জানিতা আহমেদ ঝিলিক স্বপ্নজয়ী এক কণ্ঠশিল্পীর গল্প

20 Apr 2026, 03:19 PM সারেগারে শেয়ার:
জানিতা আহমেদ ঝিলিক স্বপ্নজয়ী এক কণ্ঠশিল্পীর গল্প

সংগীতজগতে এমন কিছু কণ্ঠশিল্পী আছেন, যাদের গান শুনলেই মনে হয় যেন খুব চেনা এবং হৃদয়ের গহিনে এক গভীর মায়ার উদ্রেক করে। জানিতা আহমেদ ঝিলিক ঠিক তেমনই একজন শিল্পী। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ’ প্রতিযোগিতার মুকুট জয় করার পর থেকে গত দেড় দশকে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সুকণ্ঠী গায়িকা হিসেবে। ক্লাসিক্যাল, রবীন্দ্র, নজরুল থেকে শুরু করে আধুনিক এবং ফোকÑ সব ধরনের গানেই তার অবাধ বিচরণ তাকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। অসাধারণ কণ্ঠশৈলী আর স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই শিল্পীর সংগীতজীবন এবং যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে এবারের আনন্দভুবনের সারেগারের বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


বর্তমান ব্যস্ততা : নববর্ষের ধামাকা ও নতুন গান

বর্তমানে ঝিলিক মৌলিক গান, টিভি লাইভ অনুষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশের স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে, এবারের পয়লা বৈশাখ নিয়ে তার বিশেষ উত্তেজনা কাজ করছে। বৈশাখের খুবই জনপ্রিয় একটি গান ‘বাজেরে বাজে ঢোল আর ঢাক’ প্রায় ১৮ বছর আগে শওকত আলী ইমনের সুর ও সংগীতে গেয়েছিলেন ‘ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সোনিয়া’। বহু বছর পর আবারও সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমনের সুর ও সংগীতে নতুন আঙ্গিকে বাজারে আসছে জনপ্রিয় এই পুরনো গানটি। গানটির মিউজিক ভিডিওতে ঝিলিকের সাথে কণ্ঠ দিয়েছেন লুইপা, কর্ণিয়া, আতিয়া আনিসা ও ইমন নিজে। কবির বকুলের লেখা এই গানটি নিয়ে ঝিলিক বেশ উচ্ছ্বসিত এবং আশাবাদী। গানচিল মিউজিক থেকে প্রকাশিতব্য এই গানটির ভিডিও পরিচালনা করেছেন চন্দন রায় চৌধুরী।


সংগীতের আঙিনায় হাতেখড়ি : বাবার হাত ধরে পথচলা

ঝিলিকের সংগীতের শুরু একদম শৈশব থেকে। তার ভাষায়, ‘আমি সংগীতের পরিবেশেই বড়ো হয়েছি।’ তার বাবা আব্দুল জলিল নিজেই একজন উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী। ফলে বাড়িতে সবসময়ই চলত সুরের খেলা। মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে যখন অন্য শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত, ঝিলিক তখন প্রথাগতভাবে তালিম নিতে শুরু করেন।

বাবার কাছে প্রথম হাতেখড়ি হওয়ার পর তিনি শিক্ষা নিয়েছেন ওস্তাদ বাসন্তী গোমেজ এবং মনিন্দ্রনাথ রায়ের কাছে। পরবর্তীসময়ে প্রয়াত বরেণ্য শিল্পী সুবীর নন্দীর কাছেও গান শেখার বিরল সুযোগ হয়েছে তার। ছোলেবেলা থেকেই গান ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। নতুন কুঁড়ি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। আজও ঝিলিক মনে করেন, তার বাবার নির্দেশনাই তার সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি।

সেরাকণ্ঠের মঞ্চ : খ্যাতিমানদের দেখার রোমাঞ্চ

২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ’ ঝিলিকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে, মজার ব্যাপার হলো, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি সেখানে যাননি। ঝিলিক বলেন, ‘আমার অংশগ্রহণের প্রধান কারণ ছিল রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমীন ম্যাম। এই দুই মহান শিল্পীকে একসঙ্গে সামনাসামনি দেখব- এটাই ছিল আমার কাছে বড়ো পাওয়া।’

প্রতিযোগিতার ধাপগুলো পার হতে হতে যখন তিনি ‘টপ সিক্স’-এ জায়গা করে নেন, তখন বুঝতে পারেন গান নিয়ে সিরিয়াস কিছু করার সময় এসেছে। তার পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি শেষ পর্যন্ত সেই কাক্সিক্ষত ‘সেরাকন্ঠ’র মুকুটটি ঝিলিকের মাথায়ই ওঠে। সেই মুহূর্তের স্মৃতি আজও তার কাছে অমলিন। দুই নক্ষত্রের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে শুরু হয় তার পেশাদার সংগীতযাত্রা।


প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসেব : অল্পতেই তুষ্ট

দীর্ঘ ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগীতে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন ঝিলিক। সফলতার পাল্লা ভারি হলেও ব্যর্থতাকে তিনি কখনোই মনে স্থান দেননি। ঝিলিকের মতে, ‘আমি ব্যর্থতাকে কাউন্ট করি না কারণ আমি খুব অল্পতেই সুখী থাকা মানুষ। আমার কোনো আকাশচুম্বী চাহিদা নেই।’

তার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হলো দর্শক-শ্রোতাদের ভালোবাসা এবং সিনিয়র শিল্পীদের প্রশংসা। বিশেষ করে সেরাকণ্ঠের সেই ‘গোল্ডেন বেইজড’ রাউন্ডে গাওয়া গানগুলোর স্মৃতি তাকে আজও আবেগী করে তোলে। তার প্রিয় শিল্পীর তালিকা বেশ লম্বা হলেও রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন এবং কনকচাঁপার গান তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে।


অবসরের সঙ্গী : পরিবার, বন্ধু ও সমুদ্র

গানের বাইরে ঝিলিক একজন দারুণ আড্ডাপ্রিয় মানুষ। তবে, সেই আড্ডার পরিধি কেবল পরিবার এবং কাছের বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভ্রমণপিপাসু এই শিল্পী গানের সুবাদে দেশের প্রায় সব জায়গায় ঘুরেছেন। তবে তার হৃদয়ের কাছাকাছি হলো সমুদ্র। সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে যান কক্সবাজার। পাহাড়ি সৌন্দর্য সিলেটও তার পছন্দের তালিকার উপরের দিকে।


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : শুদ্ধ সংগীতের সাধনা

পরিকল্পনা করে কাজ করা ঝিলিকের স্বভাব নয়। তিনি বিশ্বাস করেন বর্তমানের ওপর। তিনি বলেন, ‘আমি কালকে কী করব তা আজই ঠিক করি। বড়ো বড়ো পরিকল্পনা করা কঠিন। কারণ, সময় কখন বদলে যায় তা কেউ জানে না।’ তবে, তার একটি স্বপ্ন সবসময়ই ছিল এবং থাকবে- শুদ্ধ সংগীতের সাথে থাকা। এমন কিছু গান করে যেতে চান, যার মাধ্যমে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও সংগীতপ্রেমীরা তাকে পরম শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে।

ঝিলিকের এই সাবলীল পথচলা আরো দীর্ঘ হোক, তার কণ্ঠের জাদুতে সমৃদ্ধ হোক বাংলা সংগীত ভান্ডার- সারেগারের পক্ষ থেকে সেই শুভকামনা নিরন্তর।