বাংলাদেশে ভারী কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মধ্যে চামড়াশিল্প অন্যতম। প্রকৃতির অপূর্ব লীলাভূমি বাংলাদেশে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত প্রচুর চারণভূমি, সস্তা শ্রমিক, পশুপালনে বেকার জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পশুবিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা, খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম, কৃত্রিম প্রজনন, নেপিয়ার ও জাম্বুর মতো উন্নত জাতের ঘাসের চাষ, দানাদার পশুখাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং পশুচিকিৎসার প্রতি সরকারের গুরুত্ব প্রদান, ভারত থেকে কোরবানির পশু আমদানি বন্ধের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলদেশে পশুপালন ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এতে আগের তুলনায় পশু উৎপাদনের সংখ্যা বেড়ে গেছে বহুগুণ। গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মাংস, দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য আর বেড়েছে মূল্যবান চামড়ার উৎপাদন।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহা এদেশে প্রথম চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করেন। তারপর ঢাকার হাজারিবাগে একে একে চামড়া কারখানা গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৩০টি চামড়া কারখানা ছিল। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে চামড়াশিল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের অন্যান্য অর্থকরী খাতের মতো চামড়াশিল্পও ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। স্বাধীনতার পর একটু বিলম্বে হলেও চামড়াশিল্প ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় এবং বিদেশে চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে থাকে। ফলে দেশে চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। পরিবেশগত কারণে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে চামড়ার কারখানাগুলো ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী হাজারিবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে চামড়াশিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড়ো রপ্তানি খাত। দেশে চামড়াশিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা অপরিসীম। চামড়াশিল্প ব্যবস্থাপনায় ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে ‘বাংলাদেশ চামড়াশিল্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আইন-২০২৪’ শীর্ষক আইনের খসড়া প্রণয়ন করে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই নতুন আইন চামড়াশিল্পের বিকাশে গুরুত্ব¡পূর্ণ অবদান রাখে। শিল্প আয়ে চামড়া খাতের অবদান প্রায় ২ শতাংশ আর রপ্তানিতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্য সংযোজনে প্রায় ৮০ শতাংশ। এই খাতের সঙ্গে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ৯৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার আয় করে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ কম। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি হয়েছিল ১২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে এক দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। বাংলাদেশে সাধারণত ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর ও কালীপূজার সময় বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়। উৎপাদিত চামড়ার প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ সংগৃহীত হয় পবিত্র ঈদুল আজহার সময়ে। আর বাকি ৪০ ভাগ চামড়া আসে ঈদুল ফিতর, কালীপূজা, সারাবছরে দৈনন্দিন ও ছোটোখাটো উৎসব-আয়োজন উপলক্ষ্যে জবাই করা পশুর থেকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই শিল্পটি ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত। কর্মসংস্থানের ভিত্তিতেও এ শিল্পের ভূমিকা অনন্য।

বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩৭৮ মিলিয়ন জোড়া চামড়ার জুতা তৈরি হয়ে থাকে। জুতা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে বিশ্বে অষ্টম। বাংলাদেশে বিশ্ববিখ্যাত জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এবিসি মার্ট, এডিডাস, নাইক, হোগোবস, কে-মার্ট, মার্ক স্পেনসার, স্টেইভ মেডেন, টিমবার ল্যান্ড, সিয়ার্স, এলডো, এইচ অ্যান্ড এম, মাইকেল কোরস-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্র্যান্ড। জুতা ছাড়াও আমাদের দেশে চামড়ার ব্যাগ, জ্যাকেট, বেল্ট, ওয়ালেট, সুটকেসসহ আরো অনেক পণ্যসামগ্রী উৎপন্ন হয়ে থাকে।
কোরবানির সময় চামড়া বিক্রি হয় নামমাত্র মূল্যে। এছাড়া চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ না-করা এবং ন্যায্য মূল্য না-পাওয়ায় অতীতে চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়া, মাটিতে পুতে দেওয়া বা পুড়িয়ে ফেলার মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। দেশে কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য না থাকায় বাড়তি লাভের আশায় প্রতিবছর কিছু চোরাকারবারি চামড়া পাচার করছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। বাংলাদেশ যদি চামড়াশিল্পে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, তবে আগামীদিনে এই চামড়া শিল্পের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং নতুন রপ্তানি খাতের বিকাশ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। সর্বোপরি ব্যবসা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাত চামড়া উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, বিভিন্ন ধরনের সহায়ক পরিষেবা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে চামড়াশিল্পকে একটি সম্ভাব্য নির্ভরযোগ্য রপ্তানিমুখী ও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রতিবছরই বড়ো হচ্ছে। তবে, দেশের মধ্যে প্রচুর কাঁচাচামড়ার সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। গত কয়েক বছর ধরে রপ্তানি আয় প্রায় একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। ন্যায্যমূল্য না-পাওয়ার কারণে প্রতিবছর কোরবানির চামড়ার একটা অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরীর পরিবেশ দূষণের কারণে এগোতে পারছে না বাংলাদেশের চামড়াশিল্প। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাভারের হেমায়েতপুরের ২০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চামড়াশিল্প নগরী বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে ২০ বছর পার করেছে সরকার। চামড়াশিল্প নগরীতে জমি বরাদ্দ পেয়েছিল ১৫৪টি কারখানা। তার মধ্যে উৎপাদনে আছে ১৪২টি কারখানা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারটি পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এত বছরেও কঠিন বর্জ্য ফেলার ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরু হয়নি। ফলে, বুড়িগঙ্গা নদীর পর ধলেশ্বরী নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। চামড়াশিল্প নগর পরিবেশবান্ধব না-হওয়ায় তার খেসারত দিতে হচ্ছে সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পকে। রপ্তানি বৃদ্ধি না-হওয়ার কারণে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। দুই হাজার/তিন হাজার টাকা মূল্যের গোরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকার নিচে এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে না সরকারি বেঁধে দেওয়া মূল্যও। আর খাসির চামড়া কেনার তো কোনো গ্রাহকই খুঁজে পাওয়া যায় না প্রায়ই।
এ মাসে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হতে চলেছে। প্রচুর পরিমাণে গবাদিপশু জবাই হবে। এগুলোর চামড়া ন্যায্যমূল্যে বেচ-কেনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়াও কোরবানির ঈদ আসলেই শুধু আমরা চামড়ার প্রক্রিয়াকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা করি। ঈদ যাওয়ার পর আমরা চামড়াশিল্পের গুরুত্বের কথা ভুলে বসে থাকি। অথচ, সেটি হওয়ার কথা নয়। সারাবছর ধরেই আমাদের চামড়াশিল্পের ওপর নজর রাখতে হবে। সারাবছর অব্যাহত রাখতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ।
লেখা : শ্যামল কায়া