ফুটবলের জাদুকর : লিওনেল মেসি

30 Jul 2026, 02:44 PM ক্রীড়াভুবন শেয়ার:
ফুটবলের জাদুকর : লিওনেল মেসি

একজন ফুটবলারের নাম যখন একটি প্রজন্মের আবেগ হয়ে ওঠে, তখন তিনি আর শুধু একজন ক্রীড়াবিদ নন- তিনি হয়ে ওঠেন একটি ইতিহাস। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের সেই ইতিহাসের নাম লিওনেল মেসি। নিখুঁত ড্রিবলিং, অবিশ্বাস্য গোল, চোখধাঁধানো পাস এবং বিনয়ী ব্যক্তিত্বের কারণে মেসিকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ফুটবলার [GOAT] হিসেবে বিবেচনা করেন। ছোট্টো এক শহর থেকে শুরু হওয়া তার যাত্রা আজ বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক...


শৈশব : প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়

১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বাবা জর্জ মেসি ছিলেন একটি স্টিল কারখানার কর্মী এবং মা সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনি ছিলেন খণ্ডকালীন কর্মজীবী। ছেলেবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার অসীম ভালোবাসা।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাবে খেলতে শুরু করেন মেসি। কিন্তু ১১ বছর বয়সে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঠিক সেই সময় তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে এফসি বার্সেলোনা। ক্লাবটি শুধু তাকে দলে নেয়নি, চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ও বহন করে। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস।


বার্সেলোনা : এক কিংবদন্তির জন্ম

২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন মেসি। সেখানেই গড়ে ওঠে তার ফুটবল প্রতিভা।

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয়। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ক্লাবটির ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন। তার অসাধারণ পারফর্মেন্সে বার্সেলোনা জয় করেছে অসংখ্য লিগ শিরোপা, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রফি।

বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি শত শত গোল করেছেন এবং অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন। মাঠে তার সঙ্গে জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা এবং সার্জিও বুস্কেটস-এর বোঝাপড়া ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড সমন্বয় হিসেবে বিবেচিত হয়।


নতুন অধ্যায় : প্যারিস থেকে মিয়ামি

২০২১ খ্রিষ্টাব্দে আর্থিক জটিলতার কারণে বার্সেলোনা ছাড়তে বাধ্য হন মেসি। এরপর তিনি প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন এফ.সি.-এ যোগ দেন। সেখানে দুই মৌসুম কাটিয়ে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মিয়ামি সিএফ-এ পাড়ি জমান। বর্তমানে ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলছেন তিনি। তার আগমনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু মাঠেই নয়, বাণিজ্যিক মূল্য, দর্শকসংখ্যা এবং তরুণদের আগ্রহ- সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব স্পষ্ট।


আর্জেন্টিনার স্বপ্ন পূরণ

দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে অসাধারণ খেললেও বিশ্বকাপ জয় ছিল তার অপূর্ণ স্বপ্ন। অবশেষে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।

ফাইনালে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের মাধ্যমে তিনি শুধু ট্রফিই জেতেননি, ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করেছেন। এর আগে তিনি ২০২১ কোপা আমেরিকা এবং ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের কোপা আমেরিকাও জিতেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে।


অর্জনের ঝুলি

মেসির অর্জনের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, তা এককথায় শেষ করা কঠিন। তার উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছ- রেকর্ডসংখ্যক ব্যালন ডি’অর। একাধিক ইউরোপীয় গোল্ডেন বুট। অসংখ্য লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জয়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাদের একজন। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাবা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে মেসির দল আর্জেন্টিনা।


মাঠের বাইরে মেসি

বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে মেসি অত্যন্ত শান্ত ও পারিবারিক মানুষ। ছেলেবেলার বন্ধু আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে বিয়ে করেছেন তিনি। তাদের তিন ছেলে- থিয়াগো মেসি, মাতেও মেসি এবং সিরো মেসি।

পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং সাধারণ জীবনযাপনই তার সবচেয়ে প্রিয়। বিশ্বখ্যাত তারকা হওয়া সত্ত্বেও অহংকার থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য তিনি সর্বত্র প্রশংসিত।

সমাজসেবায় মানবিক মেসি

ফুটবলের পাশাপাশি সমাজসেবায়ও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন মেসি। তার প্রতিষ্ঠিত লিও মেসি ফাউন্ডেশন শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণে কাজ করে। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন মানবিক কাজে যুক্ত রয়েছেন।


কেন তিনি অনন্য

মেসির খেলার সৌন্দর্য কেবল গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার বল নিয়ন্ত্রণ, মুহূর্তেই খেলার গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং বড়ো ম্যাচে অসাধারণ পারফর্মেন্স তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও তিনি বিনয় হারাননি। এই গুণই তাকে কোটি মানুষের কাছে শুধু একজন তারকা নয়, একজন আদর্শ মানুষ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। হ লেখা : শহিদুল ইসলাম এমেল


মেসির ব্যক্তিগত সম্পত্তি

লিওনেল মেসি শুধু ফুটবল মাঠেই নন, ব্যক্তিগত সম্পদ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশ্বের অন্যতম সফল ক্রীড়াবিদ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ক্লাব বেতন, বোনাস, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

মেসির মালিকানায় আর্জেন্টিনা, স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলার কারণে তিনি ফোর্ট লডারডেলে সমুদ্রতীরবর্তী একটি বিলাসবহুল প্রাসাদে বসবাস করছেন। এছাড়া স্পেনের বার্সেলোনার অভিজাত এলাকায় তার দীর্ঘদিনের বাসভবন রয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় অবকাশযাপন কেন্দ্র ইবিজাতেও তার একটি বাড়ি রয়েছে।

মেসির একটি ব্যক্তিগত জেট বিমানও রয়েছে, যা তিনি পরিবার ও পেশাগত ভ্রমণে ব্যবহার করেন। বিমানটির ভেতরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের নামও বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে।

গাড়ির প্রতিও মেসির বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তার সংগ্রহে ফেরারি, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, রেঞ্জ রোভার, অডি এবং ক্যাডিলাক-এর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের একাধিক গাড়ি রয়েছে।

রিয়েল এস্টেটের পাশাপাশি হোটেল ব্যবসাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন পর্যটন শহরে তার নামে পরিচালিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্প রয়েছে, যা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে আরো শক্তিশালী করেছে।

বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া ব্র্যান্ড এডিডাস-এর সঙ্গে মেসির আজীবন চুক্তি রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও তিনি নিয়মিত আয় করেন।

বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মেসির মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার বাংলাদেশি মূল্য প্রায় ১১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। তার সম্পদের বড়ো অংশ এসেছে ফুটবল ক্যারিয়ারের আয়, স্পনসরশিপ, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে।