বাঙালির চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ : ইকবাল খোরশেদ

20 Apr 2026, 03:23 PM প্রবন্ধ শেয়ার:
বাঙালির চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ : ইকবাল খোরশেদ

‘উৎসব’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে আনন্দের একটা হিল্লোল খেলে যায়। সেটা হওয়ারই কথা ; কেননা, শব্দ তো তার ভাবার্থেরই চিত্ররূপ। বাংলা ভাষার অভিধানগুলোতে উৎসব অর্থ : ‘আনন্দজনক অনুষ্ঠান’। তবে সে-আনন্দের স্বরূপ কী, কেমন তার ব্যাপ্তি বা অভিলাষ- অভিধানে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তাই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আঙিনায় সীমিত আকারের আনন্দ-অনুষ্ঠান যেমন উৎসব বলে অভিহিত, তেমনি সমাজের আর দশজনকে নিয়ে পালিত অনুষ্ঠানও উৎসবের মর্যাদায় আসীন। আর সে-কারণেই বুঝি বিয়ের উৎসব আর নববর্ষের উৎসবÑ উভয় উপলক্ষ্যেই আমাদের মন একইরকমভাবে আন্দোলিত হয়।

উৎসব নানা ধরনের, নানা উপলক্ষ্যের, নানা আকৃতি-প্রকৃতির হয়ে থাকে। ব্যক্তি ও পারিবারিক আয়োজনের বাইরে সর্বজনীন উৎসব একই উপলক্ষ্যে একইসময়ে একাধিক স্থানে, সমাজে বা সম্প্রদায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেমন খ্রিষ্টীয় নববর্ষের উৎসব- যা এখন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ; তবে, এমন অনুষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি, যা কেবল বিশেষ কোনো স্থানের কিছু মানুষের বা বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের। সাধারণভাবে ব্যাপক অর্থে তাই বলা যায় : সাধারণের বা বহুজনের অংশগ্রহণে নির্দিষ্ট দিন, সময় বা ঋতুতে এক বা একাধিক স্থান বা বিশেষ কোনো সমাজে কিংবা সম্প্রদায়ে অনুষ্ঠিত আনন্দজনক কাজ-কর্মই উৎসব বলে অভিহিত ও পরিচিত। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা বাংলার ঐতিহ্যবাহী চৈত্রসংক্রান্তি, পুণ্যাহ ও বর্ষবরণ-উৎসব নিয়ে অলোচনা করবো।


বঙ্গাব্দ যেমন করে এলো

বঙ্গাব্দের দিনপঞ্জিমতে মাস গণনার শেষ দিনটিকে ‘সংক্রান্তি’ বলা হয়। তাই চৈত্র মাসের শেষ দিনটি হলো চৈত্রসংক্রান্তি’ বঙ্গাব্দের শেষ মাস হলো চৈত্র। চৈত্রের শেষ দিনকে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ বলে। লোকাচার অনুযায়ী এ দিনে বর্ষ-বিদায়-উৎসব পালন করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তির মধ্যে দিয়ে কালের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে যায় একটি বঙ্গাব্দ। আদি গ্রন্থ পুরাণমতে, রাজা প্রজাপতি দক্ষের সুন্দরীকন্যাদের নামানুসারে সাতাশটি নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়। লোককথা অনুযায়ী, প্রবাদতুল্য সুন্দরী এই কন্যাদের বিয়ে দেওয়ার চিন্তায় উৎকণ্ঠিত ছিলেন রাজা দক্ষ। যোগ্যপাত্র পাওয়া না গেলে অনূঢ়া থেকে যাবেন তারা। অবশেষে বিধির বিধানে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যায়- বর স্বয়ং চন্দ্রদেব। মহাধুমধামের সাথে চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিয়ে হয় দক্ষের সাতাশ কন্যার। দক্ষের এককন্যা চিত্রার নামানুসারে চিত্রানক্ষত্র এবং চিত্রানক্ষত্র থেকে বঙ্গাব্দের শেষ মাস চৈত্রের নামকরণ করা হয়। রাজা দক্ষের আরেক অনন্য সুন্দরী কন্যা বিশাখার নামানুসারে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র এবং ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামানুসারে বৈশাখ মাসের নামকরণ করা হয়।

প্রসঙ্গত, বৈদিক যুগে বাংলা সন বলে কিছু ছিল না, ছিল সৌরমতে বৎসর গণনার পদ্ধতি। সৌর সনেও বৈশাখ ছিল, তবে তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় মাস হিসেবে। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের মতে বৈশাখের অবস্থান ছিল বছরের মাঝামাঝি জায়গায়। অন্যদিকে ব্রহ্মা- পুরাণের একটি স্লোকে বৈশাখ মাসের অবস্থান চতুর্থ বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

মোঘল শাসনামলে হিজরি সনের ভিত্তিতে বছর গণনা করা হতো। বাংলার কৃষিউৎপাদন ঋতু বদলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে হিজরি সন অনুসারে দিন গণনা করা হলে কৃষকদের ফসলি সন গণনায় সমস্যা হয়। অন্যদিকে কৃষকের কাছ থেকে জমিদারদের খাজনা আদায়েও সমস্যা দেখা দেয়। কৃষক ও জমিদারের সমস্যা দূর করতেই মূলত বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন সম্রাট আকবর। আকবর ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। সিংহাসনে আরোহণের ২৮ বছর পর সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ১০-১১ তারিখে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

আকবর তার রাজসভার নবরতেœর বাইরে দশমরতœ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে বাংলা সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজীর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ষ গণনার রীতি সৌর ও চন্দ্র বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত করেন। তিনি একটি কেন্দ্রীয় ইরানি সনের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের ঋতু ও কৃষিউৎপাদনের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রজাদের খাজনা দেওয়ার সুবিধার্থে নানা আঞ্চলিক সনের কাঠামো নির্দেশ করেন। সেই কাঠামোসূত্র অবলম্বনেই ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন চালু হয়। সে-কালের ভারতবর্ষে প্রবর্তিত অন্যান্য ফসলি সনের মধ্যে আমনি সন, বিলায়েতি সন, সুরাসানি সন উল্লেখযোগ্য। আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল রচিত ‘আইন-ই-আকবরি’ থেকে জানা যায়, সম্রাট এমন একটি ত্রুটিমুক্ত এবং বিজ্ঞানসম্মত সৌরসনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই আদর্শ হবে। বাংলা সনের মধ্যে তার সে-আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়েছিল। বাংলা সন একেবারে স্বকীয়। প্রথম দিকে ফসলি সন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও পরবর্তীকালে নতুন এই সনটি বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায়। বাংলা সনে মাসের নামগুলো সৌরমতে রেখেই পুনর্বিন্যাস করেন আমির সিরাজী। সে অনুযায়ী বৈশাখ বাংলা সনের প্রথমে চলে আসে। আর শেষ মাসের অবস্থানে আসে চৈত্র।

সে-কালে বাংলা অঞ্চলে ২৪টির মতো সন চালু ছিল। সে-সব সন ছিল রাজা-বাদশাহ, ধর্ম বা সীমিত অঞ্চলের কিন্তু বাংলা সন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের নামে। আকবরের শাসনামল [১৫৫৬-১৬০৫] থেকেই বাংলায় নববর্ষ পালনের সূচনা। সে-সময় বাংলার কৃষকেরা চৈত্রমাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং ভূস্বামীর খাজনা প্রদান করতেন। পরদিন অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম দিন ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ-উপলক্ষ্যে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিকজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পয়লা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালনের রীতি চালু হয়ে।

চৈত্রসংক্রান্তি

‘চিত্রা নক্ষত্র হইতে চৈত্র হইল নাম।

বসন্ত বিদায় নিল, বর্ষশেষ যামÑ

চড়কের উৎসব, গাজনের গান।

সেইসঙ্গে বর্ষ হইল অবসান।’

চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম আকর্ষণ গাজন। গাজন একটি লোকউৎসব। চৈত্রসংক্রান্তি থেকে শুরু করে আষাঢ়ী পূর্ণিমা পর্যন্ত সংক্রান্তি কিংবা পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব উদ্যাপিত হয়। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিভিন্ন পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতাদের নাম। যেমন শিবের গাজন, নীলের গাজন ইত্যাদি।

এ উৎসবের মূল লক্ষ্য সূর্য এবং তার পতœীরূপে কল্পিত পৃথিবীর বিবাহ দেওয়া। গাজন উৎসবের পেছনে কৃষকসমাজের একটি সনাতনী বিশ্বাস কাজ করে। চৈত্র থেকে বর্ষা শুরু হওয়া পর্যন্ত যখন সূর্যের তেজ খুব প্রখর থাকে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও বৃষ্টির আশায় কৃষিজীবীসমাজ বহু অতীতে এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করেছিল।

চৈত্র সংক্রান্তির মূল উৎসব চড়ক। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এই উপলক্ষ্যে একগ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে।

এ সময়ে শিব সম্পর্কে নানারকম লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়, যাতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকাজ এ সব বিষয়ের উল্লেখ থাকে। চড়কে মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি সব ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য শারীরীক কলাকৌশল দেখানো হয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের খেলা এখন একেবারেই কমে গেছে।


