এমিরেটস্ এর উড়োজাহাজ যখন আকাশে উড়লো বাংলাদেশে তখন গভীর রাত। যাচ্ছি পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপ দেশ সেশেল্স্যে-টি আফ্রিকার দেশ কেনিয়া ও সোমালিয়ার সমূদ্রসীমা থেকে প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ মাইল পূর্বে এবং মাদাগাস্কার এর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। আমরা তিনজন ট্যুর অপারেটর যাচ্ছি সেশেল্স্ ট্যুরিজম বিভাগের আমন্ত্রণে, সে দেশের পরিচিতিমূলক ভ্রমণে [Familiarization Tour] অর্থাৎ ওঁরা আমাদের ওঁদের দেশ ঘুরিয়ে দেখাবে-যাতে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের দেশের পর্যটকদেরও সেশেল্স্ ভ্রমণের আয়োজন করতে পারি। এটি পৃথিবীর পর্যটনে সমৃদ্ধ সব দেশই বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করে থাকে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে কম অর্থে সেশেল্স্ যাওয়া যাচ্ছে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে। ঢাকা থেকে মুম্বাই ট্রানজিট হয়ে পরে সেশেল্স্-এর মাহে দ্বীপের ভিক্টোরিয়ায়। ভিক্টোরিয়া আবার সেশেল্স্-এর রাজধানী। আমরা যাচ্ছি এমিরেটস্ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে। দুবাইয়ে ৩ ঘণ্টার ট্রানজিট শেষে এবার আমাদের যাত্রা সেশেল্স্রে মাহে আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে। বিমান অবতরণের মুহূর্তে জানালা দিয়ে নিচে চোখ যেতেই এক অপূর্ব দৃশ্য নজরে এলো। চারদিকে ঘাঢ় নীল জলরাশির মাঝে একটুকরো সবুজ ভূমি। মনে হচ্ছিল উড়োজাহাজ বোধহয় সমুদ্রেই অবতরণ করবে- এত ছোটো এয়ারপোর্ট। উড়োজাহাজ অবতরণ করে টার্মিনাল পর্যন্ত যেতে পুরো এয়ারপোর্ট একচক্কর দিয়ে এলো। পাশেই সুবিশাল ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি। জানালা দিয়ে দেখতে অপূর্ব লাগছিল। উড়োজাহাজ থামতেই নিচে নেমে তো আরও অবাক হলাম। এ যে আমাদের যশোর কিংবা সৈয়দপুর বা বরিশালের এয়ারপোর্টের মতোই ছোটো। কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে আমাদের সামনে আর পেছনে শুধুই সাদা চামড়ার বিদেশি পর্যটকরা। কালেভদ্রে দু-একজনের তামাটে বর্ণের আমাদের স্বজাতীয়দের দেখা যাচ্ছে। ইমিগ্রেশনের একজন আমাদের দলের একজনকে জিজ্ঞেস করলো আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি কি না। প্রথমে একটু ভয় পেলেও বাংলাদেশ বলাতে ইমিগ্রেশনের লাইন ভেঙে আমাদের খালি একটা লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলো। সাদা চামড়ার লোকগুলো তখন তীর্যক ভঙ্গিতে আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে। পরক্ষণেই মনে হলো, আরে আমরাতো সেশেল্স্ পর্যটন বিভাগের অতিথি। এসেছি ওদেরই আমন্ত্রণে। সুতরাং আমাদের তো ভিআইপি সেবাই প্রাপ্য। যথারীতি ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ সংগ্রহ করে বাইরে আসতেই দেখলাম আমাদের নাম সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা। উনি পর্যটন বিভাগের একজন অফিসার। এসেছেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে।

যথারীতি এবার যাত্রা মাহে দ্বীপে আমাদের জন্যে নির্ধারিত বারজায়া ব্যু ভেলন বে হোটেল। তিন তারকা মানের হোটেল হলেও বিশাল এলাকাজুড়ে এই হোটেলটি অবস্থিত। একটা পার্কের ভেতর দিয়ে যেতে হয় ওখানে। নিচে রিসেপশন আর পেছনেই বিশাল রেস্তোরাঁ। প্রথম দু’রাত এখানেই আমাদের হবে রাত্রিযাপন। দুপুরের খাবারের পর ওরা আমাদের নিয়ে যাবে তিনটি হোটেল পরিদর্শনে। এই জাতীয় পরিচিতিমূলক ভ্রমণে হোটেল পরিদর্শন হচ্ছে প্রধান ধাপ- কারণ, ওই হোটেলগুলোই বিনে পয়সায় পর্যটকদের থাকতে দেয়। স্টোরি সেশেল্স্, কোরাল ষ্ট্র্যান্ড হোটেল, লাকজ ক্রেউল আর সেভয় রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা পরিদর্শন করতে করতেই সন্ধে হয়ে গেল। আজ রাতের ডিনার হবে আমাদের হোটেলেই। যে যার মতো অর্ডার দিয়ে রাতের খাবার শেষে লম্বা ঘুম। শরীরে তখন প্রচুর ক্লান্তি।
পরদিন ব্রেকফাস্ট শেষে আমাদের নেওয়া হলো ইডেন ম্যারিনায় যেটি একটি জেটি। এখান থেকেই ছোটো-বড়ো বোটগুলো পর্যটকদের নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা করে। যাত্রাপথে পর্যটকদের র্স্নোক্িলং-এর জন্যে মাঝ সমুদ্রে থামা। প্রয়োজনীয় পোশাক আর যন্ত্রপাতি নিয়ে ১৬-২০ জনের পর্যটক দলের সমুদ্রে সে কি ঝাঁপাঝাঁপি। বাংলাদেশিরাও বাদ যায়নি এ আনন্দ থেকে। এরপর আমাদের নেওয়া হয় একটু দূরে মোয়েন দ্বীপে- যেটি বিখ্যাত পৃথিবীর বড়ো বড়ো টরটয়েস বা কাছিমের জন্যে। সারাদ্বীপজুড়ে কয়েক শ’ ছোটো-বড়ো কাছিম বাবারা আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা ল্যান্ড বেস্ড্ টরটোয়েস অর্থাৎ জলের চেয়ে ভূমিই এদের মূল বিচরণকেন্দ্র। আমাদের জন্যে নির্ধারিত গাইড বর্ণনা করছিলেন, প্রায় সব কাছিমেরই বয়স ১০০ থেকে ২০০ বছর। সাড়ে আটশত বছরেরও এক কচ্ছপের সন্ধান পাওয়া গেছে এখানে। গাইড বললো, এগুলো একদম নিরাপদ এবং নিরীহ প্রাণী। কাছে গেলেও কোনো ভয় নেই। সবাই ওদের কলা ছিলে খাওয়াচ্ছে। আর সাথে সাথে তো ছবি তোলা আছেই। পাশেই আমাদের জন্যে বার বি কিউ-এর ব্যবস্থা। এখানে সব কিছুই পরিপাটি আর গোছানো। পর্যটন শিল্প যেহেতু এদের প্রধানতম বৈদেশিক মুদ্রাখাত, তাই পর্যটকদের প্রতি ওরা খুবই শ্রদ্ধাশীল। সর্বত্র এর ছাপ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোনো কিছুর কমতি নেই। সারাদিনের ভ্রমণশেষে এবার আবারও নৌপথে আমাদের যাত্রা বারজায়া হোটেলে।
এদিন আমরা ছেড়ে যাচ্ছি মাহে দ্বীপ। গন্তব্য প্রালিন দ্বীপ। অনেকে একে বলে প্রাসলিন কিন্তু আসল উচ্চারণ প্রালিন। ব্যাগ গুছিয়ে আবারও যাত্রা ফেরি ঘাটে। আমরা এবার যাবো সমুদ্র পথে ফেরিযোগে। ঘাটের নাম ক্যাট কোকোস ফেরি জেটি। নির্ধারিত টিকেট আর লাগেজ জমা দিয়ে উঠে পড়লাম দোতলায় আমাদের সিটে। ফ্রি সিট- যে যেখানে খুশি বসতে পারে। অবশ্য নিচে এয়ার কন্ডিশন্ড কক্ষও রয়েছে। ফেরিতে লাগবে প্রায় একঘণ্টা। ফেরি ছাড়ার সময় ভালোই লাগছিল, কিন্তু মাঝ সমুদ্রে যেতেই প্রচুর রোলিং শুরু হলো। ওদিকে দু-তিন জন দাঁড়িয়ে আছে, হাতে পলিথিন ব্যাগ নিয়ে। এক্ষণে বোঝা গেল এর কারণ। অনেকেই রোলিং-এর কারণে বমি করছে। আর তাই ওরা পলিথিন সরবরাহ করছে। আমাদের অবস্থাও বেশি ভালো না। সঙ্গে থাকা দু’জন পাকিস্তানি নারী -যারাও আমাদের টিমের অংশ-তাদের অবস্থা কাহিল। যাহোক, প্রায় ঘন্টাখানেক ফেরি যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম প্রালিন দ্বীপে। এখানকার গাইড আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। ও গাইড কাম ড্রাইভার। আমরা যাবো ভ্যালি ডি মাই নামক একটা ন্যাচার রিজার্ভ এ যেটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। এটি বিখ্যাত কোকো ডি মার-যা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নাট-বাংলায় বাদাম। এটি উৎপন্ন হয় আদি পাম জাতীয় গাছে। এ রকম প্রায় ছয়টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালির সন্ধান মেলে এখানে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র বিপন্ন প্রায় ব্ল্যাক পেরোট বা কালো টিয়ার সন্ধান মেলে এখানে। আমাদের গাইড জানালো, যদি তোমাদের ভাগ্য ভালো হয়, তবেই ওগুলো দেখতে পারো। আর তক্ষুনি আমাদের ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করে দেখা দিলো ব্ল্যাক পেরোট। আমাদের আনন্দ আর ধরে না। ওখানেই দেখা হলো বাংলাদেশি আলাউদ্দিনের সাথে। আলাউদ্দিন ঢাকার প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যটন ও হোটেল ম্যানেজমেন্টে পাশ করে ২০১৭ সালে সেশেল্স্-এ আসে। আট বছর পর এখন সে এই রেস্তোরাঁর ম্যানেজার। তার নিচে কাজ করছে আরও ১৪-১৬ জন। আলাউদ্দিন ওঁর মালিকের সাথেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলো। মালিকের কন্ঠে তখন আলাউদ্দিন আর বাংলাদেশের প্রশংসা। শুনেই বুকটা আনন্দে আর গর্বে ভরে উঠলো। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভালো থাকুক আমাদের বাংলাদেশি ভাই-বোনেরা। তুলে ধরুক বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর আতিথেয়তা। এরপর আমাদের নেওয়া হলো প্রালিনের আরও একটি সুন্দর আনসি লাজিও সমুদ্র সৈকতে। হলিউড-এর নামকরা সব নায়ক-নায়িকা আর ফুটবলারদের নিয়মিত বিচরণ এখানে। একা নির্জন সময় কাটাতে ওঁরা বেঁছে নেন সেশেল্স্-এর এই সব সমুদ্র সৈকত। শেষে লা ডুক ডি প্রালিন রিসোর্টে চেকইন ও রাত্রি যাপন। পরদিন আবার গেলাম কিউরিয়াস দ্বীপে। এখানেও সন্ধান মিললো প্রচুর টরটোয়েস-এর। গাইডের কাছ থেকে জানা গেলো এই টরটোয়েস হচ্ছে সিশেল্স্-এর জাতীয় প্রাণী। এরপর আমাদের যাত্রা হলো লা ডিগ দ্বীপ- যেটিও ফেরিযোগে যেতে হবে। জেটির নাম অ্যারো জেটি। তবে এবারের যাত্রার সময় কম। এখানেও নতুন গাইড আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। এই দ্বীপটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনার জন্যে প্রসিদ্ধ। সেশেল্স্-এর অফিসিয়াল ভাষা হচ্ছে ক্রোয়েল। এখানে নারিকেল দিয়ে রান্না, ক্রেয়েল রান্না, ফোক মিউজিক, স্থানীয় ক্রাফট- সবই অনন্য অভিজ্ঞতা। এখানে গ্রামের ভেতর একটি স্থানীয় অধিবাসীর বাড়িতে আমাদের নেওয়া হলো ঐতিহ্যবাহী ক্রোয়েল রান্নার প্রদর্শনী দেখাতে। আমাদের সাথে থাকা সবাই এবার প্রধান শেফকে রান্নায় সহযোগিতা করছি। পরে সবাই একসঙ্গে ওই রান্না করা খাবার ভক্ষণ-এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যে।

পরদিন আবার ফেরিযোগে আমাদের যাত্রা মাহে দ্বীপে-সেখান থেকে সেশেল্স্-এর রাজধানী ভিক্টোরিয়ায়। এখানে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, রোমান ক্যাথলিক ক্যাথাড্রেল এবং রাস্তার মোড়ে কøক টাওয়ার দেখানো হলো আমাদের। শেষে আমাদের নেওয়া হলো টাকামাকা রাম ডিসটিলারিতে যেখানে তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর বিখ্যাত বিভিন্ন প্রজাতির রাম এবং তা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
ভারত মহাসাগরের বুকে ছোটো এই দ্বীপ দেশটি বর্তমানে পুরোটাই পর্যটন নির্ভর। আসা-যাওয়ার দিনে দলে দলে সাদা চামড়ার পর্যটকদের দেখেই তা বুঝেছি। তবে, একটি তথ্য জানাতেই হয়, আর তা হলো, দ্বীপ দেশটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একশত ডলারের নিচে কোথাও কোনো হোটেল বা রিসোর্ট পাওয়া যাবেই না। বাংলাদেশিদের জন্যে ই-ভিসার সুব্যবস্থা আছে। তবে, অবশ্যই কোনো রেজিস্টার্ড ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে হোটেল, সাইট-সিয়িং আর ট্রান্সপোর্ট বুকিং দিয়ে তবেই ই-ভিসার জন্যে আবেদন করতে হবে। যারা অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও একটা নতুন দেশ, সংস্কৃতি আর নতুনত্বের স্বাদ নিতে চান -তাদের জন্যে প্রথম পছন্দ হতে পারে ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট কিন্তু সমুদ্রের বুকে এক টুকরো স্বর্গ-সেশেল্স্।