জীবৎকালে ভ্যান গগের একটি মাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল : আশরাফ হোসেন

21 Jul 2025, 02:30 PM অন্যান্য শেয়ার:
জীবৎকালে ভ্যান গগের একটি মাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল : আশরাফ হোসেন


ভ্যান গগ- যিনি আকাশ থেকে নীল আর শস্য থেকে

সোনালি তুলে এনে

ব্যবহার করতেন-কখনো, শপথ করে বলতে পারি

এমন গাঢ়তা দেখেন নি !

-আবু হেনা মোস্তফা কামাল


একথা বিশ্বাস করা কষ্টকর যে, দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগের জীবদ্দশায় তাঁর একটি মাত্র শিল্পকর্ম বিক্রি হয়েছিল। ভ্যান গগ একজন ওলন্দাজ উত্তর-অন্তর্মুদ্রাবাদী চিত্রশিল্পী। তিনি পশ্চিমা শিল্পের ইতিহাসে প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব। ভ্যান গগ ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ নেদারল্যান্ডসের গ্রোট জুনডার্টে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই ফ্রান্সে মারা যান, মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। ভ্যান গগ তার জীবনের শেষ দশকে ছবি আঁকার কাজ শুরু করেন। তীব্র দারিদ্র্য, মানসিক দুরবস্থা, হতাশা, সিদ্ধান্ত হীনতাসহ নানা কিছুর ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠেন ভিনসেন্ট ভ্যান গগ।

ভ্যান গগের বাবা ছিলেন একজন ধর্মযাজক। এ-কারণে তিনি বেড়ে ওঠেন এক ধর্মীয় পরিবেশে। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। তবে, কর্মজীবনের প্রথমে আর্ট ডিলার [ছবি বিক্রেতা] হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি শিক্ষকতাও করেন।

তার তুলির ডগায় খেলত উজ্জ্বল রং ও রূপ ; ছিল নান্দনিক শৈলীও। ১৬ বছর বয়সে তিনি ছবিতে শিক্ষানবিশ ছিলেন গুপিল অ্যান্ড কোং-এর হেগ শাখায়। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্যারিসে চলে যান। সেখানে তিনি ইম্প্রেশনিজমের দ্বারা প্রভাবিত হন এবং নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। তিনি ফ্রান্স হালস এবং অন্যান্য ডাচ-শিল্পীদের প্রতিও মনযোগী ছিলেন। যদিও তার পছন্দের দুই শিল্পী ছিলেন ফরাসি, জিন-ফ্রান্সোয়া মিলেট ও ক্যামিল করোটের। ভ্যান গগের ওপর এ-দুই চিত্রশিল্পীর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। ভ্যান গগ জাপানি মুদ্রণ ও ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকলার আবিষ্কার করেন। তিনি খুব দ্রুত কাজ করতেন। চিত্রকলার প্রতি তার দৃষ্টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একসময়ে তিনি আর্লস-এ একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেন, সে বাড়িটি ভ্যান গগের আর্লসের ‘হলুদ বাড়ি’ বললেই লোকেরা চিনতেন, এখনো হয়ত চেনেন। সেখানে পল গগাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দু’জনে একসাথেই ক’মাস কাজ করেন পরে মতের অমিল, কথা কাটাকাটি, একপর্যায়ে তিনি ক্ষুর নিয়ে তাড়া করেন পল গগাকে। সে-সময়ে ভ্যান গগের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না।

