কানাইপুর জমিদার বাড়ি : মোশাররফ হোসেন

29 Sep 2024, 03:13 PM ইতিহাসভুবন শেয়ার:
কানাইপুর জমিদার বাড়ি : মোশাররফ হোসেন


বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে অনেক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। এইসব নিদর্শন আমাদের ইতিহাসের অংশ এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। তবে, এইসব নিদর্শনের বেশিরভাগই অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে। ‘ঐতিহ্যভুবন’ বিভাগে আমরা বেশ কিছু প্রত্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বিশাদ বিবরণ ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরবো। চলতি সংখ্যায় থাকছে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী কানাইপুর জমিদারবাড়ি...


ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার কানাইপুর একটি প্রাচীন জনপদ। সিকদার পরিবারটি কয়েক শত বছর ধরেই কানাইপুরে বসবাস করছে। তবে কখন থেকে এই অঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন তার সঠিক কোনো তথ্য নেই। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, সিকদার পরিবারের প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তি লক্ষ্মী নারায়ণের সাথে মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের যোগাযোগ ছিল। সেইসূত্রে লক্ষ্মী নারায়ণ ফতেহবাদ পরগনার কানাইপুরসহ আশপাশের কয়েকটি পরগণার জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভ করেই তিনি মুর্শিদাবাদের নবাব বাড়ির আদলে কানাইপুরের কুমার নদের পূর্ব পাড়ে বিশাল একটি বাড়ি নির্মাণ করেন।

লক্ষ্মী নারায়ণ জমিদারি লাভের কয়েক বছর পরই ইংরেজরা সুবে বাংলাসহ ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা দখল করে। ইংরেজ শাসকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে লক্ষ্মী নারায়ণকে রাজা উপাধি প্রদান করা হয়। লক্ষ্মী নারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ভবতরণী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পান। দক্ষতার সাথে জমিদারি পরিচালনার জন্য ভবতরণী সেসময়ে প্রভাবশালী জমিদার হয়ে ওঠেন এবং সুখ্যাতি অর্জন করেন। ভবতরণীর নাবালকপুত্র সতীশ চন্দ্র জমিদারি পরিচালনার উপযুক্ত হলে তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে স্বামীর নামে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় কাজে মনোযোগী হন। জমিদার সতীশ চন্দ্র সিকদারের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র সুরেন্দ্রনাথ সিকদার ও নিরদবরণ সিকদারের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায়। ছোটো ভাই নিরদবরণ সিকদার নিঃসন্তান থাকায় বড়ো ভাই সুরেন্দ্রনাথ সিকদার একাই জমিদারি পরিচালনা করেন। জমিদার সুরেন্দ্রনাথ সিকদার শিশু সন্তান ও স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী রাধারাণী সিকদার এবং পরবর্তীকালে তার সন্তানেরা ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগে পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করেন।

ফরিদপুরের কানাইপুর জমিদারবাড়িটি স্থানীয়দের কাছে সিকদার বাড়ি হিসেবে পরিচিত। বিশাল এই সিকদার বাড়িটির পূর্বদিকে রয়েছে দোতলা প্রাসাদভবন। প্রাসাদভবনের চার কোণে চারটি মিনার ছিল এখন একটিমাত্র মিনার দৃশ্যমান রয়েছে। বাকি তিনটি মিনার ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাসাদভবনের পূর্ব দিকে প্রবেশপথ। প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দুই পাশে দুটি ধ্বংসপ্রাপ্ত কক্ষের চিহ্ন দেখা যায়। এরপর দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িঘর পার হয়ে দুর্গা মন্দিরে ঢুকতে হয়। প্রাসাদভবনের দোতলায় ছিল সিংহাসন ও বৈঠকখানা ।

