সাধুর বউ : অমিয়া অমানিতা

30 Jul 2026, 02:33 PM কাভার স্টোরি শেয়ার:
সাধুর বউ : অমিয়া অমানিতা


বলিষ্ঠ, দৃঢ়কায় এক ব্যক্তি প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে কাজ শেষে ফিরে গেল মনিবের বাড়িতে। সেখানে তার বেশ সমাদর আছে বলা যায়।

এমনই এক দৃশ্যের মধ্যদিয়ে শুরু হয় মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’।

এই ‘রইদ’ যেন মানব-অস্তিত্বের আদি থেকে অনন্ত অবধি এক আলোকরেখা এঁকে রেখেছে। বাস্তব জীবনের সূর্যালোকের মতোই এই সত্য মানবজীবনে চিরন্তন।

সাধারণ এক শ্রমিক ও তার স্ত্রী’র অনাড়ম্বর সংসার আর দৈনন্দিন জীবনের ভেতর দিয়ে ঠিক কোন কোন বিষয়কে তুলে ধরলেন পরিচালক ?

পৌরাণিক পটভূমি থেকে ‘রইদ’ কীভাবে বড়ো পর্দায় প্রতিফলিত হলো তা-ই এই লেখার উপজীব্য।

গ্রামের বিত্তশালী এক মনিবের অধীন শ্রমিক সাধু, সরল-সাধারণ একজন লোক। পাশের গ্রামের এক আধা-পাগলি অল্পবয়সী মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়। যদিও গ্রামের প্রতিবেশীদের মতে মেয়েটি পুরোপুরি পাগল। কারণ ? মেয়েটি স্বাধীনচেতা। বাড়ির লক্ষ্মীমন্ত, ঘরোয়া বউদের মতো ঠিক নয় সে... রান্নায়ও পটু নয়। তার জগৎ খুব ছোটো, যেখানে শুধু নিজের সঙ্গী সাধু এবং পোষ্য ছাগল কুলসুমের বসবাস, তাদের জন্য মেয়েটির মনে অনেক ভালোবাসা আছে বৈকি !

সামাজিক মার্জিত আচার-আচরণ মেয়েটির জানা নেই। সে মন খুলে নেচে বেড়ায়, নিজের মর্জিমতো চলে, তাতে কার কী অসুবিধা হতে পারে সে-বিষয়ে তেমন বিচলিত হয় না ; কারণ, সে তো জানেই না তার ভুলটা কোথায় ? কেন সমাজের কাছে সে পাগলি ! পাগলি হওয়াটা ঠিক কতটুকু অন্যায় !

সাধুর অবশ্য বউকে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু, গ্রামের লোকজন তার বউয়ের পাগলামির জন্য তাকে রোজ কথা শোনায়। এমন পরিস্থিতিতে সাধু বেশ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে একদিন মেলায় যাওয়ার নাম করে রাতের আঁধারে বউকে দূরে এক অচিন জায়গায় রেখে আসে। সেই ঠিকানা সাধু নিজেও জানে না। বউকে রেখে এসে সে বলে, বউ নিজেই চলে গেছে। মেয়েটিকে আর খোঁজে না সাধু।

বেশ কিছুদিন পর মেয়েটি হঠাৎ ফিরে আসে। এসেই নিজের মতো করে আবারো গুছিয়ে নেয় সংসার।

এবারে কিন্তু তাকে আর পাগলি বলা চলে না। তালের দারুণ পিঠা বানিয়ে সে সাধুকে খাওয়ায়। ‘এমন স্বাদের পিঠা সাধু বাপের জন্মেও খায়নি।’ ফেলে আসা পাগলি আর ফিরে আসা সাধুর বউয়ের আচরণে বিস্তর ফারাক। সে তেমন কারো সাথে মেশেও না। শুধু সাধুকে তার সাধ্যমতো যত্ন করে।

