ফারহানা তৃনার ভাবনায় Alliance Française-এ ‘Poetic Echoes with Monsoon Melodies’

09 Aug 2026, 02:31 PM আবৃত্তি শেয়ার:
ফারহানা তৃনার ভাবনায় Alliance Française-এ ‘Poetic Echoes with Monsoon Melodies’

বর্ষা কখনো প্রেমের, কখনো বিরহের; কখনো স্মৃতির, কখনো বিষণ্ণতার। আবার এই বর্ষাই হয়ে ওঠে উৎসব, আনন্দ ও সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। বর্ষার এমন বহুরূপী আবহকে কবিতা ও সংগীতের ভাষায় তুলে ধরে ৮ আগস্ট Alliance Française Dhaka-তে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘Poetic Echoes with Monsoon Melodies’।

ফারহানা তৃনার ভাবনায় নির্মিত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা ও ফরাসি সাহিত্য-সংগীতের দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসর মিলিত হয় বর্ষার এক অভিন্ন অনুভূতিতে। এখানে বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির একটি ঋতু নয়; প্রেম, অপেক্ষা, স্মৃতি, একাকিত্ব, বিষণ্ণতা এবং শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির আনন্দের এক নান্দনিক প্রতীক।

অনুষ্ঠানে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের পাঁচ বিশিষ্ট স্রষ্টা—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেন—এর নির্বাচিত কবিতা ও গান পরিবেশিত হয়। পাশাপাশি ফরাসি সাহিত্যের তিন বরেণ্য কবি Charles Baudelaire, Victor Hugo ও Paul Verlaine-এর কবিতার মধ্য দিয়ে বর্ষা, প্রকৃতি ও মানবমনের ভিন্ন এক অন্তর্লোক অন্বেষণ করা হয়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিবেদন করে কবিতা ও গানের বিশেষ যুগলবন্দীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের যাত্রা। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বর্ষার নানা রূপ—মনের ঋতু, প্রকৃতির উচ্ছ্বাস, প্রেম ও স্মৃতির অনুষঙ্গ—উঠে আসে তাঁর ‘এমনও দিনে তারে বলা যায়’ এবং ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’-এর বিশেষ ফিউশন পরিবেশনায়।

এরপর আয়োজনের আবহ পৌঁছে যায় ফরাসি কবিতার জগতে। Charles Baudelaire-এর কবিতায় নগরজীবন, সৌন্দর্য, বিষণ্ণতা ও মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বৃষ্টির এক ভিন্ন অনুভূতি তুলে ধরা হয়।

বাংলা পর্বে রজনীকান্ত সেনের গান, কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প ‘বাদল বরিষণে’-এর অংশবিশেষ এবং অতুলপ্রসাদ সেনের কবিতা ও গানের যুগলবন্দী অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্ন মাত্রার আবেগ। বিশেষ করে ‘বধু এমন বাদলে তুমি কোথা?’ ও ‘বধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে’—এই দুই সৃষ্টির সম্মিলনে বর্ষার প্রেম, অপেক্ষা ও বিরহ পায় এক আবেগঘন রূপ।

ফরাসি সাহিত্যের আরেক মহীরুহ Victor Hugo-র কবিতায় প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতির সম্পর্ক নতুনভাবে প্রতিফলিত হয়। এরপর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে বর্ষার আরও উজ্জ্বল ও উৎসবমুখর রূপ ফুটে ওঠে।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে ফিরে আসা হয় ফরাসি কবি Paul Verlaine-এর কবিতায়। ফরাসি Symbolist কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কবির সৃষ্টিতে বৃষ্টি যেন কেবল বাইরের কোনো দৃশ্য নয়; বরং তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মনের গভীরে জমে থাকা এক সূক্ষ্ম বিষণ্ণতায়। তাঁর ‘Tears Fall in My Heart’ ও ‘It Weeps in My Heart’ কবিতা দুটি একত্রে বিশেষ poetic collage হিসেবে পরিবেশিত হয়।

সন্ধ্যার শেষ নিবেদন ছিল বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। বর্ষার প্রেম, বিরহ, স্মৃতি ও বিষণ্ণতার নানা পর্ব পেরিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টির আনন্দের বার্তায়।

আয়োজকদের ভাষ্য, ভাষা, দেশ ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য আলাদা হলেও মানুষের কিছু অনুভূতি সর্বজনীন। বৃষ্টি তেমনই এক অনুভূতি, যা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকেও একই আবেগের কাছে নিয়ে আসতে পারে। বাংলা ও ফরাসি কবিতার পাশাপাশি অবস্থানের মধ্য দিয়ে সেই অভিন্ন মানবিক অনুভূতিরই সন্ধান করা হয়েছে ‘Poetic Echoes with Monsoon Melodies’-এ।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও আবৃত্তি করেন ফারহানা তৃনা—আবৃত্তিশিল্পী, প্রশিক্ষক, মিডিয়া উপস্থাপক এবং কাব্য কুহুক-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। সংগীত পরিবেশন করেন সামিয়া আহসান।

বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন আকরাম (বাঁশি), অনুপম (গিটার), দেবা পাল (কিবোর্ড) ও রবি পাল (তবলা)। তাঁদের সুর ও সংগীতায়োজন কবিতা ও গানের প্রতিটি পরিবেশনাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাই এবং উপস্থিত দর্শকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় Alliance Française Dhaka-এর প্রতি, যাদের সহযোগিতায় বাংলা ও ফরাসি সাহিত্য-সংগীতের এই সাংস্কৃতিক সংযোগ আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

‘Poetic Echoes with Monsoon Melodies’ শেষ হয়েছে, কিন্তু রেখে গেছে বর্ষার কিছু শব্দ, কিছু সুর আর কিছু কবিতার প্রতিধ্বনি—যা দর্শকের মনে হয়তো আরও কিছুক্ষণ বৃষ্টির মতোই ঝরে থাকবে।