প্রাসাদভবনের দোতলার বৈঠকখানা থেকে দুর্গামন্দিরের পূজা দেখার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া প্রাসাদভবনের দোতলার পূর্ব পাশে প্রবেশ ফটকের দুইপাশে দুটি বারান্দা ছিল। প্রাসাদভবন সংলগ্ন উত্তরপাশেই অন্দরমহলের প্রবেশ পথ রয়েছে। অন্দরমহলের প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকলেই উত্তর পূর্ব পাশে দুটি মন্দির রয়েছে। এর একটি লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির এবং অন্যটি শিব মন্দির। এখনো এই মন্দির দুটিতে নিয়মিত পূজার আয়োজন করা হয়। দেবদেবীর আরাধনা আর বন্দনায় বেজে ওঠে ঢাক-ঢোল-শঙ্খধ্বনি।

বিশাল এই জমিদারবাড়িটিতে প্রাসাদভবন, অন্দরমহলসহ বেশ কয়েকটি ভবন ছিল। কালের আবর্তে বেশিরভাগ ভবনই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন শুধু জমিদারবাড়ির পূর্বাংশে দোতলা প্রাসাদভবন এবং প্রাসাদভবনের পেছনে পশ্চিম পাশে অন্দরমহলের বিশাল দোতলা ভবনটি টিকে রয়েছে। অন্দরমহলের বর্গাকৃত দোতলা ভবনটিতে শতাধিক কক্ষে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সিকদার বংশের ১৬টি পরিবার বসবাস করত। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর সিকদার পরিবারের কয়েকটি শরিক ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। তবে এখনো নিভারাণী সিকদার, সুবীর সিকদার, নিপু সিকদার, পীযূষ সিকদার, স্বপন সিকদার, সমীর সিকদার, নিমাই সিকদার, হারান সিকদার, দেবু সিকদার, নিতাই সিকদার, শ্যাম সিকদার ও চৈতন্য সিকদার-সহ অধিকাংশ শরিক জমিদার বাড়িটিতে অথবা বাড়ির আঙিনার আশেপাশে নতুন ভবন তুলে বসবাস করছেন।

কানাইপুর বিশাল জমিদারবাড়িটির অন্দরমহলের উত্তর পশ্চিম দিকে একটি ধ্বংস প্রাপ্ত একতলা ভবন এবং উত্তর দিকে আরো একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ধংসাবশেষ দেখে মনে হয় বাড়িটির উত্তর-পূর্ব দিকেও আরো কয়েকটি ভবনে ছিল। জমিদার বাড়ির প্রাসাদভবন ও অন্দরমহল ছাড়া দুটি ভবনের মেঝে ও দেয়ালের চিহ্ন এখনো রয়েছে। জমিদার বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে কুমার নদ এখনো বয়ে চলেছে।

প্রজাদের সুবিধার জন্য কানাইপুরে রাস্তা নির্মাণ, দিঘি খনন, হাট-বাজার স্থাপন এবং শিক্ষা বিস্তারে সিকদার পরিবারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কানাইপুর হাট, বিদ্যা বীথি হাই স্কুল, বেগম রোকেয়া কিশালয় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় জমিদার পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। তবে, খাজনা আদায় কানাইপুরের জমিদারেরা কঠোর ছিলেন।

ফরিদপুর জেলা সদরে কানাইপুর জমিদারবাড়িটির সম্মুখভাগের স্থাপত্য নকশা খুবই নান্দনিক। লাল ইট দিয়ে নির্মিত বাড়িটির স্থাপত্য নকশায় ইন্দো-ইউরোপীয় রীতির সঙ্গে দেশীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। আড়াই শত বছরের অধিক প্রাচীন জমিদারবাড়িটি নির্মাণে পোড়া ইট, চুন ও সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কতিপয় বিহারি এবং স্থানীয় রাজাকারেরা বাড়িটিতে লুণ্ঠন করে এবং হত্যাযজ্ঞ চালায়।

সিকদার বাড়ির অন্দরমহলে অনেক পরিবার বসবাস করলেও অযতœ অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। জরাজীর্ণ বাড়িটি সংস্কার করা গেলে এটি হতে পারে ফরিদপুর জেলা ও দেশের একটি মূল্যবান প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন। 

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা