একটি সুস্থ সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে নিজেদের মুখ উজ্জ্বল করে -মনির খান

25 May 2025, 02:21 PM সারেগারে শেয়ার:
একটি সুস্থ সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে নিজেদের মুখ উজ্জ্বল করে -মনির খান

দেশীয় সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মনির খান। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সংগীতজীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান। তার গাওয়া গানগুলো আজও অসংখ্য ভক্ত শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। মনির খান ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘তোমার কোনো দোষ নেই’ নামের একটি একক অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে সংগীতজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি ৪৩টি একক অ্যালবাম, তিন শো’র বেশি মিক্সড অ্যালবাম এবং চার শো’রও বেশি ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। তিনি তিনবার পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। গুণী এই শিল্পীর সংগীতজীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় আনন্দভুবনের সঙ্গে। সেই কথার চুম্বক অংশ আনন্দভুবনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


মনির খান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১ আগস্ট ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার মদনপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলশিক্ষক পিতা মো. মাহবুব আলী খান এবং মাতা মোছা. মনোয়ারা খাতুনের ঘরে এক বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে মনির খান দ্বিতীয়। তিনি শিক্ষাজীবন শুরু করেন তার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর হাকিমপুর এবং যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর বহরাম উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন কোটচাঁদপুর ডিগ্রি কলেজে। একই কলেজ থেকে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

মনির খানের ছেলেবেলা কেটেছে তার নিজ গ্রামে। ছেলেবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে সাঁতার কেটেছেন, মাছ ধরেছেন, খেলাধুলা করেছেন। সব মিলিয়ে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন এই শিল্পী। এসবের মধ্যেও ছেলেবেলা থেকেই তার গানের প্রতি প্রচ- নেশা ছিল।

মনির খানের সংগীতে হাতেখড়ি ওস্তাদ রেজা খসরুর কাছে। তার হাতেই পদ্ধতিগতভাবে প্রথম গান শেখা। তারপর স্থানীয় আরো কয়েকজন ওস্তাদের কাছে গান শিখে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে গ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন গান করবেন বলে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে যখন স্কুল-কলেজে পড়েন তখন থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। যেখানেই অংশগ্রহণ করতেন সেখানেই মানুষের খুব বাহবা পেতেন। ভক্তশ্রোতারা তার গান শুনে হাততালি দিতেন, উৎসহ দিতেন। ছেলেবেলায় গান গেয়ে বহু পুরস্কারও পেয়েছেন। তখন থেকেই মনির খানের গানের আগ্রহ বহু গুণে বেড়ে যায়। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা একটি হারমোনিয়াম কিনে দেন তাকে। বাবা বলেন, “সংগীতের প্রতি তোমার একটা মোহ আছে। তুমি লেখাপড়ার পাশাপাশি সংগীত নিয়েই থাক।” তারপর বাবাই ওস্তাদ ঠিক করে দিলেন। তখন থেকেই গান-বাজনা শুরু। এরপর সেখান থেকেই আস্তে আস্তে এই পর্যায়ে আসতে পেরেছেন মনির খান। তার জনপ্রিয় কয়েকটি গান হলোÑ ‘তোমার কোনো দোষ নেই’, ‘বিধি আমার এ চোখ অন্ধ করে দাও’, ‘আট আনার জীবন’, ‘ভাড়া করে আনবি মানুষ’, ‘প্রেমের তাজমহল’, এবং ‘অঞ্জনা’।

মনির খানের বর্তমান ব্যস্ততা ও পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে বলেন, “আমি তো গানের মানুষ তাই গান নিয়েই যত ব্যস্ততা। আমার দু’টি ইউটিউব চ্যানেল আছে ‘মনির খান অফিসিয়াল’ ইউটিউব চ্যানেল আর ‘এমকে মিউজিক ২৪’ চ্যানেল। দু’টি চ্যানেলেই নিয়মিত গান প্রকাশিত হচ্ছে। “আসন্ন ঈদ উপলক্ষেও গান তৈরি হয়ে গেছে। রেকর্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। শুটিং করব দুই একের মধ্যেই। ঈদ উপলক্ষে দু’টি গানের বেশি দেওয়া যায় না। দুই চ্যানেলে দু’টি গান যাবে। ঈদের আগে হয়তো আরো দুয়েকটা গান যাবে। প্রতিমাসেই দুই চ্যানেলে দুই-চারটা করে গান যায়। পরিস্থিতি বুঝে দশদিন পর একটা বা পনেরদিন পর আরেকটা এভাবে আমরা সময়ের উপর ভিত্তি করে গানগুলো আপলোড করি। আপনারা জানেন, আমি ভাইরাল বা ভিউয়ের পিছনে দৌড়াই না। একটু মেসেজমূলক বা কথা প্রধান গান করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। রুচিশীল গান যেটাকে বলা হয়। সেই গানের হয়তো ভিউ খুব বেশি হয় না। কিন্তু গানটা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। আমি কখনো সময়ের স্রোতে গা ভাসাইনি। আমি আমার সৃষ্টিটাকে সুস্থভাবে তৈরি করার ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থেকেছি। আমি স্টেজ প্রোগ্রাম নিয়েও ব্যস্ত ছিলাম এবছর। এখন বৈশাখি ঝড়-বৃষ্টির কারণে আউটডোরের প্রোগ্রাম একটু কমেছে। তারপরও ভালো যাচ্ছে। গত ঈদের পর দেশের বাইরে কাতারে প্রোগ্রাম করে এলাম। তারপর গেলাম সিঙ্গাপুরে প্রোগ্রাম করতে। সৌদি আরব যাওয়ার কথা চলছে। এভাবে সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ততা সংগীতকে ঘিরেই।”

