয়স তখন তিনি লেখেন, “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু আনন্ত জাগে ॥/তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা/বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।” তারও নয় বছর আগে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে [১৮৯৪] রচিত ‘মৃত্যুর পরে’ কবিতায় কবি বলেন,, “জীবনে যা প্রতিদিন/ছিল মিথ্যা অর্থহীন/ছিন্ন ছড়াছড়ি/মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি/তারে গাঁথিয়াছে আজি/অর্থপূর্ণ করি-”। মৃত্যু কোনো ধ্বংস বা ভীতি নয়, বরং তা জীবনকে পরিপূর্ণ শান্তিতে রূপ দেয়। মৃত্যুতে পার্থিব ভালো-মন্দ ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মা পরম শান্তির আশ্রয় খুঁজে পায়। আর মৃত্যুর তিন মাস পূর্বে ‘রূপ-নারাণের কূলে’ কবিতায় কবির উপলব্ধি আরও গভীরতা পায়। কবি জানিয়ে যান যে, জীবনের প্রকৃত রূপ ও নিজেকে চেনা যায় দুঃখ-কষ্ট ও আঘাতের মাধ্যমে- এই সত্য কখনো মানুষকে ঠকায় না, আর এর মধ্যদিয়েই জীবনের সত্য অর্জন করতে হয়, মৃত্যু জীবনের সকল দেনা শোধ করে দেয়। কবিতা ও গান ছাড়াও কথাসাহিত্যেও কবি মৃত্যুকে মহিমান্বিত করেন জীবনেরই পরিপূর্ণ অংশ হিসেবে।
মৃত্যুর [৭ই আগস্ট ১৯৪১/২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ] পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ পূর্ব-পশ্চিমকে মেলানোর আকাক্সক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে নিজের আশি বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তিনি যে-অভিভাষণ রচনা করেন, তার নাম- ‘সভ্যতার সংকট’। সভ্যতার নামে পশ্চিমাদের আগ্রাসীনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত সংকট থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষের প্রতিই আস্থাশীল ছিলেন। তাঁর কাছে মানুষ এবং মানুষের মর্যাদাই ছিল প্রথম ও শেষ কথা। শেষ অভিভাষণে বিশ্বকবি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, একদিন এই প্রাচ্য দেশ থেকেই উন্মোচিত হবে মনুষ্যমর্যাদা ফিরে পাওয়ার পথ। একদিন এমন কেউ একজন আসবেন, যিনি সকল বাধা ছিন্ন করে পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে মিলন ঘটাবেন এবং মানবের জয় ঘোষণা করবেন। ‘সভ্যতার সংকট’ অভিভাষণে কবি বলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।”
রবীন্দ্রনাথের নারীরা এখনো সমাজের কুটিল শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পুবে কিংবা পশ্চিমে মনুষ্যমর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পশ্চিমা অশুভ শক্তির আগ্রাসী ভূমিকা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, শুধু রূপ বদল হয়েছে। প্রকৃতি লুণ্ঠিত, বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষের হাতে। পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে মেলবন্ধন সুদূর পরাহত। মানুষ এখন মানুষের প্রতি আস্থাশীল নয়। বাঙালির যাপিত জীবনে কবিগুরু তাই এখনো অনিবার্যভাবেই প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় নন্দিত। তিনি যথার্থই ‘বিশ্বকবি’। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনা, কৃষি সমবায়, শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও বহুবিদ আর্থ-সামাজিক কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত ছিলেন। ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থের ‘পরিচয়’ কবিতায় নিজের সম্পর্কে কবি বলেছেন- ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়, এই হোক আমার শেষ পরিচয়’...। রবীন্দ্রনাথ চিরকাল মানুষের কবিই হয়ে থাকবেন।