শাকান্ন-উৎসব

চৈত্রসংক্রান্তির দিনে গ্রাম-বাংলার বউ-ঝিয়েরা ঝোপ-জঙ্গল থেকে প্রথা মেনে ১৪ রকমের শাক তুলে আনতেন। সেই শাক একসঙ্গে রেঁধে এই দিনে খাওয়া হতো। এখনো কোথাও কোথাও এর প্রচলন রয়েছে। এই রীতি ‘শাকান্ন উৎসব’ নামে পরিচিত। চৈত্রসংক্রান্তির দিন নিরামিষ খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এই দিন বাড়িতে মাছ-মাংসের প্রবেশ নিষেধ। গ্রাম-বাংলায় গমের ছাতু খাওয়ার রীতি রয়েছে। দই, পাকা বেল, মুড়ি, চিড়ে, ছাতু, কলা ইত্যাদি মেখে ফলার খাওয়ার প্রচলন বহুকাল থেকেই বর্তমান। গ্রামবাংলায় চৈত্রসংক্রান্তির আরও এক বিশেষ উৎসব তালতলার শিরনি। এই দিনে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে চাল-তালের গুড়, দুধ সংগ্রহ করা হয়। যে বাড়িতে এগুলো থাকে না, তারা অর্থ দান করেন। এরপর গ্রামের কোনো পবিত্র তালগাছের নিচে এই জিনিসগুলো দিয়ে তৈরি হয় শিরনি। যা তালতলার শিরনি নামে পরিচিত।


চৈত্রসংক্রান্তিমেলা

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে অনেক জায়গায় মেলা বসে। পশ্চিসবঙ্গের প্রায় সর্বত্র এবং বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে যুগ-যুগ ধরে এই মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। এতে বাঁশ, বেত, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও খেলনা, নানা রকম ফল-ফলাদি ও মিষ্টান্ন বেচা-কেনা হয় এবং বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। অঞ্চলভেদে ৩-৪ দিন ধরে এই মেলা চলে। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখীমেলা নামে এই মেলার আয়োজন করা হয়।

অতীতে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা উপলক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থেরা নাতি-নাতনিসহ মেয়েজামাইকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আসত। সম্পন্ন গৃহস্থেরা পরিবারের সকলকে নতুন জামাকাপড় উপহার দিত এবং উন্নতমানের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করত। মেলার কয়েকদিন এভাবে তারা সকলে মিলে আনন্দ উপভোগ করত। বর্তমানে নাগরিক সভ্যতার প্রভাবে আবহমান গ্রামবাংলার সেই আনন্দমুখর পরিবেশ আর আগের মতো নেই, অনেকটাই বদলে গেছে।


পুণ্যাহউৎসব

স¤্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন প্রচলনের পর থেকে বাংলায় পুণ্যাহউৎসব পালন করা হতো। নববর্ষের শুরুতে গ্রামবাংলার প্রজাসাধারণ জমিদারকে এবং জমিদারেরা সরকারকে খাজনা দিত। এই খাজনা বা রাজস্ব আদায় উপলক্ষ্যে যে-উৎসব হতো তাকে পুণ্যাহউৎসব বলা হতো। পুণ্যাহ বাংলার রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত বার্ষিক বন্দোবস্তের একটি উৎসব। পুণ্যাহ রাজস্ব আদায় ও বন্দোবস্তকেন্দ্রিক উৎসব হলেও এটি মূলত কৃষি এবং কৃষকের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। রাজস্ব বন্দোবস্ত ও আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে পুণ্যাহ ছিল মোঘলযুগের ব্যবস্থা। এ-ব্যবস্থায় বছরের একটি দিন সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। এ-অনুষ্ঠানে বিগত বছরের রাজস্ব পরিশোধ করা হতো এবং নতুনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। এ-উপলক্ষ্যে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন এবং যে-সব ব্যক্তি তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারতেন তাদের তিনি সম্মানসূচক ‘খিলাত’ বা পোশাক পরিয়ে দিতেন। একইভাবে জমিদার ও অন্যান্য ভূস্বামীরাও তাদের রায়ত বা প্রজাবর্গকে নিয়ে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান পালন করতেন। বলাই বাহুল্য যে, ভূস্বামীদের রায়ত বা প্রজারা ছিলেন বাংলার কৃষক। রায়তগণ বিগত বছরের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতেন এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। আর এই আনুষ্ঠানিকতাই হলো ‘পুণ্যাহ’। পুণ্যাহউৎসবে রায়তগণ জমিদারের কাছারিতে একত্র হতেন এবং জমিদার অথবা তার নায়েবের কাছ থেকে পান-সুপারি গ্রহণ করতেন।

