জঙ্গলবাস : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

20 May 2026, 03:20 PM ভ্রমন শেয়ার:
জঙ্গলবাস : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত এগুলো বরাবরই আমাকে টানে। প্রকৃতিতে যখন বর্ষা তখন মনে হয় একটু নদী দেখে আসি, বর্ষার পূর্ণ যৌবনা নদী আর তার কুলকুল বয়ে চলার শব্দ অসাধারণ, গ্রীস্ম এড়িয়ে শীত আর বর্ষা দুটোর কোনোটাতেই পাহাড়কে হেলাফেলা করা যায় না। যদিও অমার প্রিয় ঋতু শরৎ, যে ঋতুকে মূলত শীত আর বর্ষার এক সেতুবন্ধন বলা যেতে পারে। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনের গোলযোগে শরৎ এখন নামেই আছে বাস্তবে এর অস্তিত্ব অমবশ্যার চাঁদের মতোই। নাম সর্বস্ব শরৎ এখন কিছুটা বর্ষা আর বাকিটা হেমন্তে বিলীন, ঐদিকে হেমন্তও অনেকটা শরতের মতো নিজ চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য হারাতে বসেছে। যাই হোক, আমার পাহাড় দেখার পরিকল্পনা বরাবর বর্ষায় থাকলেও তার বাস্তবায়নকাল আদতে শরতের শেষ বা শীতের শুরুতে গিয়ে ঠেকে, ঠিক একই ঘটনা ঘটে জঙ্গল দর্শনের ক্ষেত্রেও। এ যেন বাংলাদেশের এডিপি [সরকারের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা], যাই ঘটুক-না-কেন বাস্তবায়ন হবে গিয়ে মে-জুনে।

এবার মিশন জঙ্গল, যে সে জঙ্গল নয় একেবারে সুন্দরবন। অনেক দিন থেকেই পরিকল্পনা ছিল সুন্দরবনের গা-ঘেঁষে দাকোপ উপজেলার বননিবাসে গিয়ে বনসহবাসের অভিজ্ঞতা নেবো। কিন্তু নানান ভাবনা আর পারিপার্শি^ক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছিল না। এর মধ্যে এক কলিগকে দেখলাম ইরাবতি ঘুরে এলো, তার ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা বা দেখা- যাই বলি না কেন, দেখামাত্রই তাকে ফোন কল করলাম অভিজ্ঞতা জানতে। ইরাবতি দাকোপের অনেক বন-আবাসের একটি, নামটা কেমন মায়াবী, তাই না। যা হোক কলিগের কাছে আমার প্রথম জিজ্ঞাস্য ছিল, নিরাপত্তা ইস্যু। কারণ দাকোপ সাধারণ লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন একটা উপজেলা, নদী পার হয়ে একদম বন ঘেঁষে এর অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই মনে তো কিছু দ্বিধা থাকে, তাই পরিচিতজনের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া। আমার কলিগ জানালো নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই, আর এই রিসোর্টটি তার এক বন্ধুর ; সুতরাং আমরা চাইলে নিশ্চিন্তে ঘুরে আসতে পারি।

এরপর আর না-যাওয়ার কিছু থাকে কি? ছয়জনের ছোটোখাটো একটি দল বেরিয়ে পড়লাম দুইদিনের বনবাসের পরিকল্পনা নিয়ে, অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধ, শরৎ ফুরিয়েছে অনেক আগে, হেমন্তেরও মধ্য বয়স অতিক্রান্ত। চাঁদ তখন পূর্ণ বয়সের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ঢাকা থেকে রেন্টেকারের একটি গাড়ি নিয়ে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম, সম্ভবত দিনটি ছিল অক্টোবরের ১৬ তারিখ। ভোর প্রায়শই বেশ মনোরম থাকে, ঘুমন্ত নির্জন শহর তখন কোথাও কোথাও আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে; আমরা তখন ব্যস্ত মহানগর ছেড়ে অনেক দূরে, ফরিদপুরের ভাঙ্গা। বেলা তখন ন’টার মতো নাশতা করতে হবে তাই থামা। সাম্পানে এর আগেও এসেছি মোটমুটি মানের রেস্তোরাঁ। নাশতা সেরে আবার পথে, নাশতা করে পেট ভরলেও মন তখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। কারণ, মনমতো চা পাওয়া যায়নি, তাই নজর ছিল রাস্তার ধারঘেঁষে চা-দোকানগুলোর দিকে, উদ্দেশ্য যুতসই জায়গা পেলে চা পানের জন্য থামবো। ড্রাইভারকে সেইমতো বলা ছিল, তাই দেখেশুনে সে যেখানটায় থামলো জায়গাটি আমাদের পূর্ব-পরিচিত। কোনো একসময় গোপালগঞ্জ বেতারে যাওয়ার পথে এই বাজারে থেমেছিলাম, এখানকার ঘোষের মিষ্টি বিখ্যাত। যাহোক চা-টা ভালো ছিল সাথে মিষ্টিও খাওয়া হলো। এরপর একটানা চলা, তাই অনেকটা গুছিয়ে নিয়ে হালকা ধাঁচের গান চালিয়ে রওনা দিলাম, চাইলে যেন একটু ঘুমিয়ে নিতে পারি। রাস্তা ভালোই বলা চলে। তবে, খুলনা শহর পার হওয়ার পর কিছুটা রাস্তা ভাঙা, ঝাকুনিতে টিকে থাকতে হাড়-গোড়কে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমাদের গন্তব্য খুলনার মংলা ফেরি ঘাট, সেখান থেকে ট্রলারে দাকোপ। শুকনো মৌসুমে গাড়ি নিয়ে সরাসরি দাকোপ যাওয়া যায়। এখন বর্ষার শেষভাগে অবশ্য তা সম্ভব নয়।

আমরা মংলা পৌঁছে রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফোন করলাম, আমাদের নৌ-যানের অবস্থান জানতে, আগেই বলেছি, নদী পার হতে হবে আর রিসোর্টে আমাদের প্যাকেজের শর্ত অনুযায়ী নৌ-যান রিসোর্ট থেকে পাঠানোর কথা। জানলাম ট্রলার ইতোমধ্যে এসে গিয়েছিল তাই আর দেরি না করে আমরা ট্রলারের খোঁজ করলাম। খুঁজে পেতে সময় লাগলো না। ট্রলারের যাত্রী আমরা আট জন, আমাদের দলের ছ’জন আর এক চিকিৎসক দম্পত্তি। এটি মূলত এক কামরার হাউজ বোট, বসার মূল জায়গা নিচতলায় আর উপরে কাপড়ের ছাউনি, সেখানেও বসার ব্যবস্থা আছে। চারপাশ ভালো করে দেখবো বলে আমরা সবাই ছাদে বসলাম, গুছিয়ে বসতেই ট্রলার চলতে শুরু করলো। রোদ ছিল, তবে নদীর শীতল বাতাসে রোদের তীব্রতা ছিল না, আর এর মধ্যেই চলছিল মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি। তারপর বলা নেই কওয়া নেই রোদের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি। নদীপথটি এতটাই সুন্দর যে, তা ভাষায় ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব সেই সাথে বাড়তি সৌন্দর্য যুক্ত করেছে ঝুম বৃষ্টি। হালকা ঝাপসা হয়ে আসা দৃশ্যপট আর নদীর জলে বৃষ্টি ঝরার এই কলতান, না বাকহীন হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিন ঘণ্টা নৌ-ভ্রমণের পুরোটাই উপভোগ্য আর ক্লান্তিহীন।

আমরা যখন রিসোর্টে পৌছাই, তখন প্রায় দুপুর। গোলপাতায় ঘেরা কাঠের ছোটো ছোটো বাঙলো-টাইপ ঘর। আমরা নৌকা থেকে নামতেই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের উষ্ণ আপ্যায়ন- এক গ্লাস শীতল পানীয়, এরপর দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুম বুঝে নেওয়া। চমৎকার দোতলা বাঙলো। উপর-নিচ মিলিয়ে ছয়জনের থাকার ব্যবস্থা, কাঠের পাতটনের ব্যালকনি, নিচে আবার দোল খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে, সবমিলিয়ে চমৎকার আয়োজন। রুমে গিয়ে আমরা কিছুক্ষণ উপর-নিচ করে সব দেখে-শুনে নিয়ে একে একে ফ্রেস হয়ে নিলাম। তখনো ঝিরঝির বৃষ্টি ছিল। এর মধ্যেই খাবার ডাক পড়লো, মেনু মাছ-ডাল আর নানান পদের ভর্তা-ভাজি, শুটকিও ছিল। ভরপেট খেয়ে নিয়ে রিসোর্টের এ-মাথা-ও-মাথা চক্কর দিয়ে রুমে ফিরে এলাম কিছুক্ষণ গড়িয়ে নেবো বলে।

গড়িয়ে নিতে চাইলেই কি আর গড়িয়ে নেওয়া যায় ? প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের বিশ্রাম নিতে দিলো না; আমরা কিছুটা সময় দোতলার বারান্দায় বসে পশুর নদীর ধারঘেঁষে ঘন সুন্দর বনের ভয়ংকর কিন্তু শ্যামল রূপ উপভোগ করলাম। যেহেতু বৃষ্টি তখনো একেবারে বিদায় নেয়নি, তাই সিদ্ধান্ত হলো আজ বিকেলটা সরিসোর্টে ঘুরেই কাটাবো। আর বিকেলটাকে বিশেষ করে তোলার জন্য সবাই শাড়ি পরে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়লাম। বিকেল থেকে সন্ধে অবধি রিসোর্টের আনাচে-কানাচে ঘুরেফিরে পাশের টং দোকনে চা-টা খেয়ে ঘরে ফিরে এলাম। এরপর আবার আড্ডা, যা রাতের খাবারের ডাক না-আসা পর্যন্ত চললো। রিসোর্টের দপ্তরঘর লাগোয়া একটি পাটাতনের উপর গানের আসর বসে। প্রায় প্রতি রাতে স্থানীয় দু’চারজন শিল্পী দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে বাজিয়ে লোকগান পরিবেশন করেন। আমরা রাতের খাবার সেরে গানের আসরে গিয়ে বসলাম জ্যোৎস্নারাতে খুব সাধারণ মানের শিল্পীর কণ্ঠের গানও যেন আসাধারণ হয়ে ধরা দিলো। এরপর আরও কিছুক্ষণ রিসোর্টের পুকুরের ধারে বসে রইলাম, যখন ঘরে ফিরলাম তখন রাত প্রায় এগারোটা। বেশ ঘুম পাচ্ছিল। কিন্তু, বারন্দায় দাঁড়াতেই যেন সব ঘুম উধাও। আজ প্রবারণা পূর্ণিমা, চাঁদের আলোয় যেন চারিধার লৌকিক সৌন্দর্যে ভরে আছে। এ যেন স্বপ্নপুরির ঘোর লাগা কোনো জগৎ।

রাত তিনটে পর্যন্ত আমরা বারন্দায়, চাঁদের সাথে আমাদের রাত জাগা, এর মধ্যেই চললো জোয়ার ভাটার খেলা, হুমায়ুন আহমেদের গান মনে পড়ে গেল ‘চান্নি পরশ রাইতে যেন আমার মরণ হয়’ এই আলোর আসলেই এক পাগল করা ক্ষমতা আছে, যা মানুষকে যেন এই মর্ত্যরে পৃথিবীকে ভুলিয়ে দেয়। আমরা গান শুনছিলাম আমাদের সাথে একজন ছিলেন যিনি চমৎকার গান করেন। না কোন অনুরোধ করতে হয়নি, আপন মনেই তিনি একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন আর আমরা তন্ময় হয়ে আছি। পৃথিবীটা সত্যি মায়াবী। হ [চলবে]