মনির খানের প্রায় গানেই একটা বিরহের ছাপ থাকে। বিরহের গান বেশি গাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের হিসাব একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে। আসলে সুখ, ভালো থাকা, ভালো লাগা খুবই সামান্য সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। আর বিরহ, দুঃখ-কষ্ট এটা দীর্ঘ সময়ের এবং এটা আপন মনের ভেতরে দীর্ঘসময় ধরে থাকে, এটা সহজে বের করা যায় না। আর সুখটা নেওয়ার জন্য আশেপাশে বহুলোক থাকে। দুঃখের সময় কেউ পাশে থাকে না। কাউকে পাওয়া যায় না। দুঃখটা একেবারেই আপন মনের আপন জনের, একান্তই নিজের। আসলে কোনো মানুষ দুঃখের কথা শুনতে চায় না। দুঃখটা ভাগ করতে চায় না। তখন এই দুঃখের সঙ্গী হিসেবে বিরহের গানগুলোই তার কাছে আপন এবং সবচেয়ে প্রিয় মনে হয়। যার কারণে আমি এই জায়গাটা বেছে নিয়েছি।”

মনির খানের বেশ কিছু গানের আলোচিত চরিত্র অঞ্জনা। অঞ্জনাকে নিয়ে তিনি চল্লিশটিরও বেশি গান গেয়েছেন। এই আলোচিত চরিত্র অঞ্জনার রহস্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে মনির খান বলেন, “এখানে আসলে আমি গল্পের কথা কিছু বলতে চাই না। এটা গানে গানেই বলা আছে। ইতোমধ্যে এবিষয়টি সব মানুষ জেনে গেছে। আপনিও হয়ত জেনেছেন। তারপরও বলি : ধরুন, আপনার কাছেও কোনো-না-কোনো বিষয় ছিল যা প্রকাশ করতে পারেননি। আমি যেহেতু শিল্পী মানুষ তাই গান গেয়ে মানুষের সঙ্গে বিষয়টি ভাগাভাগি করার সুযোগ হয়েছে বলেই আমি এটা করতে পারছি। এই সুযোগ তো সবার হয় না। কারণ সবাই তো আর মনির খান নয়।”

দীর্ঘদিন পর রেডিও-টিভিতে গান গাইলেন, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?

“দীর্ঘদিন এই শব্দটাতেই আমরা আঘাতপ্রাপ্ত হই। কারণ, এটা আমরা কখনো আশা করি না। কারণ রেডিও-টেলিভিশন দু’টি সরকারি মাধ্যম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল শিল্পী সকল কলাকৌশলীর কাজ করার সুযোগ অবাধে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে দেখা গেল কেউ ভিন্ন মতের হলে সেখানে জায়গা পাচ্ছে না। আপনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে আমাকে ধাক্কা দিচ্ছেন, আমি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে আপনাকে ধাক্কা দিচ্ছি। এই নোংরামির কারণেই আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা কখনোই বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে পারছি না। কারণ সুস্থ সংস্কৃতিবিহীন একটা রাষ্ট্র সুস্থভাবে পরিচালনা করা বা সারাবিশ্বের কাছে রাষ্ট্রের মানমর্যাদা উন্নত করা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। একটা বিষয় আমাদের সবার কাছেই পরিষ্কার, একটা দেশের একটা ভূখ- দখল হলেই যে দেশ দখল হয়ে গেছে তা বলা যায় না। কিন্তু সেই দেশের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে, সংস্কৃতির বদলে অপসংস্কৃতি বিরাজ করলে সেই দেশের মেরুদ- নষ্ট হয়ে যায়। তেমনিভাবেই আমরা বেশ কয়েকটি বছর দেখেছি বাইরের দেশের সিরিয়াল দেখিয়ে আমাদের ঘরের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে দিচ্ছে। তারপর বাইরের শিল্পীদের এনে এখানে নানান রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতি দারুণভাবে আঘাত করা হচ্ছে। যেটাকে আমরা বলি দেশে অপসংস্কৃতি বিরাজ করছে আর সুস্থ সংস্কৃতি অনেক দূরে চলে গেছে। সেই জায়গা থেকে আমরা কোনোভাবেই দেশের কালচার-কৃষ্টিকে পরিস্ফুটিত করার জন্য ভূমিকা রাখতে পারি নাই।

এখন আমরা চিন্তা করছি বিগত দিনের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেগুলো ঘটে গেছে সেগুলো আর ঘটবে না। সবাই সমান সুযোগ পাবে। যার প্রমাণ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টের মাধ্যমে পেয়েছেন। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বিশাল কনসার্টের দাওয়াত কিন্তু সবাই পেয়েছিল। সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছিল।”

সংগীত নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মনির খান বলেন, “পরিকল্পনা তেমন কিছু নেই। আমি যেভাবে কাজ করছি সেভাবে কাজ করে যাব এবং সুস্থ চিন্তায়, সুস্থ অবস্থায় কাজ করে যেতে চাই। কারণ, এখানে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। সুন্দর চিন্তায় ভালো কিছু করে জীবন পার করাই আমার স্বপ্ন। সংগীতকে সমৃদ্ধ করা এবং দেশের সুস্থ সংস্কৃতিকে যদি আমরা ভালোভাবে দাঁড় করাতে পারি সেটাই হবে দেশের জন্য এবং জনগণের জন্য কাজ করা। একটি সুস্থ সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে নিজেদের মুখ উজ্জ্বল করতে সহযোগিতা করে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার জন্যই আমার কাজ করার স্বপ্ন সবসময়।”