কণ্ঠের কারুকাজে যারা শব্দের ভেতর প্রাণ সঞ্চার করেন, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজু তাদের মধ্যে অন্যতম। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন আবৃত্তিশিল্পের প্রসারে। নিছক শখের বশে নয়, বরং শৈশব থেকে লালন করা ভালো লাগাকে তিনি রূপ দিয়েছেন গভীর মগ্নতায়। সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় তিনি শুনিয়েছেন তার আবৃত্তিজীবনের শুরু, কবিতার প্রতি প্রেম এবং এই শিল্পের নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার কথা। আবৃত্তি শিল্পী সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজুকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
সূচনালগ্ন : ক্লাসরুম থেকে মঞ্চের আলোয়
সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজুর আবৃত্তি জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল স্কুলের শ্রেণিকক্ষে। অন্য সবার চেয়ে আলাদা কণ্ঠস্বর আর কবিতা পাঠের সহজাত ভঙ্গি নজর কেড়েছিল শিক্ষকদের। ক্লাসরুমে প্রবেশ করে শিক্ষক প্রথমেই তাকে কবিতা পড়ার নির্দেশ দিতেন। শিক্ষকের উৎসাহে শুরু হওয়া সেই কবিতা পাঠ একসময় রূপ নেয় নেশায়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক ক্লাসে এসেই আমাকে দিয়ে কবিতা পড়াতেন। তখন তো আর প্রথাগত আবৃত্তি বুঝতাম না, কিন্তু সবার চেয়ে একটু আলাদা ঢঙে পড়ার চেষ্টা করতাম।’
স্কুলের গ-ি পেরিয়ে সেই প্রতিভার প্রকাশ ঘটে এসএসসির বিদায় অনুষ্ঠানে। প্রতিবছর ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’- এই বিষাদময় কবিতার মানপত্র পাঠের দায়িত্ব পড়ত তার কাঁধে। সেই শুরু ; তারপর অনেক প্রতিযোগিতার পুরস্কার আর মানুষের ভালোবাসা তাকে নিশ্চিত করে দেয় যে, শব্দই হবে তার জীবনের ধ্রুবতারা।
সেই শুরু থেকেই কবিতার সাথে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি হয় তার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিচয়’ কবিতাটি দিয়েই তার আনুষ্ঠানিক আবৃত্তি-যাত্রার সূচনা।
কবিতার বিষয়বস্তু ও কবিদের প্রতি প্রেম
প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা বিরহÑ নাজুর কাছে কবিতার নির্দিষ্ট কোনো সীমানা নেই। সবধরনের কবিতা পাঠেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে, জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আবুল হাসান এবং শামসুর রাহমানের কবিতা তাকে বেশি টানে। তার মতে, এই কবিরা জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের যে গূঢ় রহস্য ও বৈচিত্র্য, তা তাদের কবিতায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।
প্রস্তুতির দর্শন : তুলির আঁচড়ের মতো আবৃত্তি
একজন চিত্রশিল্পী যেমন ছবি আঁকার আগে রঙের বিন্যাস নিয়ে ভাবেন, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজুও তেমনি একটি কবিতা আবৃত্তির আগে গভীর প্রস্তুতি নেন। তিনি বলেন, ‘আমি হুট করেই কোনো কবিতা আবৃত্তি করি না। কবির পটভূমি, তার জীবনবোধ এবং কবিতার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করি। শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ভাবগুলো ধারণ করেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিই।’
কণ্ঠস্বর ও আবেগের মেলবন্ধন
আবৃত্তিতে কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও নাজু মনে করেন, স্বাভাবিক কণ্ঠই আবৃত্তির জন্য যথেষ্ট। তবে, পরিশ্রম আর নিরন্তর চর্চার মাধ্যমে কণ্ঠকে মার্জিত করা সম্ভব। তার মতে, আবৃত্তির আসল প্রাণ হলো ‘আবেগ’। দর্শককে মুগ্ধ করতে হলে কবিতার মেজাজ বুঝে আবেগ প্রয়োগ করতে হয়Ñ সেটা প্রেম হোক বা বিরহ। দর্শক যদি আবৃত্তিকারের আবেগ অনুভব করতে না-পারেন, তবে সেই শিল্পের সার্থকতা থাকে না।
চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
আবৃত্তিচর্চায় সময়োপযোগী কবিতা নির্বাচনকে বড়ো চ্যালেঞ্জ মনে করেন তিনি। রাজনৈতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মেজাজ বুঝে কবিতা চয়ন করা একজন দক্ষ শিল্পীর পরিচয়। আবার, সমাজ সংস্কারেও আবৃত্তির বড়ো ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। কবির দেওয়া সামাজিক বার্তাগুলো সহজ-সাবলীল ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াকেই তিনি নিজের দায়বদ্ধতা মনে করেন।
প্রযুক্তির প্রভাব ও শুদ্ধ উচ্চারণের গুরুত্ব
বর্তমান ফেসবুক ও ইউটিউবের যুগে আবৃত্তির চর্চায় একধরনের অস্থিরতা দেখছেন তিনি। সাংগঠনিক চর্চা বাদ দিয়ে হুবহু অনুকরণ বা কপি করছেন অনেকেই। দীর্ঘ ৩৬ বছরের পথচলায় নাজু দেখেছেন এই শিল্পের বিবর্তন। তবে, বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতি নিয়ে তার মনে একধরনের আক্ষেপ কাজ করে। ইউটিউব বা ফেসবুকে কাউকে কপি করে আবৃত্তিকার সাজার যে হিড়িক পড়েছে, তার বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সোচ্চার।
তিনি বলেন, ‘আবৃত্তি মানে শুধু শব্দের উচ্চারণ নয়, এটা একটা সাধনা। এখনকার অনেকে সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই অন্যের স্টাইল কপি করছে, এতে নিজস্বতা নষ্ট হচ্ছে। শুদ্ধ উচ্চারণ হলো আবৃত্তির প্রথম সোপান। এটা ছাড়া শিল্পের ভিত্তি তৈরি হয় না।’ পেশাগত জীবনে কবিতা নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়েও তিনি কথা বলেন। একটি রাজনৈতিক সমাবেশে প্রেমের কবিতা বা শোকের সভায় উচ্ছ্বাসের কবিতা পড়া যেমন অসংলগ্ন, তেমনি দর্শকের রুচি বুঝতে না পারাটাও ব্যর্থতা। তার মতে, পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কবিতা বাছাই করাই একজন শিল্পীর মুনশিয়ানা।
একজন প্রকৃত আবৃত্তিশিল্পী হতে হলে শুদ্ধ উচ্চারণের বিকল্প নেই। তাই নতুনদের জন্য তার পরামর্শÑ যেকোনো সংগঠন বা কর্মশালার মাধ্যমে সঠিকভাবে শিখে তবেই এই পথে আসা উচিত।
বর্তমান ব্যস্ততা ও আগামীর ভাবনা
দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ‘কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রে’র সাথে যুক্ত আছেন নাজু। ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে শেখা সেই চর্চা আজও অব্যাহত। টেলিভিশনের পর্দা থেকে শুরু করে কলকাতা ও দেশের বিভিন্ন মঞ্চে তিনি নিয়মিত আবৃত্তি করেন। আবৃত্তির বাইরে নাটক ও গানের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, যা তার শিল্পবোধকে আরো সমৃদ্ধ করে।
ঢাকার মহাখালীতে জন্ম নেওয়া এবং পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা এই শিল্পী পেশায় একজন ব্যবসায়ী হলেও হৃদয়ে ধারণ করেন লাল-নীল শব্দের ঝংকার। তিনি কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রে’র সাথে জড়িত। ব্যাঙ্কার স্ত্রী ফাহমিদা আক্তারও একই সংগঠনের একজন আবৃত্তিশিল্পী। একমাত্র সন্তান সৈয়দ তাশফীন জোহানকে নিয়ে এই আবৃত্তিজুটির কাব্যিক দাম্পত্য আবেগঘন ও ছন্দময়।
সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আবৃত্তির সাথেই থাকতে চান এবং এই শিল্পের মাধ্যমেই সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।