বাংলার মাটি ও মানুষের গান হৃদয়ে ধারণ করে সংগীতাঙ্গনে দ্রুত নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন উদীয়মান প্রতিভারা। তাদেরই একজন তরুণ ও প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী মেহজাবিন মোবাশ্বেরা। জামালপুরের ছোট্টো শহর থেকে শুরু করে জাতীয়পর্যায় পর্যন্ত তার সংগীতের যাত্রা এক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। আনন্দভুবনের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি শুনিয়েছেন সংগীতচর্চা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লোকগানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা গল্প। লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
সংগীতের হাতেখড়ি ও শুরুর গল্প
চার বছর বয়স থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে গানের সঙ্গে পথচলা শুরু মেহজাবিনের। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’য় শফি মণ্ডল ও বিন্দু কনার জনপ্রিয় ডুয়েট গান ‘বন্ধুরে কই পাবো সখি গো’ মোবাইলে শুনে শুনে তা মুখস্থ করার মাধ্যমেই সংগীতের প্রতি তার প্রথম অনুরাগ তৈরি হয়। গানটি যখন গাইতেন তখন তার মামা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। তার মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। সেই স্কুলেই তিনি পড়তেন। নিজের স্কুলে একদিন গান গেয়ে মুগ্ধ করেন সবাইকে। পরবর্তীসময়ে মায়ের স্কুল থেকেই শুরু হয় তার মঞ্চযাত্রা।
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে জামালপুর শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ওস্তাদ সেলিনা বেগম, কনা রহমান ও কানু দেবের পাশাপাশি পরবর্তীসময়ে ওস্তাদ সঞ্জীব সেনের কাছে তিনি নিয়মতান্ত্রিক তালিম নেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম, ১২তম ও ১৩তম শাপলাকুঁড়ি, জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতা, জাতীয় শিক্ষাসপ্তাহ, মঞ্চকুঁড়ি, নতুনকুঁড়ি ২০২৫ এবং সর্বশেষ ম্যাজিক বাউলিয়ানা ২০২৫-এ প্রথম রানার-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করার পর থেকেই আলোচনায় আসেন তিনি।
বর্তমান ব্যস্ততা ও ফোক গানের প্রতি ভালোবাসা
বর্তমানে টেলিভিশন প্রোগ্রাম, স্টেজ শো এবং পড়াশোনা নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন এই শিল্পী। পাশাপাশি বেশকিছু গানের কাজ চলছে। আশা করছেন অল্পসময়ের মধ্যেই সেগুলো আসবে। ফোক গানকে তিনি নিজের ধ্যানজ্ঞান ও ভালোবাসার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফোক ছাড়াও নজরুল সংগীত, ক্লাসিক্যাল ও আধুনিক গান গাইতে পছন্দ করলেও লালন সাঁইজির গানই তার প্রধান আত্মিক খোরাক।
লোকগানের জনপ্রিয়তা কমে গেছে এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন মেহজাবিন। বরং তিনি মনে করেন, লোকগানের আবেদন আগের চেয়ে আরো বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে গায়কি ও বাদ্যযন্ত্রে কিছু পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে লোকগানের আবেদন কখনো হারিয়ে যাবে না। বাংলা ভাষা, বাংলার মাটি ও সংস্কৃতির মতোই লোকসংগীতও চিরকাল মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকবে।

জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত ও প্রেরণা
ম্যাজিক বাউলিয়ানার যাত্রাটি তার জন্য ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রতিযোগিতার ঠিক চার মাস আগে তার বাবার হঠাৎ এক্সিডেন্টে পায়ের রগ কেটে যাওয়ায় পুরো পরিবারকে ট্রমার মধ্যে ফেললেও, সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। এর আগে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় নজরুল, লোকগান, ছড়াগান ও দেশাত্মবোধক- চারটি ক্যাটাগরিতেই প্রথম স্থান অর্জন করা তার সংগীত জীবনের অন্যতম সেরা ও অপ্রত্যাশিত স্মৃতি।
তার প্রিয় শিল্পী গুরুজি শফি মণ্ডল ও ফরিদা পারভীন। নিজের গাওয়া গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় লালন সাঁইজির ‘বড়ো সংকটে পড়িয়া দয়াল বারে বারে ডাকি তোমায় ক্ষম ক্ষম অপরাধ’। এই গানটির কথায় তিনি জীবনের গভীর দর্শন খুঁজে পান।
ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদা ও কালো রং পছন্দ করেন, বসন্ত তার প্রিয় ঋতু এবং খাবার তালিকার শীর্ষে রয়েছে বিরিয়ানি।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও শ্রোতাদের প্রতি বার্তা
জামালপুর সিংহ জানি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহজাবিনের ভবিষ্যৎ স্বপ্নও স্পষ্ট। তিনি চান, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলার লোকগান আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠুক। সেই লক্ষ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করছেন প্রতিনিয়ত। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার বিষয় হিসেবেও সংগীতকেই বেছে নিতে চান তিনি।
শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে মেহজাবিন বলেন, ‘আমার গানগুলো ভালোবেসে শুনুন এবং বাংলার লোকগান ভালোবাসুন। লোকগান আপন করে নিন। কারণ এই গানই আমাদের শেকড়, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।’