মোঘল আমলে পুণ্যাহ’র নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ছিল না। একেক বছর একেক তারিখে অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তীকালে পুণ্যাহ’র তারিখ প্রধান ফসল তোলার সময়ে সাধারণভাবে নির্ধারিত হলো। এ-বিষয়ে মুর্শিদকুলী খান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার দিউয়ান ও সুবাহদার ছিলেন। তিনি বাংলা সনের শেষ অর্থাৎ চৈত্রমাসে ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর ‘পুণ্যাহ’উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল উৎপাদন কম হলে পুণ্যাহউৎসবেই রাজস্ব মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সে-কালে ‘পুণ্যাহ’ বলতে সমস্ত রাজস্বের আদায় বোঝাত না। অনাদায়কৃত রাজস্ব মওকুফ বা ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত করা বোঝাত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে রায়তগণ বকেয়া রাজস্ব মওকুফ পেতেন। অধিকন্তু, চাষাবাদের জন্য তাদের ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হতো। এই ঋণ ‘তাকাবি’ নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগে পুণ্যাহ বাংলা নববর্ষের সমার্থক হয়ে ওঠে এবং প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নিয়মিতভাবে তা উদ্যাপন শুরু হয়। এ-উপলক্ষ্যে গ্রামীণ মেলা, নাচগান, যাত্রা, গবাদি পশুর দৌড়, মোরগ-লড়াইসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। জমিদারিব্যবস্থা বিলুপ্তির পর পুণ্যাহউৎসবের বিলুপ্তি ঘটলেও বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন বন্ধ হয়নি, বরং দিনে দিনে তা আরো বেগবান হয়েছে।


বর্ষবরণ-উৎসব

পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দিনটি নববর্ষ হিসেবে পালন করা হয়। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব। এ দিন আনন্দঘন পরিবেশে বর্ষবরণ করা হয়। বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ বা বছরের প্রথম দিন হলো কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় নববর্ষ উদ্যাপন করা হয়। লোকবাংলায় নববর্ষ ছিল মূলত কৃষিউৎসব। এ উৎসবের মূলে কৃষক ও কৃষি। এ উৎসব ‘আমানিউৎসব’ নামে অভিহিত। আমানিউৎসবের লক্ষ্য ছিল কল্যাণ ও পারিবারিক কৃষির সমৃদ্ধি কামনা। এ-পারিবারিক উৎসবের আচার সম্পন্ন করতেন বাড়ির কর্ত্রী। সারাবছরের শান্তি-সুখ-সমৃদ্ধি এবং উৎকৃষ্ট ফসল ফলানোর আশা-আকাক্সক্ষায় পালন করা হতো এ কৃষিউৎসব। এ উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামবাংলার কৃষক-পরিবারে চৈত্রসংক্রান্তির রাতে গৃহিণীরা ‘আমানি’ প্রস্তুত করতেন। একটি বড়ো মাটির হাঁড়িতে বেশি পরিমাণ পানির মধ্যে আতপচাল আর কাঁচা আম ভেজানো হতো এবং ওই হাঁড়িতে কচিপাতার একটি আমগাছের ডাল রাখা হতো। নতুন বছরের প্রথম ভোরে গৃহিণী বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে তুলে রাতে ভেজানো চাল খেতে দিতেন এবং সবার গায়ে আমের ডাল দিয়ে ওই হাঁড়ির জলের ছিটা দিতেন। চালভেজানো হাঁড়ির জল ঘরের চারপাশেও ছিটিয়ে দেওয়া হতো। বিশ্বাসমতে, এতে শরীর ঠান্ডা থাকে, সারাবছর ফসলের উৎপাদন ভালো হয় এবং গৃহে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে। এ দিনে সবাই ভালো খাবার-দাবারের আয়োজন করে। লোকবিশ্বাস এই যে, বছরের প্রথমদিন ভালো খেলে সারাবছরই ভালো খাওয়া যাবে।

অতীতে নববর্ষের আরেকটি মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের শুরুতে তাদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষ্যে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন শুরু করতেন। এ অনুষ্ঠানটি খুব সীমিত আকারে এখনো কোথাও কোথাও চালু আছে।

নববর্ষউৎসব বাংলার গ্রামীণজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নববর্ষে গ্রামীণ জনপদের মানুষ ঘর-বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, ঘরের জিনিসপত্র ধোয়ামোছা করে এবং সকালে গোসল করে ; পূত-পবিত্র এ দিনটিতে ভালো খেতে, ভালো থাকতে এবং ভালো পরতে পারলে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নতুন বছরের প্রথম দিনে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীরা আসেন। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানারকমের লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। পরস্পর নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলে এখন বহুল প্রচলিত।


বৈশাখীমেলা

নববর্ষের মূল আকর্ষণ বৈশাখীমেলা। মেলার আমেজে নববর্ষ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। সর্বজনীন বৈশাখীমেলা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বসে থাকে। কোথাও তিনদিন কোথাও পাঁচদিন আবার কোথাও-বা সাতদিন ধরে চলে বৈশাখীমেলা। লোকজ এ-সব মেলায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়সভেদে সবধরনের লোক কেনা-বেচা করে। বৈশাখীমেলায় স্থানীয় কৃষিজাতপণ্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাতপণ্য, কুটিরশিল্পজাতসামগ্রী, সবধরনের হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পজাতসামগ্রী পাওয় যায়। এ ছাড়াও শিশু-কিশোরদের খেলনা, নারীদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী ; বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন : চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা নানা প্রকার মিষ্টান্নসহ বিচিত্র দ্রব্য-সামগ্রীর সমারোহ থাকে। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস, বায়োস্কোপ, যাত্রাপালা, লোকসংগীত, জারি, সারি, গম্ভীরা, বাউলগান, নাটক ; চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

বাংলাদেশের যে-সব স্থানে বৈশাখীমেলা বসে সে-সব স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি, ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি, বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারিপুর, টুঙ্গিপাড়া, মুজিবনগর প্রভৃতি।

ঢাকার কাছাকাছি শুভাঢ্যার বৈশাখীমেলা, টঙ্গির স্বানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের ফুলতলি, রানিশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলির বৈশাখীমেলাও ব্যাপক জনপ্রিয়।

কালের বিবর্তনে নববর্ষউৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো রীতি-আচার বা উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন উৎসব। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবেরও বিলুপ্তি ঘটেছে। সে-কালে পয়লা বৈশাখ ছিল জমিদারদের পুণ্যাহ’র [পুণ্যকর্ম] অনুষ্ঠানের পক্ষে শাস্ত্রমতে প্রশস্ত বা উপযুক্ত দিন। জমিদার কর্তৃক প্রজাদের কাছ থেকে নতুন বছরের খাজনা আদায় করার দিন ছিল পয়লা বৈশাখ। ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গোরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল একসময় নববর্ষের অত্যন্ত জাঁকজমপূর্ণ অনুষ্ঠান। পূর্বোক্ত দুটিসহ ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকাবাইচ বহুরূপীর সাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা বর্তমানে আর তেমন একটা দেখা যায় না।

পাহাড়ে নববর্ষ উৎসব

পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের বরণ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের পাহাড়ি আদিবাসীরা তিনদিনব্যাপী বর্ষবরণউৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ হলো সবচেয়ে বড়ো উৎসব। চাকমাদের কাছে এ-উৎসব ‘বিজু’, মারমাদের কাছে ‘সাংগ্রাই’ এবং ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসুক’ বলে পরিচিত হলেও গোটা পার্বত্য অঞ্চলে এটি ‘বৈসাবি’ নামেই অভিহিত। ‘বৈসুক’, ‘সাংগ্রাই’ ও ‘বিজু’ এ-নামগুলোর আদ্যাক্ষর নিয়ে ‘বৈসাবি’ শব্দের উদ্ভব। বিদায়ী বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন,Ñ এই তিনদিন মূলত ‘বৈসাবি’ পালন করা হয়। মারমা আদিবাসীরা নববর্ষের দিন ঐতিহ্যবাহী ‘পানিখেলা’র আয়োজন করে থাকে। পানি তাদের কাছে পবিত্রতার প্রতীক। এদিন মারমা তরুণ-তরুণীরা পরস্পরের গায়ে পানি ছিটিয়ে নিজেদের পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়িদের মাঝে এই পানিউৎসব অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পাহাড়িরা ‘বৈসাবিউৎসব’ তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এদিন শিশুকিশোরেরা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হলো ‘মুরুবিজু’। এদিন নানারকম সবজির সমন্বয়ে একধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম ‘পাজন’। এটি ‘বৈসাবি’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং এটিই ‘বৈসাবি’র মূল অনুষ্ঠান। ‘বৈসাবি’ উপলক্ষে পাহাড়িরা নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্ন তৈরি করে। এ-উপলক্ষ্যে আদিবাসীরা বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন করে। এদিন অতিথিদের জন্য সবার ঘরের দরজা উন্মুক্ত থাকে।