বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে শরৎ হলো প্রকৃতির নীলপাড় শাড়ি পরা রানি। বর্ষার ঝরঝরে অশ্রু শেষে সে আসে, কাশফুলের শুভ্র ঘোমটা মাথায়, শিউলির মালা গলায়, নদীর তীরে মায়াবী হাসি ছড়িয়ে। গ্রীষ্মের তপ্তরোদ আর বর্ষার বারিধারার পর এ এক শ্বাস নেওয়ার কাল, এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। আকাশে গাঢ় নীলের পটভূমিতে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসে। মনে হয়, কে যেন আকাশের ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে এঁকে দিয়েছে সাদা রাজহাঁসের সারি।
আকাশে মেঘের ভেলা, মাঠে সোনালি স্বপ্ন
শরতের ভোরে কুয়াশার পর্দা সরিয়ে সূর্য উঠে আসে সোনালি আভা নিয়ে, আর বাতাসে মিশে থাকে ধানের গন্ধ। মাঠে সোনালি ধানের ঢেউ, কাশবনে বাতাসের গুঞ্জন, নদীর জলে রোদের ঝিলিক, সব মিলিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্য। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো :
“আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা।”
শিউলিতলায় ঝরে থাকা সাদা ফুল মাটিতে বিছানো তারার গালিচা। গ্রামের আঙিনায় সকালের শিশিরভেজা মাটির গন্ধ, দূরে বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসে গোরুর গলার ঘণ্টাধ্বনিÑ এই প্রশান্তি শুধু বাংলার শরতেই পাওয়া যায়।
ফুল নদী আর কাশের রাজত্ব
শাপলা-শালুক হাসে নদী-বিলে, পদ্মফুলের শোভা গ্রামের জলাশয়ে ছড়িয়ে থাকে। কাশবন দুলতে থাকে নদীর ধারে, যেন গোপন কোনো পূর্ণিমা-পূজার সাজ। গ্রামীণ প্রবাদ : ‘কাশফুল ফুটলেই মা আসছেন’। শরতের হাওয়া দুর্গা আগমনের বার্তা নিয়ে আসে। আশ্বিনের পূর্ণিমায় দুর্গা কৈলাস ছেড়ে বাবার বাড়িতে আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন আশীর্বাদ, মিলন ও আনন্দের ¯্রােত।
আনন্দের ঢেউ
শরতের সোনালি হাওয়া দেয় উৎসবের ডাক। মন্দিরে বাজে ঢাকের ছন্দ, শঙ্খধ্বনিতে ভরে ওঠে সকাল, ধূপের গন্ধে আকাশ-মাটি একাকার। নারীদের কপালে লাল টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শঙ্খ সব মিলিয়ে রঙিন আবহ। সিঁদুর খেলায় নারীদের হাসি, নদীর ধারে বিসর্জনের জলে প্রতিফলিত শরতের সাদা মেঘ সবকিছু মিলে এক অন্তহীন কবিতা।
কবিতার পাতায় শরতবন্দনা
নজরুলের ছন্দে,
শাপলা শালুক সাজাইয়া সাজি শরতে শিশির নাহিয়া
শিউলি-ছোপানো শাড়ি পরে ফের আগমনী গীত গাহিয়া
রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলি’-তে শিলাইদহের পদ্মাতীরে শরতের শান্ত রূপ আজও চিরন্তন হয়ে আছে। কবিরা শরৎকে কেবল ঋতুরূপে নয়, অনুভূতির রূপে বন্দনা করেছেন, যেখানে আলো, ভালোবাসা আর আশার মিশেল আছে।
নশ্বরতার আভাস, আশার আলো
শরৎ সৌন্দর্যের উৎসব হলেও মনে করিয়ে দেয়, সবই ক্ষণস্থায়ী। শরতের চাঁদও একদিন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যায়। ইতিহাস বলে, কোনো এক শরতে রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধের ছায়া অনুভব করেছিলেন ; আজও পৃথিবীতে অন্ধকার আছে। কিন্তু শরতের শান্ত আলো শেখায় প্রতিটি অন্ধকারের পরই আসে আলোর উজ্জ্বলতা, যেমন পূর্ণিমার চাঁদ মেঘ সরিয়ে আবার উদ্ভাসিত হয়।
চাঁদ চূড়ে বাঁধা আনন্দের মালা
যখন বাংলার আকাশে শরতের পূর্ণিমা ওঠে, নদীতে নৌকা দোলে, বাতাসে ধানের সুবাস ভাসে তখন মনে হয়, শিবের চন্দ্রকলার মতো এই চাঁদকেও চিরকাল মাথায় বেঁধে রাখা যায়।
‘শিব সুন্দর শরৎ চাঁদ চূড়’- এ শুধু একটি দৃশ্য নয়, এটি বাংলার হৃদয়ের অনন্ত কবিতা, যা যুগ যুগ ধরে আলো আর শান্তির বার্তা ছড়িয়ে যাবে।
রাতের চাঁদের গান
নীল আকাশে ভাসে মেঘ, কাশফুল দোলে হাওয়ায়,
শিউলির গন্ধ ভেসে আসে, ভোরের শিশির-পাওয়ায়।
পদ্মতীরে ঢেউ খেলে, বিলে শাপলা হাসে,
শরতের আলো ছড়িয়ে পড়ে নদীর জলের পাশে।
ঢাকের তালে নাচে মন, দুর্গা এলো ঘরে,
শঙ্খধ্বনি মেশে রোদে, আনন্দ ভাসে দ্বারে।
পূর্ণিমা চাঁদ শিবের কাঁধে সোনা-মালা,
শরতের এই স্বপ্ন-রাতে মুছে যায় সব জ্বালা।