কোনো উৎসবে আনন্দের দিনগুলো প্রতিদিনের মতো একরকম থাকে না। কারণ, দিনটিকে ঘিরে মানুষ তার নিজস্ব কৃষ্টি, আচার এবং ঐতিহ্যকে ধরে নতুন নতুন ভাবনায় সাজিয়ে তোলে, রঙিন আর সাদাকালোয় আর সেগুলোকে ঘিরে পারিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রের জায়গায় প্রায় প্রতিটি মানুষই নানা বৈচিত্র্যে সেজে ওঠে নিজে এবং পরিবেশকেও সাজিয়ে তোলে। সাজিয়ে তোলে আপন আপন রুচিবোধে। আমরা অতি ভাগ্যবান যে, আমাদের দেশে আমরা ছয়টি ঋতুর বারোটি বাংলা মাস পেয়েছি, যার বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই দু’মাস পরপর- আকাশ, বায়ু, সূর্য, চাঁদ, গাছ, পাহাড়, নদ ও নদী আলাদা আলাদা সাজে সেজে ওঠে। কী অসাধারণ সৌন্দর্যে ম-িত আমাদের এ দেশ এবং এর প্রকৃতি। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি আকাশের পানে, শরৎ থেকে বসন্ত। কত রং ও তার ভাব আমাদের অনুভূতিকে উচ্ছ্বসিত করে আনন্দের জোয়ারে। আমি নদীর ঢেউয়ে রেখা এঁকে দেখি প্রতিটি ঢেউ কতটা নতুন। গাছ ও পাহাড় স্বতন্ত্র, তবু তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। অবিচল পাহাড়ের যে দৃঢ়তা, গাছেদের শেকড় যেভাবে ধরে থাকে তার মাটিকে, শক্ত অথচ নমনীয় কোমলতায়, তারই প্রশ্বাস আমাদের শ্বাসকে ছুঁয়ে যায় অতল গহিনে। আমরা মানুষেরা প্রতিদিন প্রকৃতির এই চক্রকে দেখে অভিভুত হই।
বসন্তের ভালো লাগা মৃদুমন্দ বাতাস হঠাৎ করে বদলে দেয় চৈত্রের মাতাল বাতাসে। চৈত্রের শেষ হাওয়া খররোদে বলে যায় নতুন আসছে। নতুন আসছে। দুঃখ, জরা, গ্লানি সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে নতুনেরে ডাকি বাঙালির বাংলা বর্ষ, নববর্ষতে... এসো হে বৈশাখ এসো এসো ...।
প্রায় প্রত্যেক দেশেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে তার সংস্কৃতিতে নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে যার যার নিজস্ব রীতি, ঐতিহ্যকে ঘিরে। তবে, পদ্ধতি প্রকরণ সে যাই হোক যার যার সাংস্কৃতিক বলয়কে রেখে। মৌলিক জায়গাটা সবার কাছাকাছি বললে ভুল হবে না। তা হলো আমরা সকলে চাই পুরনো জীর্ণ অস্তিত্ব ও দুঃখ যন্ত্রণাকে বিদায় জানিয়ে নবীন, সজীব জীবনের মধ্যে প্রবেশ করার আনন্দানুভূতি। টেনিস বলছিল...
রিং আউট দ্য ওল্ড,
রিং ইন দ্য নিউ
রিং হ্যাপি বেলস্
অ্যাক্রস দ্য স্নো...।
বাঙালি জীবনে এই দিনটি মুক্তির বার্তা এনে দেয়। এ মুক্তি প্রাত্যহিক জীবনের আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মস্বার্থ, অভাবী ও লোভী আত্মার থেকে নিজেকে মুক্ত করা। চিত্তের দৈন্য হতাশা থেকে আমরা যেন লাভ করি মহাজীবনের উদারতা। বর্ষারম্ভের পুণ্য প্রভাত আলোয়ে আমরা শুদ্ধ হই, স্নাত হই। যেন অনুভব করি আমরা আমাদের পরম প্রেমময়ের আনন্দ স্পর্শ। আমরা সকল ক্ষুদ্রতার নির্মোক ভেঙে মিলনে উদার উৎসবে এক উৎকর্ষ লাভ করি। হৃদয় যেন অসীমের রাজ্য, কোনো এক অনির্বচনীয় আনন্দের অভিমুখী। জীবন থেকে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা যা চিরতরে চলে গেল, তার জন্য কোনো শোক নয় তাপ নয় শুধু মনে রেখে নিজদের নতুন সম্ভবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিনই আজ... আজ শুভ নববর্ষ।
বৈশাখ মাসের প্রথম দিন বাঙালি জীবনের এক আনন্দঘন দিন। পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয় বাঙালিদের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এ উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। পয়লা বৈশাখ বাঙালি জীবনে কল্যাণ ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতীক। অতীতের দুঃখ গ্লানি, ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা, যন্ত্রণা ভুলে নতুন দিনে নতুন বছরে মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও শান্তির কামনায় দিনটি পালিত হয়ে থাকে।
মোঘল আমলে হিজরি বা আরবি সনের ভিত্তিতে বছর গণনা করা হোত, এর ফলে কৃষকদের ফসলি সন গণনায় সমস্যা দেখা দেয়, কারণ কৃষি দ্রব্যাদি উৎপাদন ঋতু বদলের সাথে সম্পৃক্ত। জমিদারদের খাজনা আদায় করতেও সমস্যা ছিল তাই সে সময়ে কৃষক এবং জমিদারদের সমস্যা দূরীকরণে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়।
সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের প্রায় ১০-১১ তারিখে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজি এ সন প্রবর্তনের দায়িত্ব নেন। বাংলা সন একেবারেই স্বকীয়। প্রথম দিকে ফসলি সন হিসেবে পরিচিতি থাকলেও পরবর্তীসময়ে নতুন এই সনটি বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে।
আকবরের শাসনামলেই বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলার কৃষকেরা খাজনা দিতেন জমিদার তালুকদার ও ভূস্বামীদের। নতুন বছর হিসেবে তারা আবার কৃষকদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে মেলাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির জীবনঘনিষ্ঠ আনন্দময় একদিন। একে অপরকে দেখা হলেই নববর্ষের শুভেচ্ছা, বা ‘শুভ নববর্ষ’ বলে সম্ভাষণ জানান। অতীতে এ উৎসব ‘আমানিউৎসব’ নামে অভিহিত ছিল। সারাবছর সুখ শান্তি ও ফসল ফলানোর আশা আকাক্সক্ষায় পালন করা হোত কৃষি উৎসব। পরিবারের কর্ত্রী এ উৎসবের সকল আচার সম্পন্ন করতেন। আমাদের গ্রামীণ পরিবারে, বিশেষ করে কৃষি পরিবারে গৃহিণীরা চৈত্রসংক্রান্তির রাতে ‘আমানি’ প্রস্তুত করতেন মাটির হাঁড়িতে। আমানি প্রস্তুুতে যেসব উপকরণ দিতেন তা হোল আধপোয়া চাল ভেজাতেন এক পাত্রে, সে পাত্রেই কচিপাতার আমগাছের ডাল রাখতেন, আর কাঁচা আমও ভিজাতেন একই পাত্রে, ভোর বেলা নতুন বছরে নবপ্রভাতে ঘরের বউরা সকলকে ওই ভেজানো চাল খেতে দিতেন আর সাথে হাঁড়িতে ভেজানো আম গাছের ডাল উঠিয়ে সকলে গায়ে ছিটিয়ে দিতেন। এটা তারা মনে করতেন বা বিশ্বাস করতেন যে, এতে করে ঠান্ডা থাকে শরীর ও মাথা। লোকেরা এও মনে করেন যে, এইদিনে আমাদের ভালো খাবার খেলে সারাবছরই ভালো খাবার খাওয়া যাবে। সে অনুযায়ী নিজেরাও ভালোমন্দ রান্না করে সকলে খেয়ে থাকেন।
অতীতে আরো একটি মৌলিক বিষয় ছিল- ‘হালখাতা’। এগুলো সামান্য হলেও পুরো বিষয়টি অর্থনৈতিক। ব্যবসায়ীরা বছরের শুরুতে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে মিষ্টি বিতরণ করে খদ্দেরদের সাথে লেনদেনটা নতুন করেই শুরু করতেন। এখনো গ্রামে, নগরে কোনো কোনো ব্যবসায়ীরা পুরনো এই চলনটি বজায় রেখেছেন। এতে ব্যবসায়ী ও খদ্দেরদের সাথে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। অতীতে ব্যবসায়ীদের ভেতর এ রীতির প্রচলন ছিল বেশ, কিন্তু এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না বললেই চলে।

গ্রাম-গঞ্জের নববর্ষ
গ্রামের সাধারণ জীবনে নববর্ষের তাৎপর্য রয়েছে যথেষ্ট। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই চলে নববর্ষকে বরণ করার নানা আয়োজন। তারা ঘর গৃহস্থালিগুলো পরিষ্কার করে পরিপাটি করে নেয়। সামর্থ অনুযায়ী ফুল পাতা পাখি বানিয়ে ঘর সাজায়, পারলে কেউ আলপনাও করে থাকে, সকাল সকাল গোসল সেরে নেয়, দিনটি তাদের কাছে খুবই পবিত্র তাই যে যতটা পারে একে অপরের সাথে সোহার্দ্য বজায় রেখে নতুন দিনের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে। ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী সকলেই আসা যাওয়া করে প্রায় সারাদিনই। এ যেন শুধু বছরের প্রথম দিন বলেই। পিঠা-পায়েসসহ নানা মিষ্টি ও লোকজ খাবারের আয়োজন থাকে প্রত্যেক বাড়িতে। গ্রামে, গঞ্জে নববর্ষের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বৈশাখি মেলা। সর্বজনীন বৈশাখিমেলা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা জায়গায় বসে। তিনদিন, পাঁচদিন, সাতদিন- এভাবে একেক জায়গায় একেক সময় ধরে মেলা চলে। এসব লোকজ মেলায় সবচাইতে আনন্দ হয় যেন শিশু কিশোর-কিশোরীদের। দলবদ্ধ হয়ে কিছু পয়সা হাতে নিয়ে কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। এ মেলায় থাকে নানা ধরনের কারুপণ্য, লোকশিল্প, মৃৎশিল্প। এখানে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে নারীদের সাজসজ্জার সামগ্রীসহ দৈনন্দিন চলার সামগ্রী ও কম নয়, বাটি, হাঁড়ি, পাতিল, খুন্তি, বঁটি, ছুঁরিসহ নানা কিছু। মাটির বস্তু থেকে শুরু করে সিলভার ও প্লাস্টিক মাধ্যমের সামগ্রীরও অভাব নেই। মেলায় খাবার সামগ্রী রয়েছে মিষ্টান্ন, পিঠা, বাতাসা, সন্দেশ, মুড়ির মোয়া এমন অনেক কিছু- বাদ যায় না কাঠের তৈরি খেলনা ও আসবাবপত্রও।
বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে- সার্কাস, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ, লোকনৃত্য, লোকসংগীত, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, বাউলগান, যাত্রাপালা এবং নাটক প্রদর্শনীর।
বাংলাদেশের বহু স্থানে এসময়ে বৈশাখি মেলা বসে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো : মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মানিকগনঞ্জ, মহাস্থানগড়, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিলা, লাঙ্গলকোট, চাপাই নবাবগঞ্জ, সিলেটের জাফলং, মনিপুর- এরকম প্রভৃতি জায়গায়। রংপুরের পায়রা বন্দর, দিনাজপুরের ঘাট এলাকা এছাড়া মাদারিপুর, মুজিবনগরসহ আরো বহু এলাকায়।
ঢাকার কাছাকাছি যেখানে বৈশাখি মেলার আয়োজন হয়ে থাকে টঙ্গির স্থানকাটা মেলা, সোলারটেক মেলা, রাজননগর মেলা। মিরপুর দিগাঁও মেলা।
অতীতের আচার অনুষ্ঠান কিছু বিলুপ্ত হয়েছে, এসেছে নতুন উপকণ, যুক্ত হয়েছে নানারকম নানা কিছু। ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো গোরুর দৌড়, মোড়গ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকা বাইচ, যে যমন খুশি সাজো এসব এখন আর তেমন চোখে পড়ে না নগর কিংবা গ্রামে।
নগরের নববর্ষ
তবে, নগরের সাংস্কৃতিক পরিম-ল অনুযায়ী নববর্ষের আয়োজন বড়ো জাঁকজমকপূর্ণ। প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্যদিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এখানে বড়ো উদ্যানে লোকেরা সমবেত হয় বটবৃক্ষের নিচে, সেখানে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। সেদিন প্রায় সকলেই বাঙালি পোশাক পরার চেষ্টা করেন। পয়লা বৈশাখে পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ খাওয়ার প্রচলন কখনোই ছিল না। চৈত্র-বৈশাখ মাসে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ে না। বাংলাদেশের সব জায়গায় ইলিশ মাছ ধরা পড়ে না। ফ্রিজিং ব্যবস্থাও ছিল না। মাছ সংরক্ষণ করতে হতো লবণ দিয়ে। তাজা ইলিশ একস্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই পয়লা বৈশাখে ইলিশ মাছ খাওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না।
বাঙালির বাংলা সকল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে হারিয়ে এমন নতুন কিছু না হোক যাতে বাংলার মায়েরা নিঃস্ব হয়ে যায়। মায়েরা নিঃস্ব হলে সন্তানেরা পথহারা হয়। না-চাইতেই সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে বিরাট প্রকৃতি দান করেছেন তা আমাদের জন্য নেয়ামত। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য লীলা আমাদের করেছে মহীয়ান, বুদ্ধিদীপ্ত এবং গৌরবান্বিত। আজকের এই নববর্ষে বিধাতার কাছে এমন মঙ্গল চাই। যা আমাদেরকে করবে শৃঙ্খলিত, পরিশিলীত, মার্জিত, উদার পরোপকারী এবং বিনয়ী। যা আমাদের করবে শৃঙ্খলিত,পরিশিলীত, মার্যিত, উদার পরোপকারী এবং বিনয়ী।