জাল ছুড়ে আবারও ইতিহাসে স্পাইডার-ম্যান

27 Aug 2026, 03:11 PM মুভিমেলা শেয়ার:
জাল ছুড়ে আবারও ইতিহাসে স্পাইডার-ম্যান


টম হল্যান্ডের ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’, বক্স অফিসের ঝড় ও এক সুপারহিরোর দুই দশকের গল্প

একটি মাকড়সার কামড়। তারপর বদলে যাওয়া এক সাধারণ কিশোরের জীবন। দেয়ালে উঠে যাওয়া, ভবনের ছাদ থেকে ছাদে লাফ দেওয়া, হাত থেকে জাল ছুড়ে আকাশে দুলতে দুলতে ছুটে চলা- সিনেমার পর্দায় স্পাইডার-ম্যানের এই দৃশ্যগুলো এখন কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে পরিচিত। কিন্তু এত বছর পরও কেন এই চরিত্রের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে না ? উত্তরটা সম্ভবত পিটার পার্কারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। কারণ, তিনি শুধু একজন সুপারহিরোই নন ; তিনি আমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ, যার জীবনে আছে ভয়, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, হারানোর কষ্ট এবং দায়িত্বের চাপ।

আর সেই পিটার পার্কার যখন টম হল্যান্ডের মুখে ফিরে আসে, তখন যেন পুরনো গল্পটিও নতুন করে প্রাণ পায়। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পাওয়া ‘স্পাইডার-ম্যান : ব্র্যান্ড নিউ ডে’ তারই আরেকটি প্রমাণ। মুক্তির পর মাত্র কয়েক দিনেই ছবিটি বক্স অফিসে এমন ঝড় তুলেছে, যা আবারও প্রমাণ করেছে- স্পাইডার-ম্যান এখনো হলিউডের অন্যতম বড়ো ‘বক্স অফিস ম্যাজিক’।


শুরুতেই ইতিহাস

প্রথম সপ্তাহান্তেই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ‘স্পাইডার-ম্যান : ব্র্যান্ড নিউ ডে’। উত্তর আমেরিকায় ছবিটির উদ্বোধনী আয়ও ছিল রেকর্ড গড়া। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলে সিনেমাটি। ফলে মার্ভেল ও সনি পিকচার্সের জন্য এটি শুধু আরেকটি সফল সিনেমা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ের বক্স অফিস-দুশ্চিন্তার মধ্যেও বড়ো স্বস্তির খবর।

প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ছবিটির এই সাফল্য নির্মাতাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছবিটি দর্শক টেনেছে বিপুলসংখ্যায়। চীন, যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজারে দারুণ ব্যবসা করেছে সিনেমাটি।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্ভেলের কয়েকটি বড়ো বাজেটের সিনেমা প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি। ‘দ্য মার্ভেলস’ কিংবা ‘থান্ডারবোল্টস’-এর মতো সিনেমা নিয়ে দর্শক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা হয়েছে। এমন সময়ে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর এই সাফল্য যেন মার্ভেলকে আবারও মনে করিয়ে দিল- সব সুপারহিরো সমান নয়, আর স্পাইডার-ম্যান এখনো আলাদা।


নতুন ছবিতে নতুন পিটার

‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ নামটির মধ্যেই যেন নতুন শুরুর ইঙ্গিত রয়েছে। ‘স্পাইডার-ম্যান : নো ওয়ে হোম’-এর ঘটনাবলির পর পিটার পার্কারের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। পৃথিবীর মানুষ তার পরিচয় ভুলে যায়। তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কাছেও সে হয়ে যায় একজন অচেনা মানুষ। এই একাকিত্বই নতুন গল্পের আবেগের বড়ো জায়গা।

পিটার এবার নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিয়ে স্পাইডার-ম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চায়। অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই, মানুষের জীবন বাঁচানো এবং শহরকে নিরাপদ রাখাই যেন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু যতই সে নিজের আবেগকে দূরে সরাতে চায়, ততই তার সামনে ফিরে আসে পুরনো প্রশ্ন- একজন সুপারহিরো কি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে পারে ?

নতুন সিনেমার গল্পে তাই শুধু অ্যাকশন নয়, রয়েছে পিটার পার্কারের মানসিক পরিবর্তন, একাকিত্ব ও দায়িত্ববোধের টানাপোড়েনও।

পরিচালনায় রয়েছেন ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন। টম হল্যান্ডের সঙ্গে এই ছবিতে আছেন জেনডায়া, স্যাডি সিনক, জ্যাকব ব্যাটালন, জন বার্নথাল ও মার্ক রাফালো। ফলে ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ শুরু থেকেই ছিল তুঙ্গে।


টোবি থেকে টম : এক চরিত্রের তিন মুখ

স্পাইডার-ম্যানের সিনেমার ইতিহাস বলতে গেলে আসলে কয়েক প্রজন্মের অভিনেতার গল্পও বলা হয়। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে টোবি ম্যাগুয়ার অভিনীত ‘স্পাইডার-ম্যান’ আধুনিক সুপারহিরো সিনেমার দুনিয়ায় নতুন অধ্যায় তৈরি করে। স্যাম রাইমির পরিচালনায় নির্মিত ছবিতে পিটার পার্কারের সাধারণ জীবন থেকে সুপারহিরো হয়ে ওঠার গল্প দর্শকদের মুগ্ধ করে। গ্রিন গবলিনের সঙ্গে লড়াই, মেরি জেনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পিটার পার্কারের দ্বিধা- সব মিলিয়ে ছবিটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে আসে ‘স্পাইডার-ম্যান ২’। ডক্টর অক্টোপাসের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি পিটারের ব্যক্তিগত সংকটকে এখানে আরো গুরুত্ব দেওয়া হয়। ট্রেনের সেই বিখ্যাত অ্যাকশন দৃশ্য আজও সুপারহিরো সিনেমার অন্যতম আলোচিত দৃশ্য।

২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ‘স্পাইডার-ম্যান ৩’ ছিল টোবি ম্যাগুয়ারের ট্রিলজির শেষ অধ্যায়। ব্ল্যাক স্যুট, স্যান্ডম্যান ও ভেনম- একাধিক ভিলেনের উপস্থিতিতে গল্পটি বড়ো পরিসর পায়। সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও বক্স অফিসে ছবিটি দারুণ সফল হয়।

এরপর আসে অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের যুগ। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’ এবং ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান ২’-এ নতুনভাবে পিটার পার্কারকে দেখা যায়। গারফিল্ডের পিটার ছিল কিছুটা বেশি আবেগপ্রবণ, রোমান্টিক এবং বিদ্রোহী। এমা স্টোনের সঙ্গে তার রসায়নও দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

তারপর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা : সিভিল ওয়ার’-এর মাধ্যমে আসে নতুন মুখ- টম হল্যান্ড।


টম হল্যান্ডের স্পাইডার-ম্যান

টম হল্যান্ড যখন প্রথম পিটার পার্কারের পোশাক পরেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। তার চেহারায় ছিল কিশোরসুলভ সরলতা, অভিনয়ে ছিল প্রাণবন্ততা, আর শারীরিক সক্ষমতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ‘স্পাইডার-ম্যান : হোমকামিং’ ছিল তার প্রথম একক সিনেমা। পিটার পার্কারের স্কুলজীবন, বন্ধুত্ব, নিজের ক্ষমতা নিয়ে দ্বিধা এবং আয়রন ম্যানের সঙ্গে সম্পর্ক- সব মিলিয়ে চরিত্রটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরো কাছের করে তোলেন হল্যান্ড।

এরপর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘স্পাইডার-ম্যান : ফার ফ্রম হোম’। এবার পিটারকে দেখা যায় আরো বড়ো এক অভিযানে। বিশ্বজুড়ে ছবিটি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে।

কিন্তু ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ‘স্পাইডার-ম্যান : নো ওয়ে হোম’ ছিল অন্যরকম। মাল্টিভার্সের গল্প, টোবি ম্যাগুয়ার ও অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের প্রত্যাবর্তন এবং পিটার পার্কারের আবেগঘন যাত্রা- সব মিলিয়ে সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে নস্টালজিয়ার ঢেউ তৈরি করে। প্রায় ১.৯২ বিলিয়ন ডলার আয় করে ছবিটি স্পাইডার-ম্যান ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে বড়ো বাণিজ্যিক সাফল্যগুলোর একটিতে পরিণত হয়।


স্পাইডার-ম্যানের বাইরের টম

১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন ইংল্যান্ডের লন্ডনে জন্ম টম হল্যান্ডের। ছোটোবেলা থেকেই নাচ ও অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। মঞ্চে কাজ করার অভিজ্ঞতার পর চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি।

২০১২ খ্রিষ্টাব্দে ‘দ্য ইম্পসিবল’ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসা পান। এরপর ‘দ্য লস্ট সিটি অব জেড’, ‘দ্য ডেভিল অল দ্য টাইম’, ‘চেরি’সহ বিভিন্ন ছবিতে কাজ করেছেন। অর্থাৎ স্পাইডার-ম্যানের বিশাল জনপ্রিয়তার আড়ালে নিজেকে শুধু সুপারহিরো অভিনেতা হিসেবে আটকে রাখতে চাননি হল্যান্ড। তবে, সত্যিটা হলো, বিশ্বজুড়ে তাকে তারকা বানিয়েছে পিটার পার্কারই।

একসময় যে অভিনেতা মার্ভেলের ছবিতে তুলনামূলক কম পারিশ্রমিকে কাজ শুরু করেছিলেন, কয়েকটি সফল সিনেমার পর তার পারিশ্রমিক দ্রুত বাড়তে থাকে। ‘হোমকামিং’, ‘ফার ফ্রম হোম’ ও ‘নো ওয়ে হোম’-এর সাফল্যের পর হলিউডের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন তরুণ তারকায় পরিণত হন তিনি। ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর জন্যও তার পারিশ্রমিক ও বক্স অফিস বোনাস মিলিয়ে কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেনডায়ার সঙ্গে পর্দার রসায়ন

টম হল্যান্ডের স্পাইডার-ম্যান গল্পে জেনডায়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এমজে চরিত্রে জেনডায়ার উপস্থিতি পিটার পার্কারের গল্পে যোগ করেছে আবেগের অন্য মাত্রা।

বাস্তব জীবনেও টম হল্যান্ড ও জেনডায়ার সম্পর্ক নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ফলে পর্দায় তাদের রসায়নও সিনেমার জনপ্রিয়তার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। তবে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-তে পিটার ও এমজের সম্পর্ক আগের মতো সহজ নয়। ‘নো ওয়ে হোম’-এর পর তাদের সম্পর্কের অবস্থান বদলে গেছে। এই দূরত্বই নতুন ছবির আবেগকে আরো গভীর করেছে।


শুধু পিটার পার্কার নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতি

স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে বড়ো শক্তি এখানেই। ব্যাটম্যান, আয়রন ম্যান কিংবা সুপারম্যানের মতো বিশাল ক্ষমতাধর চরিত্রের তুলনায় পিটার পার্কার অনেক বেশি সাধারণ। তারও পড়াশোনা আছে, বন্ধু আছে, প্রেম আছে, ভুল করার ভয় আছে। সে সবসময় নিখুঁত নয়। আর এই অসম্পূর্ণতাই তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছে।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দের টোবি ম্যাগুয়ারের স্পাইডার-ম্যান যারা দেখেছিল, তারা আজ বড়ো হয়েছে। তাদের সন্তানরা হয়তো টম হল্যান্ডের স্পাইডার-ম্যান দেখে বড়ো হচ্ছে। মাঝখানে এসেছে অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের সময়। অ্যানিমেশনে এসেছে মাইলস মোরেলেস। অর্থাৎ স্পাইডার-ম্যান শুধু একটি সিনেমা ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়, এটি একাধিক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ‘স্পাইডার-ম্যান : ইন টু দ্য স্পাইডার-ভার্স’ এবং ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ‘অ্যাক্রস দ্য স্পাইডার-ভার্স’ও দেখিয়েছে, এই চরিত্রের গল্পের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ভিন্ন পৃথিবী, ভিন্ন পিটার, ভিন্ন স্পাইডার-ম্যান- তবু সবার মূল কথাটি একই : ক্ষমতার সঙ্গে আসে দায়িত্ব।


সামনে আরো বড়ো লড়াই

‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর সাফল্য শুধু টম হল্যান্ড বা সনি পিকচার্সের জন্য নয়, মার্ভেল স্টুডিওর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক কিছু ব্যর্থতার পর এই সাফল্য স্টুডিওকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সামনেই রয়েছে মার্ভেলের আরো বড়ো আয়োজন ‘অ্যাভেঞ্জার্স : ডুমসডে’। ফলে স্পাইডার-ম্যানের এই বক্স অফিস সাফল্য মার্ভেলের পরবর্তী পরিকল্পনার জন্যও ইতিবাচক বার্তা।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্পাইডার-ম্যান বারবার নিজের পোশাক বদলেছে, অভিনেতা বদলেছে, গল্প বদলেছে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি- দর্শকের ভালোবাসা।

টোবি ম্যাগুয়ারের আবেগঘন পিটার, অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের রোমান্টিক পিটার আর টম হল্যান্ডের তরুণ, মজার কিন্তু ভেতরে ভীষণ একাকী পিটার- তিনজনই নিজেদের সময়ের স্পাইডার-ম্যান। আর ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ যেন সেই দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি নতুন অধ্যায়। জাল ছুঁড়ে পিটার আবারও আকাশে উড়েছে। আর বক্স অফিসের অঙ্ক বলছে- তার পেছনে ছুটতে এখনো প্রস্তুত পুরো পৃথিবী। স্পাইডার-ম্যানের গল্প তাই শেষ হয়নি। এটি সত্যিই এক নতুন দিন।

লেখা : ফাতিমা ইয়াসমিন