এই মেয়েটির চরিত্রের সাথে পুরাণের দুই প্রথমার সাদৃশ্য দেখা যায়।

ঘটনার প্রথম পট অনুযায়ী এই পাগলি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রথম নারীসত্তা লিলিথের প্রতিচ্ছবি। লিলিথ ইডেনে বা স্বর্গের বাগান থেকে বিতাড়িত হয়েছিল তার স্বাধীন মনোভাবের কারণে। সে অ্যাডামের অধীনতা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, মানুষ হিসেবে সে স্বতন্ত্র। লিলিথ পুরাণের এক প্রাণবন্ত চরিত্র যে শুধু নিজের মনের কথা শোনে। কিন্তু, তার এই স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে বিবেচিত হয়, পুরাণে তাই সে দানবী আখ্যায় স্বর্গচ্যুত হয়েছিল। অ্যাডামের সঙ্গিনী হিসেবে লিলিথ সম্পূর্ণ অযোগ্য।

ঠিক যেমন এই পাগলি, সমাজে তার প্রাণবন্ত আচরণ পাগলামি। সমাজের নীতি, নিয়ম, ঐতিহ্য, বানানো কিছু মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে একজন মেয়ে যা-ই করুক তাতেই তো সে সমাজের বাইরের একজন বলে প্রতিপন্ন হয় !

তার পরিবেশ আর সমাজে সে ঠিক মানানসই নয়। তাকে তখন পাগলি, দানবী ইত্যাদি নানান নামকরণ করা হয়। তাই এই কাহিনি আজও প্রাসঙ্গিক।

এবারে ঘটনার দ্বিতীয় ধাপ। পাগলি ফিরে এসে লিলিথের মতো আর স্বাধীন, প্রাণবন্ত নেই। বলতে গেলে আগের মতো পাগলি নয় সে। এখন সে সাধুর মনেরমতো বউ। যে সংসার গুছিয়ে রাখতে জানে। এখানে অ্যাডামের জন্য সৃষ্ট ইভের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাচ্ছেন কি ?

লিলিথকে ইডেন থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরে সৃষ্টিকর্তা ইভকে সৃষ্টি করেন। ইভের সত্তা, অস্তিত্ব সবকিছু শুধুই অ্যাডামকে ঘিরে, অ্যাডামের উদ্দেশে।

পৃথিবীতে নারীদের, স্ত্রীদের যে-সকল ভূমিকা থাকে সে-সব পুরাণ থেকে নব্যসভ্যতায় ইভের চরিত্রের মাধ্যমেই তুলে ধরা হয়েছে।

আবারো, রইদের গল্পে ফিরে আসি...

পাগলির সাংসারিক জীবন তালের কল্যাণে এখন মূল ছন্দে [তালে] ফিরে এসেছে। তালের পিঠা বানিয়ে সাধুকে খাইয়ে সে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। সাধুর জীবন এখন বেশ আনন্দময়। তার বউকে এখন সে সত্যিই খুব ভালোবাসে। কারণ, বউয়ের বানানো তালের পিঠার স্বাদ সাধুর কাছে ‘অমৃতসম’।

গ্রামের লোকজনের দাবি সাধুর বউ চোর। মোট কথা, তাদের সমাজে সাধুর বউ ঠিক জুতসই নয়।

এবারে সাধু তার বউকে, ঘরের ভেতর দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। কেউ যেন নতুন করে তাকে কোনো অপবাদ না-দেয়। পাগলকে তো বেঁধেই রাখতে হয় !

একদিন বাড়ি ফিরে সাধু দেখে পাগলি তার জন্য সেই তালের পিঠা বানিয়ে রেখেছে... সাধু তাতে অত্যন্ত অবাক হয়! বাঁধা অবস্থায় সে পিঠা বানাল কী করে ?

কেউ এসেছিল কি না এমন কথা বউকে জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি স্বীকার করে কিন্তু কে এসেছিল তা রহস্যই রয়ে গেল, সাধুর কাছে আর দর্শকের কাছেও।

জেদের বশে সাধু দড়ির বদলে শেকলে বেঁধে রাখলো মেয়েটিকে। তার পায়ে ক্ষত হলো সেই ক্ষতেও মলম লাগালো সাধু !

