বাংলা লোকসংগীতের উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের নাম ফরিদা পারভীন। তার মধুর ও গভীর কণ্ঠস্বর, আবেগভরা পরিবেশনা এবং আধ্যাত্মিক সংগীতের প্রতি নিষ্ঠার জন্য তিনি ‘লালনের গানের রানি’ হিসেবে খ্যাত। তিনি দেশে-বিদেশে একচ্ছত্রভাবে লালন সাঁইয়ের গান পরিবেশন করে মধ্যবিত্ত সমাজে লালনের গানকে পরিচিত করেছেন। এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে ফরিদা পারভীনকে নিয়ে লিখেছেন শ্যামল কায়া ও শহিদুল ইসলাম এমেল...
বরেণ্য লোকসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঔঁল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মা রৌফা বেগম ছিলেন গৃহিণী। নিজের জন্মগ্রাম নিয়ে ফরিদা পারভীন একধরনের স্লাগা অনুভব করেন। শাঔঁল হচ্ছে বাংলাদেশের সুন্দর এক গ্রাম ‘কলম’-এর অংশ। কলম গ্রামের মতো এত সুন্দর গ্রাম নাকি এখনো পুরো উত্তরবঙ্গে নেই। এ প্রসঙ্গে ফরিদা পারভীন ওই অঞ্চলে প্রচলিত একটি ছন্দোবদ্ধ উদ্ধৃতি সবসময় উল্লেখ করেন, ‘বিল দেখতে চলন। গ্রাম দেখতে কলম।’ সেই সুন্দর গ্রামেই তাঁর জন্ম।
ছেলেবেলায় ফরিদা পারভীন ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। প্রায় সারাক্ষণই তিনি দৌড়-ঝাঁপ আর খেলাধুলা করে কাটাতেন। তার দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ির মাঝখানে ছিল একটি নদী। আত্রাইয়ের সেই শাখা নদীর নাম ‘গৌর নদী’, যেটি ‘গুড়’ নদী নামেও পরিচিত। বাল্যে ফরিদা প্রায়ই গৌর নদী পার হয়ে দাদার বাড়ি থেকে নানার বাড়িতে চলে যেতেন। আর নানার বাড়ির পাশে ছিল বিরাট এক বিল। সেই বিলের মধ্যে থাকত ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকা। ওইসব নৌকাতে চেপে ফরিদা আর তার খেলার সঙ্গী মামাতো ভাইবোনেরা বিল থেকে শাপলা-শালুক তুলে আনতেন। তখন বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে ছোটো ছেলেমেয়েদের জীবন ছিল ঝরনার মতো চঞ্চল আর প্রকৃতির মতো সচ্ছল। তাই ফরিদারা দলবেঁধে মাঠের পর মাঠ চষে ফেলতেন হৈচৈ করতে করতে, কখনো সখনো গাছের মাথায় চড়ে ধরতেন শালিক টিয়া। খুব বেশি গরমের সময় তারা নানাবাড়ির আমবাগানের নিচে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন।
উদ্দাম ও চঞ্চল প্রকৃতির হলেও ছোলেবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল ফরিদার গভীর আকর্ষণ। শৈশব থেকেই ফরিদার ভালো লাগত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান। তখন তিনি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে চিনতেন না। কিন্তু রেডিও ছেড়ে দিয়ে তার গান শুনে তিনি শিহরিত হতেন। তিনি তন্ময় হয়ে সন্ধ্যার গানই শুনতেন না কেবল, খেয়াল করতেন তার উচ্চারণ। ফরিদা পারভীন বরাবর এ-কথা স্বীকার করেন যে, শুনতে শুনতেই তিনি প্রমিত উচ্চারণ শিখেছেন। সে-কালে তখন ‘আকাশ বাণী কলকাতা’ থেকে সকাল পৌনে নটায় আধুনিক গানের একটা অনুষ্ঠান প্রচার হতো। বালিকা ফরিদা তখন সংগীতের বিষয়ে কিছুই বুঝতেন না। একদিন সকালে রেডিওর নব ঘোরাতে ঘোরাতে ‘আকাশ বাণী’ পেয়ে যান। বড়ো হওয়ার পর জেনেছেন, তার শোনা ‘আকাশ বাণী’র ওই অনুষ্ঠানে আধুনিক গানের সঙ্গে ওস্তাদ আলী হোসাইন সানাই বাজাতেন। অসাধারণ সেই সুর ফরিদা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। সেই বাল্যে এমনও হয়েছে যে, গান শুনতে শুনতে ফরিদা কেঁদে ফেলেছেন। সুর বরাবরই ফরিদাকে আবেগাপ্লুত করে, তার ভেতরে অনুরণন সৃষ্টি করে, তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।

গান গাইতে পারতেন বলে মামা খালারা ফরিদাকে বিশেষ ¯েœহের দৃষ্টিতে দেখতেন। তার বড়ো মামা ছিলেন গান পাগল এক দুর্দান্ত মানুষ। বড়ো মামা প্রায়ই বলতেন, ‘ফরিদা, গান কর তো দেখি।’ অমনি ফরিদা আনন্দের সঙ্গে গান গাইতে শুরু করতেন। ফরিদা নানাবাড়িতে গেলে সন্ধ্যার পর উঠানে পাটি পেতে গানের আসর বসত। ফরিদার গান শুনে বড়ো মামা বলতেন, ‘আমার ফরিদার মতো আর গলা দেখি না। দেখিস রৌফা [ফরিদার মা] আমার ফরিদা যা হবে না !’ মামার ভব্যিষদ্বাণীকে সত্য করে তুলেছেন ফরিদা নিজের শিল্পসাধনা দিয়ে।
শৈশব গৌর নদীর দুই কুলে কটালেও বাবার কর্মসূত্রে ফরিদা পারভীনের স্কুলজীবন কেটেছে বিভিন্ন শহরে। তবে, তার স্কুলজীবনের সূচনা হয়েছিল মাগুরায়। তারপর একে একে কুষ্টিয়া গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল, কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় এবং মেহেরপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে অধ্যয়ন করেন। তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় থেকে। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কুষ্টিয়া গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন এবং একই কলেজ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬-৭৯ সেশনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ ¯œাতক পাশ করেন।
