মাসুদুজ্জামানের একক আবৃত্তিসন্ধ্যা সাতরঙ্গ দুপুরে যেন হঠাৎ বৃষ্টির হিমেল পরশ -অলোক বসু

15 Jul 2024, 03:10 PM আবৃত্তি শেয়ার:
মাসুদুজ্জামানের একক আবৃত্তিসন্ধ্যা  সাতরঙ্গ দুপুরে যেন হঠাৎ বৃষ্টির হিমেল পরশ  -অলোক বসু

যেকোনো বড়ো ছুটিতে ঢাকা শহর কেমন অপরিচিত হয়ে যায়। কোলাহল, চাঞ্চল্য, ব্যস্ততা কমে গিয়ে এই মেগা শহর কেমন একটা অলসভঙ্গিতে ঝিমিয়ে পড়ে কয়েকটা দিনের জন্য। ঢাকা শহর যেন অচেনা হয়ে পড়ে। এবার ঈদ-উল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে ঢাকা শহর যেন আরো নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিল। এই শহরের বাসিন্দারা বেরিয়ে পড়েছিলেন আনন্দভ্রমণে নয়ত তাদের শিকড়ে, পারিবারিক মেলবন্ধনে। ঈদের ছুটির কারণে ঢাকার নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্রগুলোও বন্ধ। ছুটির আমেজের মাঝেই চলে এল ২২ জুন। বেইলি রোডের মহিলা সমিতি যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল। সন্ধ্যা ৭.১৫-এ মহিলা সমিতির ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে আবৃত্তিশিল্পী মাসুদুজ্জামানের একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘সাতরঙ্গ দুপুরের কাব্য’। ‘দুপুরের কাব্য’ সন্ধ্যায় বলেই কি না আগেভাগে বিকেল থেকেই আবৃত্তিপ্রেমীদের সমাগম বাড়ছিল বেইলি রোডে। মহিলা সমিতির নিচের খোলা আঙিনা, রাস্তার ওপারের চায়ের দোকান সর্বত্রই ছোটো ছোটো জটলা করে আবৃত্তিকর্মী ও প্রেমীদের আড্ডা। সত্যি বলতে কী, মাসুদুজ্জামানের আবৃত্তি অনুষ্ঠানকে ঘিরে ঢাকার আবৃত্তিকর্মী ও আবৃত্তিপ্রেমীদের একটা প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল মহিলা সমিতি।

মহিলা সমিতির খোলা আঙিনায় আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফার সাথে এতটাই আড্ডা জমে গিয়েছিল যে, আমাদের মিলনায়তনে ঢুকতে কিছুটা দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে মাসুদুজ্জামানের ‘সাতরঙ্গ দুপুরের কাব্য’ আবৃত্তি অনুষ্ঠান। ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তন দর্শকে পরিপূর্ণ। মঞ্চে আবৃত্তি করছেন মাসুদুজ্জামান। ‘দুপুরের কাব্য’ সন্ধ্যায় শুনতে এসে একটু দেরি করে ঢোকায় বঞ্চিত হলাম ‘চিল্কায় সকাল’-এর আবৃত্তি উপস্থাপনা। তবে একথা বলতেই হবে, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বা সময় নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ রাখেননি মাসুদুজ্জামান। একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে তিনি অনুষ্ঠান শুরু করেছেন এবং পরিমিত সময়বোধের জায়গা থেকে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শেষ করেছেন। এই পরিমিতিবোধ খুব জরুরি কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে। অনুষ্ঠানটি সর্বার্থেই ছিল পরিমিতি বোধসম্পন্ন। মঞ্চসজ্জা, আলোক, শব্দ, আবহসংগীত থেকে শুরু করে পুরো আয়োজনটিই ছিল পরিমিত এবং স্নিগ্ধ। মাসুদুজ্জামান দীর্ঘদিনে তৈরি হওয়া একজন পরীক্ষিত আবৃত্তিশিল্পী। নব্বইয়ে স্বৈরাচারি সরকারের পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিম-লে যে সুকুমার হাওয়া বইছিল তাতেই যেন ভেসে এসেছিল একটি মুকুল। সেই মুকুলের সুবাসে অল্পসময়ের মাঝেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চিনে নিল এক সম্ভাবনাকে। বলা বাহুল্য, সেই সময়, এমন কী এখনো [যদিও হালে কিছুটা অনুজ্জ্বল হয়ে পড়েছে] আবৃত্তির আতুরঘর টিএসসিই। সেই টিএসসি দাপিয়ে বেড়ানো সম্ভাবনার নাম মাসুদুজ্জামান। যদিও মাসুদুজ্জামানের আবৃত্তিতে অভিষেক ঘটেছিল তার নিজ শহর বরিশালেই, আরো আগেই।

মাসুদুজ্জামান অনেককিছু করলেও তিনি মূলত আবৃত্তিটাই করেছেন গভীর ভালোবাসার সাথে হৃদয় দিয়ে। তিনি একটু একটু করে নিজেকে তৈরি করেছেন এমন একটি একক আবৃত্তি সন্ধ্যার জন্য। সেই সন্ধ্যায় একে একে তিনি সাতাশটি কবিতা আবৃত্তি করেছেন। মাঝে মাঝে কবিদের নাম, কবিতার নাম এবং সংক্ষিপ্তাকার প্রাসঙ্গিক দু’চার কথা বলেছেন। তিনি বেশ চমৎকারভাবেই তার উপস্থাপনা করেছিলেন। তবে, একক কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে কবিতা নির্বাচন খুব জরুরি একটা বিষয়। সেক্ষেত্রে মাসুদুজ্জামানের কাছ থেকে আরো বৈচিত্র্য ও সুনির্বাচন প্রত্যাশা ছিল আমাদের। মাসুদুজ্জামানের আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠা সম্পর্কে আমার কিছুটা জানাশোনা আছে বলেই সেই জায়গা থেকে মনে হয়েছে, কবিতা নির্বাচনে তার আরো একটু সচেতন হওয়া দরকার ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কবিরা বাদ পড়ে গেছেন মাসুদুজ্জামানের নির্বাচন থেকে। আরো একটি বিষয়ও খানিকটা অসঙ্গতিপূর্ণ লেগেছে। মাসুদ সব ধরনের কবিতাই আবৃত্তি করেন সচরাচর, ‘সাতরঙ্গ দুপুরে’ কেন যেন মনে হয়েছে রং একটু কম পড়েছে। কবিতায় রঙতো অন্যকিছু নয়Ñ রস। নবরসের ঘাটতি উপলব্ধি হয়েছে সে-সন্ধ্যায়, বিশেষ করে রৌদ্ররস ও বীররসের কবিতার। মাসুদুজ্জামানের কণ্ঠে দেশ-মুক্তিযুদ্ধ-বিদ্রোহ-বিপ্লবের কবিতাও বেশ প্রাণ পায়। আমার প্রত্যাশা ছিল শেষের দিকে এ ধরনের দু’একটি কবিতা হয়ত স্থান পাবে কিন্তু পায়নি। ফলত কোথায় যেন অসম্পূর্ণতার খানিকটা রেশ রয়েই গেল বলে মনে হয়েছে। আরো একটা বিষয় নিয়েও কোনো কোনো দর্শকের কিছুটা আপত্তির কথা টের পেয়েছি অনুষ্ঠান চলাকালেই। যেকোনো কারণেই হোক বেশ কয়েকটি কবিতা আবৃত্তির সময় তার ফাম্বলিং হয়েছে। অনেকেই মনে করেন এরকম একটি দীর্ঘ প্রস্তুতিপূর্বক আয়োজনে এটা মেনে নেওয়া যায় না। একজন গানের শিল্পী যদি ভুল সুরে গান করেন কিংবা গানের কথায় ফাম্বলিং করেন, আমরা কি মেনে নিই ? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটা লাইভ অনুষ্ঠানে এরকম ছোটোখাটো ভুল হতেই পারে। তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। তারপরও স্বীকার করতেই হয়, মাসুদুজ্জামান চমৎকার একটি আবৃত্তিসন্ধ্যা উপহার দিয়েছেন। বেশ উপভোগ্য ছিল সেদিনের সে সন্ধ্যাটি। অনেকদিনের খরার পর হঠাৎ বৃষ্টির হিমেল পরশে যে আনন্দ হয়, তেমনিই আনন্দময় ছিল সেই সন্ধ্যাটি। মাসুদুজ্জামান ও তার সংগঠন স্রোত আবৃত্তি সংসদকে ধন্যবাদ জানাতে হয় এজন্য যে তারা আবৃত্তিপ্রেমীদের এক স্নিগ্ধ মিলনমেলায় পরিণত করতে পেরেছিলেন সেদিনের সন্ধ্যাটিকে।

অনুষ্ঠান শেষে মাসুদুজ্জামানকে আশীর্বচনে ভূষিত করেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এমপি এবং আশরাফুল আলম, নওয়াজীশ আলী খান। আশরাফুল আলম আয়োজনের সার্থকতা নিয়ে একটি চমৎকার মন্তব্য করেন, যা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, কবিতার উপস্থাপন যদি শিল্পমানসম্পন্ন ও হৃদয়গ্রাহী হয় তাহলে দর্শকদের জোর করে বসিয়ে রাখার কৌশল বের করার কসরৎ করতে হয় না আয়োজকদের। সত্যিই তাই। একটি সফল ও সুন্দর আয়োজন আমাদের কতটা প্রাণিত করে তার প্রমাণ ‘সাতরঙ্গ দুপুরের কাব্য’। মাসুদুজ্জামানের আবৃত্তির জয় হোক, আরো প্রসার ঘটুক। 

ছবি : স্রোত অবৃত্তি সংসদ