পারুলের শিল্পীভাই- সকলের মুস্তাফা মনোয়ার স্যার : মাহমুদা আখতার

30 Jul 2026, 02:34 PM শ্রদ্ধাঞ্জলি শেয়ার:
পারুলের শিল্পীভাই- সকলের মুস্তাফা মনোয়ার স্যার : মাহমুদা আখতার


১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ‘মনের কথা’র শুভযাত্রা শুরু। বাংলাদেশে পাপেটশিল্পের জনক শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের ‘মনের কথা’র পারুলকে কণ্ঠস্বরে ধারণ করে ২০২৬ পর্যন্ত আমরা অনেকেই ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছি। একেবারে শুরুতে ছিল জাকিয়া সুলতানা শান্তা। সবশেষে এসেছে সাদিয়া ইসলাম লিজা। এর মাঝে নিপুণ, মারিয়া ফারিহ্ উপমা, ফারজানা ইসলাম তিথি, তামান্না তিথিসহ আমার অজানা আরো কেউ থাকতে পারেন। এই অধমও সেই দলেরই একজন হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। কবে ?

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের কথা। অকস্মাৎ মুঠোফোনে শান্তার ফোনকল-

: মাহমুদা, আগামী বুধবার সকাল ১১টায় ‘মনের কথা’র রেকর্ডিং-এ একটু আসতে পারবে ? আমি ক্যানাডা চলে যাচ্ছি। স্যারের সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে যাই...

গেলাম। ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কে বেক্সিমকো ভবনের পাশে স্যারের চারতলা ভবনের নিচতলায়। সেটা ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও। দোতলায় অফিস কাম ওয়ার্কশপ কাম অডিও স্টুডিও। তৃতীয় তলায় স্যার-ম্যাডাম আর মেয়ে থাকেন। চতুর্থ তলায় ছেলের সংসার।

‘মনের কথা’র সবচেয়ে সাবলীল সার্থক ‘পারুলকণ্ঠ’ শান্তা। ক্যানাডায় সপরিবারে স্থায়ী হওয়ার আগে স্যারের সঙ্গে সেদিনই শান্তার শেষ কাজ। ক্যামেরা নিয়ে বিটিভি থেকে এসেছেন খালিদ ভাই, সঙ্গে হোসাইন ; এটাই নিয়ম। স্যারের অফিস-সহযোগী মান্নান ভাই ছাড়াও ছিলেন পাপেটিয়ার অনুকূল দা, সিরাজভাই, জুয়েল ও রুবেল। আলোছায়ার বিষয়টি ঠিক রাখেন জিল্লুর ভাই। আর কামাল আহসান বিপুল ভাই তো ১৯৯০ থেকে একটানা ৩৬ বছর ধরে আছেন স্যারের সঙ্গে। বাউল, ষাঁড়, গিট্টুসহ আরো কত চরিত্রের নেপথ্যকণ্ঠ যে তিনি, সে বলে শেষ করার নয়। সোহেল ভাইকে সেদিন দেখিনি, তবে তিনিও আছেন।

এককোণে চুপচাপ বসে রেকর্ডিং দেখলাম। বিদায় নেওয়ার আগে শান্তা বলল, ‘স্যার, ও মাহমুদা। আমার জায়গায় ও কাজ করবে। আপনি কথা বলে নিন।’

সেদিনের রেকর্ডিং চলাকালীন স্যারের আঁকা ছবিটা আর বিদায় নিয়ে শান্তা চলে গেল। স্যার আমাকে প্রশ্ন করলেন- গান গাইতে পারবে ?

: সুর জানা থাকলে গাইতে পারব।

- আচ্ছা, ঠিক আছে।

স্যার চলে যাচ্ছিলেন, সহযোগীদের ফিসফিস-গুঞ্জন-অসন্তোষ...

- একটু দেখে নিবেন না স্যার ? পারুলের কণ্ঠ দিতে পারবে কি না ?

- লাগবে না। ও, হয়ে যাবে। প্রয়োজনে শিখিয়ে নেব।

বছর-চারেক কাজ করেছিলাম। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ‘মনের কথা’ ছাড়াও বিটিভির রবীন্দ্র-নজরুল-জয়ন্তী, ঈদ, নববর্ষ, বিজয়দিবস, জাতীয় শিশুদিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস, স্বাধীনতাদিবস, শোকদিবস ; এমনকি ২০১৪-তে বিটিভি’র সুবর্ণজয়ন্তীতে ‘মনের কথা’র বিশেষ পর্বে স্যারের সঙ্গে কাজ করার সূত্রে জানতে পারি, ‘নতুন কুঁড়ি’ স্যারেরই পরিকল্পনায় শুরু হয়েছিল বিটিভিতে। এই ধরনের অনুষ্ঠানে যদি পারুল সঞ্চালক থাকতো, তাহলে অনুষ্ঠানসূচি জেনে নিয়ে সঞ্চালনার কথাগুলো সাজিয়ে স্যারকে শোনাতাম। স্যার কখনো নতুন কিছু যুক্ত করার পরামর্শ দিতেন, কখনো ছেঁটে ছোটো করে দিতেন। ‘সুবর্ণজয়ন্তী’র বিশেষ মনের কথা করতে গিয়ে পারুলের মাধ্যমে আমি স্যারকে প্রশ্ন করে করে ‘নতুন কুঁড়ি’র জন্মের ইতিহাসসহ বিটিভিতে দায়িত্ব পালনকালীন স্যারের আরো বেশকিছু মজার ঘটনার উৎফুল্ল-উচ্ছ্বসিত বর্ণনাত্মক চিত্র বের করে এনেছিলাম। কিন্তু সেদিন রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর হোসাইন গোপনে বললো, “‘নতুন কুঁড়ি’র অংশটুকু এখন প্রচার করা যাবে না...”

২০২২ কি ’২৩-এ বিটিভিতে হঠাৎ করেই ঘোষণা করা হলো- ‘নতুন কুঁড়ি’ পুনরায় শুরু হবে। দেখা-শোনামাত্রই ম্যাডামকে ফোন করে স্যারকে দিতে বললাম। কারণ, স্যার মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না। ফোন ধরে খবরটা শুনে সে কী উচ্ছ্বাস ! স্যার যেন পারুলের সঙ্গেই কথা বলছেন।

ওমা ! হুট করে ‘নতুন কুঁড়ি’র বদলে ‘নবস্পন্দন’র ঘোষণা দিতে শুরু করলো বিটিভি কর্তৃপক্ষ। সবাই নিবন্ধনও করলো টাকা গচ্চা দিয়ে। কাজ হলো না। আফসোস, ২০২৫-এ যখন সত্যি সত্যিই ‘নতুন কুঁড়ি’ পুনরায় শুরু হলো, স্যার তখন শয্যাশায়ী !

‘মনের কথা’র যে-সব পর্বে শিল্পীভাই থাকতেন, সে-সব পর্ব ধারণ করার সময় স্যার চুলটা আঁচড়ে নিতেন। একটা কালো কাজল পেন্সিল আর ছোটো আয়না ধরে সামনের দিকের চুলগুলো একটু কালো করে নিতেন। ঠোঁটে বুলিয়ে নিতেন ভ্যাসলিন বা লিপজেল। ব্যস, স্যারের মানে ‘শিল্পীভাইয়ের’ সাজ শেষ। তখনো আমি নতুন বলে চেয়ে চেয়ে দেখতাম, স্যার কী করেন। স্যার সেটা টের পেলে লজ্জামিশ্রিত একটা নীরব হাসি হাসতেন। স্যার নেমে আসতেন দোক্তা খেতে খেতে। সেটা মুখে রেখে চাবাতে চাবাতেই বাণীচিত্র ধারণে অংশ নিতেন ; একটুও সমস্যা হতো না।

এমনিতে আমাদের কাছে স্যারের লেখা পাণ্ডুলিপি একটা থাকতো বটে তবে ‘মনের কথা’র দৃশ্য ধারণের সময় স্যার আপনমনে যখন কথা বলে যেতেন, তখন সে-কথার সঙ্গে মিল রেখে পারুল-বাউল বা ষাঁড় প্রাসঙ্গিক কোনো শব্দ বা বাক্য নিজমনে বলে উঠলে, সঙ্গে সঙ্গে স্যার সেই শব্দ বা বাক্য লুফে নিয়ে শিশুর মতন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে নিজেও বলতেন বা সমর্থন করে নতুন বাক্য জুড়ে দিতেন তৎক্ষণাৎ। সেই সময় মনে-প্রাণে শিশু অন্তঃপ্রাণ এক শিল্পীভাইয়ের দরশন লাভ করতাম আমরা। নিজেরাও শিশু বনে যেতাম।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্যারের প্রথম পছন্দ যেকোনো আয়োজনে বা উদ্যাপনে। নববর্ষেও তাই শিশুদের রবীন্দ্রসংগীত দিতেন আবৃত্তি করতে। ২০১৪-তে সুকুমার রায়ের ছড়া নিয়ে গেলাম। করালাম। পরের বছর ফারুক নওয়াজের ‘তাইরে না-রে, বাইরে যা-রে’ নিয়ে স্যারকে দেখালাম।

-গঠন তো ভালোই কিন্তু বাবা-মা’র নিন্দা করেছে যে-চরণ দু’টোতে, সে দু’টো যদি একটু পাল্টে আনতে পারো ; তাহলে করাতে পারো। এমনিতে ছড়াটা ভালো।

সময় খুব কম। ফারুক ভাই ফোন ধরছেন না। অগত্যা আমিই দু’চারটা শব্দ পরিবর্তন করে পুনরায় স্যারকে শোনালাম।

-হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। মুরুব্বিদের নিয়ে মজা করা ঠিক না। খুব সাধারণভাবেই কথাগুলো বলে বোঝাতেন স্যার। আর রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কিছু জানতে চইলে, বলতে গিয়ে স্যার যেন অন্যজগতে চলে যেতেন। প্রগাঢ় অনুভবে চোখ বন্ধ করে বলতে থাকতেন।

“গানের যেমন ‘সা রে গা মা পা ধা নি’ সাতটি মৌলিক স্বর আছে, ছবি আঁকারও কিন্তু তেমন মৌলিক সাতটি টান আছে, বুঝলে ?- স্যার বলেছিলেন একদিন। নিজের আঁকা কাজী নজরুল ইসলামের ছবির একটা ফোটোগ্রাফ বের করে দেখিয়ে বললেন- এই যে, এটা কালো রঙের চারকোনা চকে আঁকা। এখনো সংগ্রহে আছে, দেখবে ? ড্রয়ার খুলে সেই চক বের করে দেখিয়ে জানতে চাইলেন, “তুমি নেবে ? নাও একটা চক।” চল্লিশোর্ধ বয়সের আমি শিশুর মতোই হাত পেতে নিয়ে এলাম শুভেচ্ছা উপহার চকের নমুনা আর চেয়ে নিলাম সেই চক দিয়ে স্যারের আঁকা সেদিনের রবীন্দ্রনাথের ছবি। আহা, কে আর এখন আমাদেরও শিশু ভেবে আনন্দ দিতে চাইবে!

বিটিভির নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠানের জন্য কবিতা বাছাই করতে গিয়ে যখন ‘খাদু-দাদু’ও নিয়ে গেলাম শিশুদের শেখাতে, স্যার দেখামাত্রই নাকচ করে দিলেন- এটা না ; এটা কোনোভাবেই নেবে না। দাদুকে নিয়ে এ-ধরনের দুষ্টামি পছন্দ করি না।

আমি জীবনেও আর ওই ছড়াটা কাউকে আবৃত্তি করতে শেখাইনি।

অনেক সময় ‘অপেক্ষমাণ সময়’ কাজে লাগাতে নতুন কোনো কবিতার বই সঙ্গে রাখতাম, পড়ে দেখতে। এরকমই একদিন তৃতীয় তলা থেকে দোতলায় নেমে এসে স্যার বললেন- দেখি, কী পড়ছ ? দু’চার পাতা উল্টে বললেন- একজন কবির চোখে বর্ষার অপরূপ সুর-ছন্দ ধরা দিল না। কাদা-যানজট-যাতায়াত সমস্যা-রাস্তায় জমে থাকা পানি ; এগুলোই বড়ো হয়ে দেখা দিল ! এ কেমন কবি আর কবিতা ! এসব প’ড়ো না।

উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ ছিল সেটা। সত্যিই মানোত্তীর্ণ হয়নি লেখাগুলো।

স্যার শিস দিয়ে সুর তুলতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’ করতে গিয়ে পারুল [গল্পকথক] আর পাখির কণ্ঠ দুটোই করছি। প্রথমদিকে পাখি শিস বাজাবে। কিন্তু আমি তো শিস কিছুতেই দিতে পারছি না। তখন স্যারই দিয়ে দিলেন।

ওই গল্পে অনেক পুরুষ চরিত্র। সিরাজভাই আর অনুকূলদা পাপেটগুলো বানাতেন স্যারের চাহিদা অনুযায়ী সবসময়।

পাপেটকণ্ঠ পুরোনো মানুষ শাহরিয়ার মিঠু ভাইকেও খবর দিয়ে আনালেন স্যার। বিপুল ভাই তো আছেনই। তারপরও কুলোচ্ছে না দেখে ব্যঙ্গ চরিত্রের ক্ষেত্রে স্যার বললেন, “মাহমুদা দু’-একটা দিয়ে দাও।” “স্যার..., আমি !” “হ্যাঁ, তুমি। পারবে-পারবে। একবার চেষ্টা করেই দেখ, সাহস বাড়বে।” ফোঁড়ন কাটছিল যারা- এদের মধ্যে থেকে দু’টা চরিত্রে কণ্ঠস্বর একটু বিকৃত করে দিয়ে দিলাম !

কোনো গল্পের বা কবিতার নাট্যরূপ দিয়ে ‘পাপেট শো’ করালে সেটা তিনটা ধাপে হতো। স্যার দোতলায় প্রথমে একদিন আমাদের নিয়ে বসতেন। পাণ্ডুলিপি ধরে ধরে শেখাতেন। বিভিন্ন সুর, অঙ্গ-ভঙ্গিমা কিংবা মজা কী করে করতে হয়, সেগুলোও শিখিয়ে দিতেন। এই যেমন ‘বাঘ ও বক’ গল্পটার সময় প্রথমে অফিসকক্ষে বসে প্রতিটি বাক্যের প্রক্ষেপণ ভঙ্গিমা এবং সুর শিখিয়ে দিয়ে, মহড়া করিয়েছেন। পরদিন এটার অডিও-রেকর্ড হয়েছে। তারপর একদিন নিচতলায় ভিডিও ধারণ করা হয়েছে স্যারের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে। কেউ কিছু জানতে-শিখতে চাইলে এত খুশি হতেন! খুব পছন্দ করতেন শেখাতে। অবসরে একদিন জানতে চেয়েছিলাম- “স্যার, কণ্ঠস্বর শ্রুতিমধুর করার উপায় কী ?”

- মুখ বন্ধ করে শ্বাস নিয়ে গুঞ্জনধ্বনি [হামিং] চর্চা কর।

ধীরে ধীরে শুধু পারুল নয়, পারুলের মা-পরি-পাখি-পিঁপড়া-ডিম-সাপ-ছোটো বালিকা-জনৈক মহিলা-জনৈক পুরুষ কণ্ঠও দেওয়ার চর্চা আর অভ্যাস হলো।

‘খুকি ও কাঠবেড়ালী’র নাট্যরূপ প্রস্থাপনের সময় কাঠবেড়ালীর নানারকম মজা করে খুকিকে খেপিয়ে তোলা দারুণ উপভোগ্য ছিল।

কোনো এক বছর বিটিভির বিজয়দিবসের শিশুতোষ অনুষ্ঠানের জন্য সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটা নিয়ে গেলাম দেখাতে। স্যার মনে মনে একবার পড়ে নিয়েই বলে উঠলেন- “এত সুন্দর কবিতা এর আগে আমার চোখে পড়েনি কেন ? অসাধারণ কবিতা। এটা সবসময় আবৃত্তি করবে।”