শিক্ষাজীবনের মতো ফরিদা পারভীনের সংগীতেও হতেখড়ি হয় মাগুরায়, ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে। পরবর্তীসময়ে কুষ্টিয়ার ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস এবং ওসমান গণির কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন। ফরিদা পারভীন নজরুলসংগীত শেখেন কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের এবং মেহেরপুরের মীর মোজাফফর আলীর কাছে। তিনি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বেতারে নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
ফরিদা পারভীনের কর্মজীবন সংগীতময়। শুধু লালনের গান নয়, তিনি একাধারে গেয়েছেন আধুনিক এবং দেশাত্মবোধক গানও। স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকাকালীন ফরিদা পারভীনের পরিচয় হয় গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের সঙ্গে। তার কাছ থেকেই ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটির মাধ্যমে শুরু হয় লালন সাঁইয়ের গানের সাথে পথচলা। পরবর্তীসময়ে খোদা বক্স সাঁই, বেহাল সাঁই, ব্রজেন দাস, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁই-এর কাছ থেকেও লালনের গান শেখেন ফরিদা।
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ গানগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি শুধু গানই করেন না, গানকে অনুভব করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন লালনের মানবতাবাদী দর্শন।
ফরিদা পারভীনের গাওয়া দেশের গান ও আধুনিক গানও লালন সাঁইয়ের গানের মতোই সমান জনপ্রিয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাদিবস, বিজয়দিবস, একুশে উদ্যাপনসহ যেকোনো জাতীয়দিবস পালনের সন্ধিক্ষণে দেশের সব প্রচার মাধ্যমে ফরিদা পরভীনের গাওয়া ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে’ গানটি শোনা যায়। আবার আধুনিক গানের প্রসঙ্গ উঠলে এ দেশের মানুষ ফরিদার গাওয়া ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী স্বাদ আছে বলো’, ‘কিশোরী বউ যায়’, ‘ও নদীরে তোর কোনো কি ব্যথার দোসর নাই’, বিধিরে আমায় ছাড়া রঙ্গ করার মানুষ দেখলি না’ গানগুলোর কথা বলেন।
তবে, সব ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে ফরিদা পারভীনের প্রধান পরিচয় লালনের গানের একচ্ছত্র স¤্রাজ্ঞী হিসেবে। তার গায়কির কারণেই লালনের গান বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে পাকাপোক্ত আসন গেঁড়ে বসতে পেরেছে।
ফরিদা পারভীন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করেন। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও তিনি প্রধানত লালনের গানই বেশি গেয়েছেন।
ফরিদা পারভীনের সংগীতজীবন নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে অভিসিক্ত। এর মধ্যে একুশে পদক [১৯৯৩], জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক উল্লেখযোগ্য।
ফরিদা পারভীন শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন, তিনি লালনের গানের একজন সার্থক প্রচারকও। তার গানে যে মানবতাবাদ, আধ্যাত্মিকতা এবং শুদ্ধতা রয়েছে, তা শ্রেণি-পেশা-বয়স নির্বিশেষে সকলের মন ছুঁয়ে যায়। তার সংগীতচর্চা প্রমাণ করে, লোকসংগীত শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, এটি একটি বাণী, একটি দর্শন, যা মানুষের মন ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
উল্লেখ্য, ফরিদা পারভীন বেশ কিছুদন ধরেই শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন। সম্প্রতি শ্বাসকষ্ট ও কিডনির জটিলতা নিয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ নন। আমরা তার দ্রুত আরোগ্য প্রত্যাশা করছি...
প্রকাশিত অ্যালবাম
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ‘অচিন পাখি’ নামে ফরিদা পারভীনের একটি লংপ্লে রেকর্ড বের হয়। তার অন্যান্য অ্যালবামের মধ্যে লালনগীতি [ডন], লালনের গান [সারগাম], দেশাত্মবোধক/আধুনিক/লালন মিলে একটি ক্যাসেট [দোয়েল প্রডাক্ট], আমারে কি রাখবেন গুরু চরণে [আরশিনগর], সময় গেলে সাধন হবে না [বেঙ্গল ফাউন্ডেশন]