মেয়েরা তো বিশ্বসংসারে শেকলেই বাঁধা পড়ে... তাই না ? পদে পদে ! প্রয়োজনে তাদের ক্ষতেও মলম লাগানো হয়, কিন্তু বাঁধন খোলা যায় না।

সেদিন হঠৎ সাধুর বাড়িতে আগুন লেগে যায়। বউকে বাঁচাতে সাধু ছুটে বাড়ি ফেরে, এমন দাউদাউ আগুনে কারো পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

সাধুর কোনো মূল্যবান সম্পদ নেই, আছে শুধু অমূল্য এক প্রাণ- তার স্ত্রী।

শেষ আশা হারিয়ে যখন সাধু কেঁদে পাগলপ্রায় তখন হঠাৎ উঠোন থেকে দৌড়ে এলো তার বউ। কিন্তু, যার জন্য এত হাহাকার, তা নিমেষেই চাপা পড়ে গেল সন্দেহের ভারে। শেকলে বাঁধা বউ কীভাবে এমন আগুনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছে সেই বিস্ময় সাধুর মনে প্রশ্ন জাগায়। বউকে সে তার সংসারের জন্য অভিশাপ মনে করে।

অতঃপর আবারো তাকে রেখে আসার পালা। এবারে তার মামাবাড়ির ঘাটে তাকে নামিয়ে দিয়ে এলো সাধু।

এবারে নৌকো থেকে নামার আগে পাগলি বলে,

‘আমি কিন্তু আর ফিরবো না।’

সাধু ফিরে আসে। কিন্তু তার জীবনের ছন্দ ফেরে না। ছন্দপতন হয়েছে তার বউয়ের অনুপস্থিতির কারণে।

কিছুদিনের মধ্যেই তার বউকে সে খুঁজতে গেল, কিন্তু খুঁজে পেল না।

পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে সে আন্দাজ করলো, তাল পাকলে তবেই তার বউ বাড়ি ফিরবে। হলোও ঠিক তাই। ঝড়ের রাতে বাইরে ধুপ করে একটা শব্দ হয়! বেরিয়ে এসে সাধু একটা তাল কুড়িয়ে পায়। সাথে সাথেই সে আশপাশে তার বউকে খুঁজতে থাকে ! পাশেই ঘুমিয়ে ছিল মেয়েটি। বৃষ্টিতে ভিজে কাক। অবাক কাণ্ড ! কীভাবে সাধুর নতুন ঠিকানায় ফিরে এলো সে ?

এখন বলে রাখি এই তালের পিঠাই সেই চিরচেনা জ্ঞানবৃক্ষের ফল।

পৌরাণিক বর্ণনায় কী ছিল এই ‘জ্ঞান’ ? মানুষের মন ও মস্তিষ্কের অনুভূতি, তাড়না, আশা-আকাক্সক্ষার ধারণা বিবিধ উপলব্ধি বৈ আর তো কিছু নয় !

এই ‘জ্ঞান’ হলো আমাদের ‘চৈতন্য’।

সহজ করে বললে, যে মনকে আমরা দেখতে পাই না- যার ঠিকানা জানি না সেই মনের প্রথম জাগরণ, কর্মকাণ্ড শুরু হয় এই ফলের মধ্য দিয়ে।

জ্ঞানবৃক্ষের ফল অ্যাডামকে তথা সমগ্র মানবজাতিকে দিল মানবীয় সকল দোষ-গুণ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ঠিক-ভুল, আলো-আঁধারের হিসাব। নানান মানদণ্ড, বৈপরীত্য, তুলনা করে নিত্য-নতুন দ্বন্দ্ব থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি জানালা।

জ্ঞানবৃক্ষের ফলের কথা যখন থেকে মানুষের জানা, তার অতৃপ্ত এক সত্তা সবসময়ই সেই ফলকে খুঁজে বেড়ায়। হোক তা অবচেতন, কারণ, পার্থিব সকল রহস্যের কেন্দ্রে আছে সেই ফল, তাকে পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষাই মানুষকে অনন্তকাল বেঁচে থাকার তাড়না জোগাচ্ছে। ঠিক অমৃতের সন্ধানের মতো।

আপনার-আমার আটপৌরে জীবনেও এক অজানা অদৃশ্য উদ্দেশ্যের পেছনে আমরা ছুটে বেড়াচ্ছি। আধুনিক জীবনে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া পরিস্থিতি আর দৈনিক ব্যস্ততায় এসব দর্শনের প্রভাব তেমন চোখে পড়ে না। বারবারই নতুন কোনো লক্ষ্য সেই অদৃশ্য মোক্ষের জায়গা পূরণ করে। তবুও নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ অবিনশ্বর হতে চায়।

ফল খাওয়ার আগে ইডেনের নিসর্গে অ্যাডাম-ইভের জগতে কোনো তুলনা কোনো মানবীয় চাহিদার জায়গাই ছিল না। ছিল শুধু ধ্রুব ভারসাম্যের এক পরিবেশ। পুরাণমতে, আমাদের মন-মস্তিষ্কের নিয়ত খেলায় সকল গুণ ওই ফলের দান।

পর্দায় চিত্রিত গল্পের শেষ অধ্যায়...