বছর দুয়েক পর বিটিভিতে আবৃত্তি করতে গেছি। বিশ্রাম কক্ষে বসেছিলাম। স্যারসহ আরো কয়েকজন রেকর্ডিং শেষ করে এলেন। আমি শুভেচ্ছা বিনিময় করে যখন জানালাম- “স্যার, আবৃত্তি করতে এসেছি।” স্যার সঙ্গে সঙ্গে খুশির রেশ ছড়িয়ে জানতে চইলেন- “কোন্টা করবে ? সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’?”

ঈদ-উল-ফিতরে প্রচার করার জন্য একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল থেকে লোকজন এসেছে ‘শিশুতোষ অনুষ্ঠান’ ধারণ করতে। রমজান মাস। রুবেলের কর্মতৎপরতায় ইফতার ওখানেই করলাম সবাই। কাচের বাক্শের পানিতে হরেক রঙের তেলরং গুলিয়ে সেখানে কার্ট্রজি কাগজ ছেড়ে দিয়ে নানারকম রঙের জাদু আর নকশা তৈরি করে দেখালেন স্যার। পারুলরূপী আমি দেখছি আর অভিভূত-মুগ্ধ হচ্ছি। কাজ শেষ হতে হতে রাত ১২টা পার হয়ে গেল। এত রাতে একা কীভাবে বাসায় ফিরব ? আমার উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে রুবেলকে স্যার বললেন- “কাজ শেষ হলে গাড়ি বের করে ওকে আগে বাসায় নামিয়ে দিয়ে এসো।” স্যার নিজে যেমন কর্মপটিয়সী, তেমনিভাবে ওঁর সহযোগীদেরও কীভাবে যেন নানান কাজে হাত পেকে যেত।

এক বিকালে নিচতলায় অপেক্ষা করছি ‘মনের কথা’র রেকর্ডিং-এর জন্য। স্যার অসুস্থ থাকলে অনুকূলদা স্যারের পরিবর্তে ছবি এঁকে দিতেন ‘পাপেট শিল্পীভাই’ হয়ে। সেদিন রুবেলও নেই ; স্যারও নামছেন না। কী ব্যাপার ?

বেশ কিছুক্ষণ পর রুবেল কবিতা লেখা আর মেঘের ছবি আঁকা নীলরঙা সুতি কাপড়ের একটা শাল ঘাড়ে ফেলে স্টুডিওতে এলো।

-কী ব্যাপার রুবেল !! এ-ত সুন্দর শৈল্পিক শাল কোথায় পেলেন ?

: স্যার দিছেন। স্যার ‘আজিজ সুপার মার্কেটে’ গেছিলেন দোকান উদ্বোধন করতে। ওরা উপহার দিছে। স্যার আমাকে দিয়ে দিছেন। বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলাম ! শালটা থেকে চোখ সরানো দায়। আমাদের মধ্যে থেকে একজন দুষ্টুমি করেই বোধহয় বললেন, “রুবেল, এত সুন্দর শাল দিয়ে তুমি কী করবে ? তার চেয়ে বরং আমাকে দিয়ে দাও।”

: নিবেন ? নেন। - বলেই, শালটা দিয়ে কাজে মনোযোগী হলো রুবেল।

যেমন গুরু, তেমন তার শিষ্য!

স্যার যখন সেটে প্রবেশ করতেন কিংবা কোনো প্রযোজনার অডিও রেকর্ডিং করার আগে আমাদের নিয়ে বসতেন শেখাতে, তখন ওঁকে মনে হতো ঘোরলাগা এক জাত শিল্পী ; যিনি শিল্পচর্চা ছাড়া জগৎ-সংসারের আর সকল বিষয়ে উদাসীন। আশপাশের সবকিছু ভুলে নিমগ্ন হয়ে যেতেন নিজকাজে। কী করে শিশুদের আনন্দ-জগতে নিয়ে গিয়ে কল্পলোকের গল্পকথার জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় অজান্তেই সুশিক্ষার বীজ রোপণ করা যায় ওদের মনে- সে ভাবনাই ভাবতেন আর প্রয়োগ করতেন ‘মনের কথা’য়। “ছবি আঁকা শেখার সবচেয়ে বড়ো দিক হলো দেখতে শেখা, পর্যবেক্ষণ করতে শেখা আর তারপর নিজমনে এঁকে যাওয়া। আঁকতে আঁকতেই অমৃতলোকের সন্ধান পাওয়া যায়”- স্যার বলতেন। সকল শিল্পের প্রতিই আত্মার টান অনুভব করতেন মুস্তাফা মনোয়ার স্যার।

প্রতিবছর পয়লা সেপ্টেম্বর ‘মনের কথা’ টিম স্যারের জন্মদিন উদ্যাপন করতো। রান্না রুবেলই করতো। কেনা খাবারও খাওয়া হয়েছে কোনো কোনো বছর। কেক সাজিয়ে স্যারকে ডাকা হতো। স্যার আর ম্যাডাম সুন্দর পোশাকে আবৃত হয়ে সন্ধ্যায় দোতলায় নেমে আসতেন। নিজ নিজ বয়স ভুলে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আমরা শিশুসুলভ আনন্দে সময় কাটাতাম।

ছোট্টো ছোট্টো তুচ্ছ ঘটনাতেও শিশুর মতন সরল আনন্দে মেতে উঠতে স্যারের জুড়ি মেলা ভার। কত সময়, কত বিষয়ে, কত কথা বলেছেন কিন্তু পরনিন্দা বা পরচর্চা ওঁর আলোচ্য বিষয় ছিল না কখনো। এত মানুষ ওঁর আশেপাশে কাজ করতেন। কখনো উচ্চস্বরে কাউকে বকা দিতে শুনেছি কি ? মনে করতে পারছি না। আনন্দ বিলানোই ছিল তাঁর ব্রত। আপাদমস্তক শিল্পের ধ্যানমগ্ন গভীর বোধসম্পন্ন একজন শিল্প-জাদুকর যেন ২৪ ঘণ্টাই তাঁর অসম্ভব দাপুটে অথচ কোমল অনুভবজনিত শৈল্পিক উচ্চারণের জাদুতে চারপাশে কেবল মায়া বাড়াতেন, মায়া ছড়িয়ে যেতেন। ভাগ্যিস, তখনো পর্যন্ত স্মার্টফোন কিনিনি। তাই, স্যারের বলা কথা মন দিয়ে অনুভব করেছি।

২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫-এ ডিসেম্বর। বিটিভি এবং মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের বিবাহের ৫০ বছর পূর্তি একই দিনে। সকলেই যেন ২৫ তারিখে বিটিভিভবনে গিয়ে ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ উদ্যাপনের অংশী হতে পারে, তাই পরিবারের পক্ষ থেকে স্যার-ম্যাডামের ৫০তম বিবাহবার্ষিক উদ্যাপনের তারিখটা পিছিয়ে দিয়ে সম্ভবত ২৭ তারিখে ঠিক করা হয়েছিল।

সেদিন ‘সীমান্ত সম্ভার’-এর ঝলমলে সন্ধ্যায় স্বনামখ্যাত মানুষের পদচারণায় মুখরিত মিলনমেলায়, আরজুমান্দ আরা বকুলের সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে চেতনে-অবচেতনে শান্তা-তিথিকেও খুঁজে ফিরছিল চোখ দুটো।

বলাই বাহুল্য, একইসঙ্গে পাকা অভিনেতা আর নাট্য-নির্দেশক ছিলেন স্যার। পাপেট পারুলের চুলে-মাথায় হাত বুলিয়ে যখন আদর করতেন কিংবা প্রয়োজনে বাউলভাই বা ষাঁড়ভাইকে করতেন মৃদু তিরস্কার তখন শরীরে-মনে স্যার যেন ওদেরই অংশ হয়ে গিয়ে তাকাতেন, ছুঁয়ে দেখতেন, হাসতেন, কথা বলতেন, যারপরনাই আনন্দে ভাসতেন। মনে হতো যেন তিনি চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে শ্রদ্ধাভরে ওদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন খুব যত্ন করে।

দোতলার ‘অডিও রেকর্ডিং কক্ষে’ অনেক ধরনের বাদ্যযন্ত্র রাখা ছিল। এগুলোর সবই স্যার বাজাতে পারতেন।

ঘঐক ঔঅচঅঘ থেকে স্যারের জীবন ও কর্ম নিয়ে উড়পঁসবহঃধৎু ভরষস তৈরি করতে কয়েকজন এসেছেন। খুব গোছানো, ঐড়সব ড়িৎশ করে আসা দল। কাজের অংশ হিসেবে ঢাকার বাইরে শিশুদের একটা স্কুলে দৃশ্য ধারণ করা হবে। আমরাও স্যারের সঙ্গী হয়ে মাইক্রোবাসের যাত্রী হলাম। স্কুলের কচিপ্রাণদের ‘পাপেট শো’ দেখানো ছাড়াও একটা খোলা শ্রেণিকক্ষ দেখতে পেয়ে কাজের ফাঁকে সুযোগ বুঝে ‘ব্রতচারী ছড়া’ও করিয়েছিলাম শিশুদের। কাজ শেষে মহানন্দে হৈ-হৈ [গান গাইতে গাইতে] করতে করতে বাড়ি ফিরেছি। এজন্য সম্মানীও পেয়েছি ঘঐক থেকে।

শেষ করতে হবে বলেই ইতি টানা। স্যারের সঙ্গে জীবনে প্রথম মুখোমুখি দেখা ‘নালন্দা বিদ্যালয়’-এ ; সন্জীদা [সন্জীদা খাতুন] আপার সুবাদে। এক বিকালে তিনি আমাদের নিয়ে বসেছিলেন ‘নন্দনতত্ত্ব’ বোঝাতে। স্যারের সার কথা ছিল- যারা শুধু প্রয়োজন নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, সৌন্দর্য তাদের কাছে ধরা দেয় না বা তারা সৌন্দর্যের দেখা পায় না। সৌন্দর্যটা থাকে ‘শুধু অকারণ পুলকে’। যেমন, যে-কারণে আমরা শাড়ির আঁচল পিছনে পড়ে থাকলেও সেটাকে নকশায়-বুননে-রঙে-রেখায়-সূচিকর্মে ছবি এঁকে সবচেয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলি ; তৈরি করি- এটাই নন্দনতত্ত্ব। হ

লেখক : আবৃত্তিকর্মী


মুস্তাফা মনোয়ার : বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার এক নক্ষত্র-নাম

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ার এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, শিল্পশিক্ষক, নাট্যনির্দেশক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। শিল্পকে তিনি কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ রাখেননি ; বরং শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, পাপেট থিয়েটার এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। ছোটোবেলা থেকেই শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের আবহে বেড়ে ওঠায় তার মধ্যে সৃজনশীলতার বীজ রোপিত হয়। কলকাতার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে চিত্রকলায় শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি দেশে ফিরে শিল্পচর্চা ও শিল্পশিক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড়ো অবদানগুলোর একটি হলো বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্যকে জনপ্রিয় করে তোলা। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ শিশুদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়। পরবর্তীসময়ে ইউনিসেফের বহুল পরিচিত শিশুতোষ চরিত্র ‘মীনা’-এর ধারণা বিকাশেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ কারণেই তিনি ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তার অবদান স্মরণীয়। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুুন কুঁড়ি’ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করেছেন। পাশাপাশি নাটক, সংগীত, নৃত্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নির্মাণেও তার অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন [বিএফডিসি]-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।

শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা লাভ করেন। তার সৃজনশীলতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তাকে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন তিনি ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার সৃষ্টিশীল কর্ম, শিল্পভাবনা এবং সাংস্কৃতিক অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে, বিশেষ করে শিশুদের আনন্দ ও শিক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিলেন। তার জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে...

আনন্দভুবন ডেস্ক