ভ্যান গগের প্রিয় ভাই থিও শিল্পীর প্রায় সবকিছুকে সমর্থন করতেন এবং সহযোগিতা করতেন। সবসময়েই ছোটোভাই থিও ভ্যান গগের খবর নিতেন এবং সুপরামর্শ দিতেন। আবার দু’জনে একসাথে একই বাড়িতে থেকে ঝগড়া করে বেরও হয়ে গেছেন। এ দু’ভাইয়ের নিগুঢ় সম্পর্ক আমাদের আপ্লুত করে। ভাইয়ে ভাইয়ে এমন ঘনিষ্ঠ মধুময় সম্পর্ক সাধারণত দেখা যায় না। ভ্যান গগ এবং তার ছোটোভাই থিও’র মধ্যে বেশ চিঠি চালাচালি হতো। দুই ভাইয়ের বন্ধুত্ব এবং শিল্পের নানা তত্ত্ব নিয়ে আলাপ আলোচনা চিঠির মারফতেই হতো। থিও ভ্যান গগকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করতেন। তবে, ভাইয়ের দেওয়া টাকায় তিনি সারামাস ভালোভাবে চলতে পারতেন না, খেয়ে-না-খেয়ে কাজ করতেন। থিও রং, কাগজ, ক্যানভাস কেনার জন্যও অর্থ দিতেন এবং সমকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে পরিচয়ও করিয়ে দিতেন। সে-সময়ে সমসাময়িক শিল্পী জুলস ব্রেটনের কথাও উঠে আসে তাদের কথোপকথনে। ব্রেটনের সাথে ভ্যান গগের দেখা হয়েছিল প্যারিসের সালোনে। ব্রেটনের একটি কবিতা ভ্যান গগের ছবির অনুপ্রেরণা ছিল। ব্রেটনের সাথে দেখা করতে ৮০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলেন ভ্যান গগ। অথচ ব্রেটনের আত্মজীবনীর কোনো একটি পাতায়ও ‘ভ্যান গগ’ নামের উল্লেখ নেই। ভ্যান গগের সরল জীবন তাকে বরাবরই আঘাত করেছে তীব্র থেকে তীব্রভাবে। ভ্যান গগ মারা যাওয়ার প্রায় পাঁচ-ছয় মাস পরেই ছোটো ভাই থিও-ও মারা যান। দুইভাই পাশাপাশি থাকেন মৃত্যুর পরেও।

ভ্যান গগের বিশাল কর্ম যা অল্পসময়ে অধিক কাজ বলেই বিশ্বাস করা হয়। মাত্র একদশক সময়ে প্রায় ২০০০টি শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন তিনি, এর মধ্যে ৮৫০-৬০টি তৈলচিত্র। জীবনের শেষ দুই বছরেই তিনি বেশিরভাগ কাজ করেছেন। এসব শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে স্থিরচিত্র, গ্রাম ও আত্মপ্রতিকৃতি। জীবিত অবস্থায় সমালোচক বা দর্শকদের মন জয় করতে না পারলেও ভ্যান গগের মৃত্যুর পর সমালোচক ও দর্শকদের মনে বড়ো একটা স্থান অধিকার করে নেন ভ্যান গগ। অবশ্য জীবিত অবস্থায় তার একটি শিল্পকর্ম বিক্রি হয়, যার নাম ‘লাল দ্রাক্ষাক্ষেত্র’। পেশাগতভাবে তিনি প্রথমদিকে শিল্পকর্ম বিক্রেতা হিসেবে কাজ করেন। তিনি ছেলেবেলা থেকেই চিন্তাশীল, শান্ত ও গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন। মানসিক অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে মাঝে মাঝেই বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়তেন, বিষণœতা তার নিত্যসঙ্গী ছিল। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিষণœতার বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাননি। তিনি ছবি আঁকতে আঁকতে একসময় ধর্মচর্চায় মনোনিবেশ করেন। সে-সময়ে তিনি কিছুদিন পার্দির দায়িত্বও পালন করেন। সেখানেও মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। পরে আবার ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেন। তিনি উত্তর-অন্তর্মুদ্রাবাদ নিয়ে কাজ করতেন। এর মূল বিষয় আলো ও রঙের প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠতা। সে-সব ছবির প্রতিক্রিয়াই উত্তর-অন্তর্মুদ্রাবাদের জন্ম। এ-ঘারানায় বিমূর্ত বৈশিষ্ট্য এবং প্রতীকী বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ-ধারার অগ্রভাগে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে পল সেজান, পল গগা ও ভ্যান গগ অন্যতম। ভ্যান গগের মানসিক অসুস্থতার কারণে তার স্থিতিশীলতা নিয়ে নিজেই ভীষণ উদ্বিগ্ন থাকতেন। তবুও তা উপেক্ষা করেই চলতেন, নিজের খাওয়া ঘুম কোনো কিছুর প্রতি যতœশীল ছিলেন না। কিছুদিন মনোরোগ হাসপাতালেও চিকিৎসা নেন। তারপর হাসপাতাল থেকে চলে আসেন প্যারিসের কাছে ওভের সুর ওয়াজে হোমিও প্যাথিক ডা. পল গাশের তত্ত্বাবধানে।

তার ছেলেবেলায় মা পড়াতেন বাড়িতেই একজন গৃহশিক্ষক রেখে। ১৮৬০-এর দিকে গ্রামের বিদ্যালয়ে ভর্তি করান, আবার একই খ্রিষ্টাব্দে জেভেন বার্গেনের একটি বোডিং বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ভ্যান গগ নিজেকে খুব একা ভাবতেন। মনে করতেন, তিনি তার পরিবারের পরিত্যক্ত উচ্ছিষ্ট। বাড়ি ফিরতে চান কিন্তু তার বাবা মা আবারো তাকে টিলবার্গের একটি স্কুলে পাঠান, সেখানে নিজেকে তিনি গভীর এবং গম্ভীরভাবে অসুখী ভাবতে শুরু করেন।

খুব ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। তার মা তাকে আঁকতে উৎসাহ দিতেন। তার সেই প্রথম আঁকা ছবিগুলো ছিল অভিব্যক্তিপূর্ণ। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রশিক্ষণ শেষে গোপিলের লন্ডন শাখায় সাউদাম্পটন স্ট্রিটে পাঠানো হয়। ভ্যান গগ তখন হ্যাকফোর্ড রোড, গ্রটকওয়েলে থাকতে শুরু করেন। এই সময়ে তিনি মানসিকভাবে খুব আনন্দিত ছিলেন, কাজের ক্ষেত্রেও বেশ সফল ছিলেন। থিও’র স্ত্রী জো ভ্যান গগ সম্বন্ধে মন্তব্য করেন যে, ‘তিনি তখন তার জীবনের সেরা সময় কাটিয়েছে। সে-সময় তার জীবনে প্রেম আসে। ২০ বছরের যুবক ভ্যান গগ তার পাশের ভাড়াটিয়ার মেয়ে ইউজেন লোইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু অনুভূতি জানানোর পর মেয়েটি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন ভ্যান গগ আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, ধর্মীয়ভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন। তবে সেও বেশিদিন টিকে থাকেনি।

বাবা রেবারেন্ড থিওডোর ভ্যান গগ ডাচ রিফর্মড চার্চের গণ্যমান্য পুরোহিত ছিলেন। বাবার চেয়েও ছেলের ইচ্ছে বেশি ছিল ধর্মযাজক হওয়ার। সাময়িকভাবে কিছুদিন কাজও করেছেন কিন্তু সফলকাম হননি।

মাদকাসক্ত যৌনকর্মী ক্লাসিনার সাথে সখ্য গড়ে ওঠে ভ্যান গগের। মেয়েটির পুরো নাম ক্লাসিনা মারিয়া। তার পাঁচ বছরের সন্তানও ছিল, একপর্যায়ে তার সাথেই ভ্যান গগ থাকতে শুরু করেন। ক্লাসিনা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। ভ্যান গগের মা-বাবা পছন্দ করেননি বিষয়টি। তারা বারবার বলেছেন অবিলম্বে ক্লাসিনাকে ছেড়ে দিতে। শেষ পর্যন্ত গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভ্যান গগ তিন সপ্তাহ হাসপাতালে কাটান। বছর খানেকের মধ্যেই হঠাৎ পারিবারিক সৌন্দর্য ও ভালোবাসার গভীর সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দিয়ে পরিবার ত্যাগ করেন ভ্যান গগ। ক্লাসিনা ভ্যান গগের সাথে থাকার পূর্বেই সন্তানসম্ভবা ছিলেন। পরে ক্লাসিনা তার আগের পেশায় ফিরে যান। তার ঘরের পুত্রসন্তানের নাম ছিল ভিলেম। তার বয়স যখন ১৪ তখন পিতৃত্বের বৈধতা নিয়ে কথা ওঠে। ক্লাসিনা পরে জানান, ‘তোমার বাবা একজন চিত্রশিল্পী। ২০ বছর আগে আমি শিল্পী ভ্যান গগের সাথে সংসার করেছি। তুমি তারই পুত্র।’ ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে তীব্র কষ্টে ক্লাসিনা শেল্ড নদীতে ডুব দিয়ে আত্মহনন করেন।

ভ্যান গগ এভাবেই নানা বেদনা, যন্ত্রণা কষ্টের ভেতর থেকে জীবন অতিবাহিত করেন। যদিও জীবনের সবকিছুতেই ব্যর্থতার টানাপোড়েনে ওঠা-নামা করেছেন। ছবির বেলায় সেই ব্যর্থতা তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। অসুস্থতাকে টেক্কা দিয়ে তিনি এঁকে গেছেন একের পর এক কালজয়ী চিত্রকর্ম। ভ্যান গগের আলোচিত শিল্পকর্মের মধ্যে ‘দ্য স্টারি নাইট’, ‘সান ফ্লাওয়ার’, ‘দ্য বেডরুম’, ‘ক্যাফে টেরেস অ্যাট নাইট’ এবং ‘দ্য পোটেটো ইটার্স’সহ এরকম আরো অনেক ছবি রয়েছে।

লেখক : ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী