ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের শাখা বুড়ি ভৈরব নদীর উত্তর দিকে সুন্দরপুর গ্রামে জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। এলাকাটি একসময়ে নাটোর রাজ্যের অধীনে ছিল। নাটোরের রাজ কর্মচারী গোপালদী বিশ্বাস আঠারো শতকের শেষ দিকে এই এলাকায় জমিদারির দায়িত্ব লাভ করেন। নাটোর রাজ্যের অধিন জমিদার গোপালদী বিশ্বাস প্রায় একদশক সুনামের সাথে জমিদাার করেন। গোপালদী বিশ্বাসের মৃত্যু হলে তার বড়ো ছেলে আমির হোসেন চৌধুরী, ছোটো ছেলে সমির হোসেন চৌধুরী ও মেয়ে শাহারুন্নেছার মধ্যে তিন ভাগে জমিদারি ভাগ হয়ে যায়। জমিদার গোপালদী বিশ্বাসের উইল অনুযায়ী তার বড়ো ছেলে আমির হোসেন চৌধুরী পাঁচ আনা, ছোটো ছেলে সমির হোসেন চৌধুরী পাঁচ আনা এবং মেয়ে শাহারুন্নেছা ছয় আনা জমিদারি পান।
জমিদার বাড়ির তিন শরিকই খাজনা আদায় ও বিচার শালিশের জন্য আলাদা আলাদা কাছারিভবনসহ পাশাপাশি বসবাসের জন্য যার যার রুচি অনুযায়ী অন্দরমহলে বেশ কিছু ভবন নির্মাণ করেন। জমিদার বাড়ির পূর্ব দিকে গোপালদী বিশ্বাসের ছোটো ছেলে সমির হোসেন চৌধুরীর অংশ। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির পূর্ব অংশটি ছোটো তরফ হিসেবে পরিচিত। এই অংশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একতলা কাছারিভবনটি মাটি থেকে উচু প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত। পূর্ব-পশ্চিমমুখি ভবনটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে। মাঝখানের আয়তকার বড়ো কক্ষটিতে বিচার শালিসি হতো। দুই পাশের অন্য দু’টি কক্ষে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। কাছারিভবনের দুই পাশে টানা লম্বা বারান্দা রয়েছে। ছোটো তরফের কাছারিভবনটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। এই অংশের অন্দরমহলে দু’টি ভবন এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে, বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের কারণে আদিরূপ এখন আর নেই।

সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির পশ্চিমাংশে রয়েছে বড়ো তরফ। আমির স্টেট। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির এই অংশটিতে অন্দরমহলের একতলা ভবন, প্রবেশদ্বার ও কাছারিভবনে প্রচীন রূপটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির বড়ো তরফ আমির স্টেট নামেও পরিচিত। বড়ো তরফের প্রবেশ দ্বারের উপরে ইংরেজি বর্ণমালায় SUNDERPUR, AMEER ESTATE, P.S - MOHESPUR, DIRT- JESSORE লেখাটি এখনো শোভা পাচ্ছে। জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের একতলা ভবনটি ইংরেজি BD U আকৃতির। প্রবেশ ফটক দিয়ে একতলা বাড়িটিতে ঢুকলেই দুই দিকে উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর অনেকগুলো সারিবদ্ধ কক্ষ। কক্ষের সামনে টানা লম্বা বারান্দা। ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সম্প্রতি নিজ উদ্যোগে কিছুটা সংস্কার করা হচ্ছে। মূল বাড়িটির পূর্ব দিকে কিছুটা দূরে আমির স্টেটের তিনকক্ষবিশিষ্ট কাছারিভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির এ অংশটি সবচেয়ে পুরাতন। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির অন্যসব কাছারির মতো এখানেও খাজনা আদায় ও বিচার-শালিসির ব্যবস্থা ছিল।
ছোটো তরফ সমির স্টেটের পশ্চিম পাশে এবং বড়ো তরফ আমির স্টেটের পূর্ব পাশে বোন শাহারুন্নেছার ছয় আনা জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। এই অংশের অন্দরমহলে বেশ কয়েকটি দোতলা ও একতলা ভবন রয়েছে। সম্প্রতি ভবনগুলোর কয়েকটি সংস্কার করা হয়েছে। অন্দরমহলের কিছুটা দূরে দক্ষিণ দিকে পুকুর পাড়ে অতিথিদের থাকার জন্য দোতলাবিশিষ্ট হাওয়া খানা নির্মাণ করা হয়েছিল। হাওয়া খানার পূর্ব পাশে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। হাওয়া খানার প্রতিটি তলায় একাধিক কক্ষ। হাওয়া খানাটি বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য হাওয়া খানার পশ্চিম পাশেই একতলা কাছারিভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনকক্ষবিশিষ্ট উত্তর-দক্ষিণ মুখি কাছারিভবনটি বেশ বড়ো। কাছারির দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে বারান্দা রয়েছে।
সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের ভবনগুলো আলাদা আলাদা নকশায় তৈরি করা হলেও কাছারি ভবনগুলোর নির্মাণশৈলী ও নকশাগুলো প্রায় একই রকমের। তিনটি অংশের কাছারিভবনই একতলাবিশিষ্ট। কাছারিভবনগুলোতে তিনটি করে কক্ষ ও বারান্দা রয়েছে। সুন্দরপুর জমিদার বাড়ির ভবনগুলোতে দেশীয় স্থাপত্যরীতি লক্ষ্য করা গেলেও কাছারিভবনগুলোতে ইন্দ-ইউরোপীয় রীতি দেখা যায়। ইংরেজদের অসহযোগিতা আর ষড়যন্ত্রে নাটোর রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটলে বিশ শতকের আগেই নাটোর রাজ্যের অধীন সুন্দরপুর জমিদারির অবসান ঘটে। এ সময়ে মাফি মিয়া চৌধুরী ও মবু মিয়া চৌধুরী দুই ভাই সর্বশেষ জমিদার ছিলেন। বিশাল এলাকাজুড়ে সুন্দরপুর জমিদার বাড়িতে এখনো উত্তরসূরিরা বসবাস করছেন।
লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন নির্মাতা