সাধু পরদিনই তার সম্পূর্ণ চেষ্টা দিয়ে একটা ঘর বানিয়ে ফেললো।

বউয়ের অনুপস্থিতির সময়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে তার বউয়ের নাম এতদিনেও তার জানা হয়নি...

মেয়েটিকে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয় তার নাম ‘সাধুর বউ’। সাধু তার বাবা-মায়ের দেওয়া নাম জানতে চাইলে মেয়েটিও চিন্তামগ্ন হয়ে ওঠে। তার নাম তো তার নিজেরই জানা নেই!

যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে মেয়েটির নামই ‘কুলসুম’। নিজের পরিচয় সে বাঁচিয়ে রেখেছে আদরের পোষ্যটির মধ্যদিয়ে।

ইভকে যখন শুধুই অ্যাডামের সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়, তখন থেকেই অ্যাডামের পরিচয়ে তার পরিচিতি গড়ে ওঠে। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু বদলে গেলেও স্ত্রী’র স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রশ্নে উত্তর সেই প্রাচীন ছাঁচেই চলমান।

নারীকে প্রকৃতি জ্ঞান করে সমগ্র সংসারকে তার ছায়াতলে আনলেও সে নিজেকে পুরুষের এক প্রচ্ছন্ন ছায়া করে রেখেছে যুগ-যুগান্তর ধরে।

সেদিন ঘরের চালা তুলতে গিয়ে হঠাৎ সাধু লক্ষ্য করে তার বউ অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনা প্রবাহে দর্শক এতক্ষণে জেনেছে তালের পিঠায় মত্ত সাধু অনেক চাইলেও তার বউ তার সাথে কোনো শারিরীক সম্পর্কে জড়ায়নি।

এখানেই মানুষের আরেক স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সন্দেহের চিত্র ফুটে ওঠে। সন্তানের পিতৃপরিচয় সাধু জানে না। সাধু হয়ে ওঠে অসাধু; সে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে তার স্ত্রীর অনাগত সন্তানকে নাশ করতে। কিন্তু তার পরিকল্পনা বুঝতে পারে মেয়েটি। তাই সঙ্গীর সকল যত্ন উপেক্ষা করে ভোরের আবছা আলোয় সে পালিয়ে যায়। সকালে সাধু হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় মেয়েটিকে...

আচমকা খবর এলো, পোষ্য ছাগল কুলসুমের বাচ্চা হয়েছে। সাধু দৌড়ে গেল বাড়িতে। ফুটফুটে দুটো শাবকের পাশে মা ছাগলটি নিষ্প্রাণ পড়ে আছে। সাধু ছাগ-ছানা দুটোকে যত্নে আগলে রাখল। ওদিকে মৃত কুলসুমকে টুকরো টুকরো করে কেটে, রান্না করে, কেমন উন্মত্তভাবে খেয়ে চললো সাধু। পুরোটা মাংসই সে খেয়ে শেষ করলো। খেতে খেতে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সাধু।

মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে আমরা ‘ঝঃৎবংং ঊধঃরহম’ বলি। এই দৃশ্যের অবতারণা সেভাবে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবমনের জটিল এক প্রশ্ন।

আমাদের বহুকাক্সিক্ষত বাসনার কাছে আমরা সবসময় পরাজিত হই। আকাক্সক্ষার যে অসীম চক্রে আমরা আবদ্ধ, সেখানে যখন তাকে পাওয়ার আশা আর অবশিষ্ট থাকে না তখন সেই অপ্রাপ্তির পেছনেই মানুষ ছুটতে থাকে অবিরাম। মরিয়া হয়ে ছুঁতে চেষ্টা করে তার বাসনার শেষ বিন্দুটুকু।

জ্ঞান ফিরতেই সাধু কুলসুমের ছোট্টো শাবক দু’টিকে বুকে আগলে আবারো বউয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াতে থাকে।

হঠাৎ করেই তার আশপাশের সব তাল গাছ থেকে অগণিত তালের বৃষ্টি শুরু হয়। একতাল তালের মাঝখানে অর্ধনিমজ্জিত হয়ে আছে সাধু।

চিত্রায়ণের শেষ দৃশ্যে তার হারিয়ে যাওয়া বউয়ের চুড়ি পরা হাত তার দিকে এগিয়ে দিল একটা তাল, এতো তালের স্তূপে বসেও সাধু প্রাণপণ হাত বাড়িয়ে তার সঙ্গীর হাত থেকেই তালটি নেওয়ার চেষ্টা করে।

এই দৃশ্য পৃথিবীর এবং মানুষের জীবনের এক চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে।

পুরাণের প্রথম মানব-মানবীর যাত্রায় ইভ যেমন অ্যাডামকে জীবন ধারণের জন্য সঙ্গ দিয়েছে, একাকিত্ব থেকে রক্ষা করেছে, তার জীবনকে ছন্দময় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, বেঁচে থাকার উৎসাহ, রসদ এবং আকাক্সক্ষা দিয়েছে সেই একই প্রেক্ষাপট আজকের এই আধুনিক সমাজে কি সমান প্রাসঙ্গিক নয় ?

‘রইদ’-এ মানুষের চিরচেনা প্রবৃত্তি ; মায়া, সন্দেহ, বাসনা, কামনা, পাপ, আকাক্সক্ষা এবং এর পুনরাবৃত্তির যে-চক্রের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে সেই পুনরাবৃত্তির চক্র পুরাণের আদিম পট থেকেই উঠে এসেছে। এখনো তা চলমান কোনো এক অনন্তের পথে...

ইভ তথা নারীরা সেই জ্ঞানবৃক্ষের ফলটির মতো ফল বারবার অ্যাডাম বা পুরুষের হাতে তুলে দেবে, তার প্রাণকে সত্তায় পরিণত করবে; যেন তার জ্ঞান অর্থাৎ চৈতন্য তাকে ঠিক পথ বেছে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু তুলনার জগতে তা প্রায় অসম্ভব !

চলচ্চিত্রশৈলীর [সিনেমাটোগ্রাফির] সার্থকতা ও ব্যর্থতা

‘রইদ’-এর মূল চিত্রনাট্যটি অত্যন্ত সাধারণ এক দম্পতির দৈনন্দিন জীবনচিত্র হওয়ায় এর ভেতরের দর্শনগুলো বুঝে নেওয়ার জন্য সিনেমাটি অবশ্যই দেখতে হবে।

গল্পের কেন্দ্রীয় শিল্পীযুগল নাজিফা তুষি এবং মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, দু’জনেই দুর্দান্ত অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে গল্পের সংলাপে না-বলা কথাগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষত, নাজিফা তুষি এমন ব্যতিক্রমী শক্তিশালী চরিত্রের জন্য নিজেকে অনেক ভেঙেছেন এবং নতুন করে গড়ে তুলেছেন। নিশ্চয়ই এটি তার অভিনয়জীবনের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। তার অনবদ্য অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রটিকেই প্রাণবন্ত আর হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। কিছু দৃশ্যে ইমরানও চরিত্রকে সম্পূর্ণ ধারণ করে কাজ করার কৃতিত্বের দাবিদার।

সাদামাটা এমন চিত্রনাট্যে এত গভীর দর্শন ও মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলা সত্যিই প্রশংসনীয়। অর্থাৎ ‘রইদ’-এর বিভিন্ন দৃশ্যের বর্ণনা বা গল্পটুকু শুনে কারো পক্ষেই এর পৌরাণিক সংযোগ বুঝে নেওয়া সম্ভব নয়।

আবহসংগীতের যথার্থতা গল্পের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করেছে। কোথাও অপ্রয়োজনীয় বা অপর্যাপ্ত মনে হয়নি। আবার অন্যদিকে সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে অন্ধকারের পর আলো, আলোর পরে অন্ধকার এমন ছন্দে বড়োপর্দায় হঠাৎ আলোর ঝলকানি কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। পুরনো সাদাকালো সিনেমায় এটি একটি পরিচিত এবং উপযুক্ত পদ্ধতি হলেও রঙিন পর্দায় চোখের আরামে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। পট পরিবর্তনের বিষয়টি ক্যামেরার দিক থেকে আরেকটু ভেবে দেখার সুযোগ ছিল।

পুরো সিনেমায় অনেকবার সময়ের ব্যবধানে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সময়ের ব্যাপ্তি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি। সংলাপের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা যেত।

সিনেমায় চমৎকার একটি লোকগান ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’ শোনা যায়। গানটি পুরো চিত্রনাট্য এবং এর দর্শনকে এক সুতোয় গেঁথেছে। গানের যথার্থ গায়কি এবং ব্যবহার দর্শক-শ্রোতা হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করেছে।

তবে, ‘রইদ’-এর আরো কিছু গান আছে যা আমরা মূল সিনেমায় শুনিনি। যেমন, পাগলির ‘প্রেম জ্বালা মোর মনে গো সখী’ গানটি। আলাদা করে গানটি শুনে মনে হয়েছে গল্পের শুরুটা এই গান দিয়েও হতে পারতো। তাতে, দর্শকের জন্য মূল সিনেমার ভেতরের রহস্য আর পৌরাণিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সহজতর হতো।

তবে, বাজারে সাধুর সাথে বাউলের কথোপকথনের দৃশ্যে চিত্রনাট্যকার তার ভাবনা ও দর্শনের সাথে সাধুর জীবনের সংযোগ বুঝিয়ে দিয়েছেন তা সিনেমাটির ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করেছে।

সিনেমাতে অনেক স্ল্যাং বা সস্তা গালি ব্যবহৃত হয়েছে যা প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয়। চরিত্রায়ণের জন্যেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ...

সিনেমা একটি শিল্পমাধ্যম ও শৈল্পিক পরিভাষা হিসেবে এমন অপচর্চা এড়িয়ে যাওয়া যেত না কি ?

টানা দু’ঘণ্টা মাত্র দু’জন মুখ্য চরিত্র নিয়ে গল্পের রেশ ধরে রাখা বেশ দুঃসাধ্য। অন্যান্য চরিত্র খুব অল্প সময়ের জন্যে এলেও তাতে গল্পের ছন্দপতন হয়নি। পরিচালক তার সার্থকতা প্রমাণ করেছেন।

এছাড়াও, যথেষ্ট পৌরাণিক কাহিনির জ্ঞান বা আগ্রহ এবং মানবীয় জটিল মনস্তত্ত্বের উপলব্ধি না-থাকলে সিনেমাটি দর্শকের কাছে একঘেঁয়ে মনে হতে পারে।

যারা শুধু চিত্রনাট্যনির্ভর সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন, বা গল্পের প্রবাহ থেকে সিনেমা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের জন্য আরো সহজ করে ভাবলে এর মূল ভাবনা আরো বেশিসংখ্যক মানুষের মনে দাগ কাটত।

নিশ্চয়ই পরিচালক সিনেমা নির্মাণের পরে আবার তার গল্পের ব্যাখ্যা দেবেন না। তিনি তার বক্তব্য কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

তার নির্বাচিত শিল্পীরা এ-কাজে তাকে সম্পূর্ণ এবং সফলভাবে সাহায্য করেছেন। যে-অমীমাংসিত প্রশ্ন মানুষের অবচেতন মনে রয়ে গেছে অনন্তকাল ধরে, তাকেই আরেকটু উসকে দিয়েছে ‘রইদ’। সৃষ্টি নিয়ে, মানুষের মনের সব জটিল সমীকরণ নিয়ে, মানুষের নিজেদেরই কৌতূহলের সীমা নেই ; সে-সব রহস্য আর চিরায়ত সত্যকে তাদের জায়গায় রেখেই এমন একটি দর্শননির্ভর সিনেমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ‘রইদ’-এর পুরো টিমকে অভিনন্দন। বিশ্লেষণধর্মী সিনেমা হিসেবে অবশ্যই ‘রইদ’ কৃতিত্বের দাবিদার। সিনেমাপ্রেমী, দর্শনপ্রেমী সকলেই এর প্রশংসা করবেন, আমার বিশ্বাস। নিজের চোখে ‘রইদ’ দেখে আসুন, নিজেদের উপলব্ধির জানালায় রইদ পড়ার সুযোগ করে দিন।