সন্তোষ জমিদারবাড়ি : মোশাররফ হোসেন

22 Feb 2026, 03:11 PM অন্যান্য শেয়ার:
সন্তোষ জমিদারবাড়ি : মোশাররফ হোসেন

সুলতানি ও মুঘল শাসনামলে ইসলামধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অনেক সুফিসাধক পূর্ব-বাংলায় আসেন। মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার নবাব হিসেবে মুর্শিদকুলি খান দায়িত্ব পান। একই সময়ে সুফিসাধক হযরত শাহজামান [র.]-কে পূর্ব-বাংলার কাগমারী পরগনার জায়গীর প্রদান করা হয়। জায়গীর লাভের পর তিনি দিল্লি থেকে পূর্ব-বাংলার কাগমারী পরগনাতে এসে শাসনকার্য পরিচালনার পাশাপাশি ইসলামধর্ম প্রচার করতে থাকেন। এসময়ে কাগমারী পরগনার সনাতন ধর্মাবলম্বী ইন্দ্র নারায়ণ নামের এক প্রতাপশালী ব্যক্তি ইসলামধর্ম গ্রহণ করে এনায়েতউল্লাহ নাম ধারণ করেন। কালক্রমে তিনি সুফিসাধক হযরত শাহজামানের অন্যতম বিশ্বস্ত শিষ্যে পরিণত হন এবং কাগমারী পরগনার নায়েব নিযুক্ত হন। সুফিসাধক হযরত শাহজামানের মৃত্যুর পর তাকে কাগমারী পরগনার জায়গীর প্রদান করা হয়।

এনায়েতউল্লাহ কাগমারী পরগনার জায়গীর পাওয়ার পর শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ভীষ্মদেব রায় নামে জনৈক ব্যক্তিকে নায়েব হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন। নায়েব ভীষ্মদেব রায় কাগমারী পরগনারকে ৬ আনা, বড়ো ৫ আনা ও ছোটো ৫ আনা তিনটি অংশে ভাগ করে তার তিন ছেলে রঘুনাথ রায় থেকে রামেশ্বর রায় ও রামচন্দ্র রায়কে দায়িত্ব দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন।

ইতোমধ্যে ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনক্ষমতা দখল করে। তখন ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসক লর্ড কর্নওয়ালিস রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রচলন করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুযোগে রঘুনাথ রায়, রামেশ্বর রায় ও রামচন্দ্র রায় তিন ভাই ইংরেজ কোম্পানি শাসকদের কাছ থেকে কাগমারী জমিদারির দায়িত্ব পান। তখন থেকেই কাগমারী পরগনা সন্তোষ জমিদারি নামে পরিচয় লাভ করে। টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর ও সিরাজগঞ্জের বিশাল এলাকা জুড়ে তাদের জমিদারি বিস্তৃত ছিল।

সন্তোষ জমিদারবাড়িটির সীমানায় প্রবেশ করার পর বিচ্ছিন্নভাবে অনেকগুলো প্রাচীন ভবন চোখে পড়বে। মূল বাড়িটিতে ঢোকার জন্য আরো একটি বড়ো প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করতে হতো। এখন ভিন্ন পথেও প্রবেশ করা যায়।

সন্তোষ জমিদার বাড়িটি দু’টি অংশে বিভক্ত। উত্তর দিকে প্রথম তিনটি ভবনে জমিদারের দাপ্তরিক কাজ হতো। আর অন্দরমহলের উত্তর দিকে দোতলা ভবনে জমিদার শ্রীমতি জাহ্নবী দেবী চৌধুরী বসবাস করতেন। দোতলা ভবনের পাশে লাগোয়া একতলা লম্বা ভবনটিতে জমিদার শ্রীমতি জাহ্নবী দেবীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বসবাস করতেন। অন্দরমহলের পূর্ব পাশে প্রশস্ত কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে হয়। ভবন দু’টির ছাদের ভর বহন করা কাঠের টানা ভীম, কাঠের জানালা ও দরজার চৌকাঠ এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে।

বিশাল জমিদার বাড়িটি ছিল উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। তৎকালীন বাড়িটির দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে দু’টি বিশাল সিংহ দুয়ার ছিল। জমিদার বাড়ির পূর্ব পাশে খাল ছিল। ধলেশ্বরীর শাখা নদী লৌহজং-এর খাল দিয়ে জলপথে সন্তোষ জমিদার বাড়িতে সরাসরি যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল। খাল থেকে জমিদার বাড়ির ঘাটে নামলেই একসময়ে চোখে পড়ত গঙ্গামন্দির, দুর্গামন্দির, নন্দ গোপাল গোবিন্দমন্দির ও শিবমন্দির। শিবমন্দিরটি এখনো ভালো অবস্থায় টিকে আছে। নন্দ গোপাল গোবিন্দমন্দিরটি কালের আবর্তে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শিবমন্দিরের পূর্ব পাশে নতুন করে গোবিন্দমন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। গঙ্গামন্দির ও দুর্গা মন্দিরের জায়গাটিতে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণরীতি দেখে ধারণা করা হয়, প্রাচীন মন্দিরগুলো ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল।

জমিদার বাড়ির দক্ষিণ দিকের সিংহদুয়ার দিয়ে ঢুকলেই একটি একতলা হলুদ রঙের ভবন চোখে পড়ত। এখনো ভবনটি টিকে আছে। ভবনটি জমিদার বাড়ির পাইক পেয়াদাদের বসবাসের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

জমিদার বাড়ির পেছনে রয়েছে বিশাল পুকুর। অন্দরমহলের পেছনে বিশাল বাগান ছিল। বাগানের ভেতর দিয়ে পুকুরে যেতে হতো। চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা পুকুরটি জমিদারের শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

সন্তোষ জমিদার বাড়ির আঙিনাতেই গড়ে উঠেছে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে সন্তোষ জমিদার বাড়ির বেশকিছু প্রাচীন ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে। অনেকেরই অভিমত ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বিবেচনায় এনে সিংহদুয়ারসহ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবন রক্ষা করা যেত।

সন্তোষের জমিদারেরা শিক্ষা ও ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইলের সন্তোষে জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজ, কলকাতার ইস্ট বেঙ্গল ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠাসহ ঢাকা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও কলকাতায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান রয়েছে।

সন্তোষ জমিদার বাড়ির শ্রীমতি জাহ্নবী দেবীর প্রাসাদভবন, দাপ্তরিক ভবন, বাড়ির মূল ফটক, সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয়ের ভবনসহ বিভিন্ন ভবন নির্মাণে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যের সঙ্গে দেশীয় স্থাপত্যের মিশ্রণ লক্ষণীয়। এছাড়া মন্দিরগুলোর নির্মাণশৈলীতে ভারতীয় স্থাপত্য লক্ষ করা যায়। 

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা