প্রতিটি দেশের সাংস্কৃতিক মূলধারার সঙ্গে লোকসংস্কৃতির গভীর সংযোগ রয়েছে। আমাদের দেশে আগে লোকনাট্য এবং যাত্রাপালা থেকে অর্থাৎ নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারা থেকে উপাদান গ্রহণ করেই সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হতো। কিন্তু কয়েক দশক ধরে হিন্দি চলচ্চিত্রের ফর্মুলা নকল করার প্রতিযোগিতা বড়ো দৃষ্টিকটু হয়ে পড়েছে। দর্শক এখন আর নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখতে হলমুখী হন না। যার ফলে এই ব্যবসার মন্দাবস্থা চলছে। যেখানে আগে দেড় হাজারেরও বেশি সিনেমা হল ছিল সেখানে এখন একশো’র কিছু বেশি সিনেমা হল রয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে হলে এখনি পদক্ষেপ নিতে হবে, সেইসঙ্গে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি থেকে আহৃত উপাদান নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...
চলচ্চিত্রে বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মানুষের জীবন, জীবনযাত্রার ধরন ও জীবনেরই খ-চিত্র। এতে আধুনিক ও চলমান জীবনযাত্রা যেমন উঠে আসে তেমনি ঐতিহাসিক কিংবা কাল্পনিক কাহিনি নিয়েও নির্মিত হতে পারে উৎকৃষ্ট মানের চলচ্চিত্র। সেই জীবনে যেমন ব্যক্তিমানুষের যাপিত-জীবন, কর্মধারা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রাগ-অনুরাগ, বিরহ-মিলন থাকে, তেমনি থাকে সামাজিক জীবনের একক হিসেবে পারিবারিক সমস্যা-সঙ্কটের কথা। এমনকি ফ্যান্টাসি, লোককাহিনি বা ভৌতিক কল্পকাহিনি নিয়েও নির্মিত হতে পারে সফল চলচ্চিত্র। এদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তাতে কালানুক্রমিক বিবেচনার পাশাপশি বিষয়ভিত্তিক বিবেচনায় স্থান পেয়েছে সামাজিক, লোকছবি, যুদ্ধ, ফ্যান্টাসি, থ্রিলার, কমেডি, ঐতিহাসিক ও শিশুতোষ চলচ্চিত্র।
আবার চলচ্চিত্রে লোকজীবন সংশ্লিষ্ট নানা উপাদানের বহুল ব্যবহার যেমন- লোকসংগীত, লোকগাথা, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, রূপকাথা ও কিংবদন্তি, লোকউৎসব, লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার, লোকাচার, লোকনাম ও লোকখেতাব প্রভৃতি। একারণে আমাদের চলচ্চিত্রে লোকজীবন-জিজ্ঞাসার গভীরতা ব্যাপক ও বিস্তৃত।
আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে ফোক বা লোককাহিনি বহু আগে থেকেই জড়িয়ে আছে। গ্রামবাংলার নদী, খাল-বিল, খোলা মাঠ-প্রান্তরে কোনো গাছের নিচে বসা রাখালের পাগল করা বাঁশির সুর, রাতের উঠোনে জারি-সারি-ভাটিয়ালি গানের আসর যেন একসময় বহন করতো আবহমান বাংলার রূপ, সে সময় এসব লোককাহিনি তখনকার মানুষদের রূপ-রসের সুস্থ বিনোদন জুগিয়েছে।
যার প্রভাব আমাদের চলচ্চিত্রেও পড়েছিল দারুণভাবে, কল্পনায় আঁকা সেসব লোককাহিনির একেকটি চরিত্র যখন সেলুলয়েডের ফিতায় বাস্তবের রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছে। তখন অবাক বিস্ময়ে মনের আনন্দ নিয়ে মন ভরে দর্শকেরা তা উপভোগ করেছে, বহু বহু মানুষের সুস্থ বিনোদনের মনের খোরাক মিটিয়েছে এই লোককাহিনিনির্ভর সিনেমাগুলো। শুধু যে ফোক লোককাহিনি নির্ভর সিনেমা তা নয়, পাশাপাশি কল্প রূপকথাভিত্তিক কাহিনি নিয়েও বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘রূপবান’ শিরোনামে প্রথম লোককাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক সালাউদ্দিন, ছবিটি সে-সময়ে বিপুল সাড়া ফেলেছিল, বাম্পার ব্যবসাও করেছিল ছবিটি। এক রাজ্যের দরবেশ হুকুম করেন রাজার ১২ দিনের শিশুপুত্রকে ১২ বছরের এক কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ১২ বছরের জন্য গভীর জঙ্গলে পাঠাতে হবে। রাজা দরবেশের হুকুমমতে তার রাজ্যের উজিরের ১২ বছর বয়সী মেয়ের [রূপবান] সঙ্গে তার ১২ দিনের শিশুপুত্রের বিয়ে দিয়ে বনবাসে পাঠিয়ে দেন। গভীর জঙ্গলে নানা বিপদ-আপদের মধ্যে রূপবান তার ১২ দিন বয়সী স্বামীকে কোলে কোলে বড়ো করতে থাকেন। এ রকম চমকপ্রদ গল্পে নির্মিত ‘রূপবান’ ছবিটি দেখতে সে-সময়ের দর্শকেরা সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ছবিটি সে-সময়ে এতটাই আলোড়ন তুলেছিল যে, ছবির নায়িকা সুজাতা যেই বাঁশ ধরে গান গেয়েছিলেন সেই বাঁশটি পরে নিলামে উঠেছিল, এবং কোনো একজন সে-সময়ের ৫০০ টাকা দিয়ে তা কিনেও নিয়েছিলেন। ছবিটির অভাবনীয় সাফল্যে নির্মাতারাও ঝুঁকে পড়লেন এ ধরনের ছবি নির্মাণে, পরের বছর নির্মাতা সফদার আলী ভূঁইয়া নির্মাণ করলেন ‘রহিম বাদশা ও রূপবান’, ইবনে মিজান নির্মাণ করলেন ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ও ‘জরিনা সুন্দরী’, সৈয়দ আউয়াল নির্মাণ করলেন ‘গুনাই বিবি’ ও জহির রায়হান নির্মাণ করলেন ‘বেহুলা’, সে বছরই পরিচালক সালাউদ্দিন তার ‘রূপবান’ উর্দু ভাষায় মুক্তি দেন!

১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক আজিজুর রহমান প্রথম ফ্যান্টাসিকে প্রাধান্য দিয়ে রূপকথাভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন ‘সাইফুলমূলক বদিউজ্জামান’, পরি, পাহাড়, পর্বত, দৈত্য, দানব, সাত সমুদ্র তের নদী পার হওয়া ছবির নায়ককে এমন চমকপ্রদ কাহিনি ও দৃশ্যে দেখে দর্শকেরাও মোহিত হয়ে উপভোগ করেছে মন ভরে। এ ছবির সাফল্যেও নির্মাতারা আকৃষ্ট হন রূপকথাভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে।
একদিকে ফোক লোককাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র অন্যদিকে রূপকথা ফ্যান্টাসি ছবি নির্মাণে সে-সময়ের পরিচালকেরা যেন ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে একের পর এক নির্মাণ হতে থাকে ইবনে মিজানের ‘জরিনা সুন্দরী’, ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’, ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘রাখাল বন্ধু’ [সাদাকালো], ‘রঙিন রাখাল বন্ধু’, ‘সতী নাগ কন্যা’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘পাতাল বিজয়’, ‘সাপুড়ে মেয়ে’, ‘রঙিন জরিনা সুন্দরী’, ‘বসন্ত মালতী’, ‘নাগিনীর প্রেম’, সফদার আলী ভূঁইয়ার ‘কাঞ্চন মালা’, আজিজুর রহমানের ‘মধুমালা’, ‘শিষ মহল’, ‘কাঞ্চন মালা’, ‘আলীবাবা ৪০ চোর’, খান আতাউর রহমানের ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণ মালা’, রহিম নওয়াজের ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, মহিউদ্দিনের ‘গাজীকালু চম্পাবতী’, শহীদুল আমিনের ‘রাজকুমারী চন্দ্রবান’, ‘শাহজাদী গুলবাহার’, নূরুল হক বাচ্চুর ‘কুচবরণ কন্যা’ [সাদাকালো], শফি বিক্রমপুরীর ‘আলাদীন আলিবাবা সিন্দাবাদ’, সফদার আলী ভূঁইয়ার ‘রসের বাইদানী’, ফয়েজ চৌধুরীর ‘মালকাবানু’, মাসুদ পারভেজের ‘যাদু নগর’, ‘নাগ পূর্ণিমা’, আজিজ মেহেরের ‘আকাশ পরী’, মতিউর রহমান বাদলের ‘নাগিনী কন্যা’, শামসুদ্দিন টগরের ‘মহুয়া সুন্দরী’, ‘সতী কমলা’, ‘রতন মালা’, মিলন চৌধুরীর ‘রঙিন সাত ভাই চম্পা’, দারাশিকোর ‘সপরানী’, স্বপন সাহার ‘যাদুমহল’, গাফফার খানের ‘সাগরভাসা’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘বেহুলা লখিন্দর’, সাইদুর রহমান সাইদের ‘আলোমতি প্রেমকুমার’, ‘বেদকন্যা পঙ্খীরানী’, কাজী হায়াতের ‘রাজবাড়ী’, ‘বে রহম’, এফ কবির চৌধুরীর ‘পদ্মাবতী’, ‘সওদাগর’, ‘মর্জিনা’, হারুনুর রশীদের ‘গুনাই বিবি’, মো. শাহজাহানের ‘পরীস্থান’, আবদুস সামাদ খোকনের ‘ঝিনুক মালা’, ‘শিরি ফরহাদ’, মতিউর রহমান পানুর ‘নাগ মহল’, আবদুল লতিফ বাচ্চুর ‘দ্বীপকন্যা’, তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘শঙ্খমালা’, ‘গাড়িয়াল ভাই’, ‘অচিন দেশের রাজকুমার’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘নাচনেওয়ালী’, রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘চ-ীদাস রজকিনী’, দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘নাচে নাগিন’, ‘হাতী আমার সাথী’, ‘রূপসী নাগিন’, ‘নাচ নাগিনা নাচ’, ‘নাগরানী’, মোস্তফা আনোয়ারের ‘নাগিনী সাপিনী’, ‘কাশেম মালার প্রেম’, ‘পুষ্পমালা’, এফ এ খান সবুজের ‘নয়া বাইদানী’, এ কে সোহেলের ‘খায়রুন সুন্দরী’র মতো জনপ্রিয় সব ছবিগুলো!

বাংলা চলচ্চিত্রে এই লোককাহিনি ও কল্প রূপকথাভিত্তিক চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সফল পরিচালক ছিলেন ইবনে মিজান। তার বেশির ভাগ ছবির বৈশিষ্ট্যই ছিল এই ঘরানার, সঙ্গে এফ কবির চৌধুরী, আজিজুর রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, শামসুদ্দিন টগর, তোজাম্মেল হোসেন বকুলসহ আরো বহু নির্মাতা এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
দূরের মাঠে রাখালের বাঁশির সুরে পাগলপারা রাজকন্যা, সমুদ্রগর্ভে অপরূপ কোনো রূপসীর প্রেমে রাজকুমার, বিশাল দৈত্যের হাতের মুঠোয় আস্ত এক রাজপ্রাসাদ, চাদর বিছিয়ে আকাশ দিয়ে উড়ে উড়ে পরিদের রাজ্যে যাওয়া, পানির নিচে মানুষের বসবাস, সুন্দরী পরিদের আস্তানা, সামান্য বেদেকন্যার সঙ্গে রাজকুমারের প্রেম, বিশাল বিশাল রাজপ্রাসাদ, বিভিন্ন জীবজন্তুর সঙ্গে ঢাল তলোয়ারের ঝনঝনানি আর নায়ক-নায়িকাদের আলো ঝমঝমের বাহারি পোশাকে যেন এ ধরনের প্রতিটি ছবিকেই করতো উজ্জ্বল আলোকিত!
রাখাল বন্ধু : ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক ইবনে মিজান তৈরি করেন এক চমকপ্রদ কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র ‘রাখাল বন্ধু’ । ছবিতে অভিনয় করেন প্রয়াত আজিম, সুজাতা, সুচন্দা মান্নান, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এক দরিদ্র রাখালের বাঁশির সুরের প্রেমে পড়ে রাজকন্যা, প্রতিদিন রাখালের বাঁশির সুরের টানে রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে আসে সে। একসময় তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। শুরু হয় রাজা, রাজকন্যা আর গরিব রাখালের দ্বন্দ্ব। ছবিটি সে-সময়ে দারুণভাবে সাড়া জাগিয়েছিল, হয়েছিল ব্যবসায়িকভাবে সফল। পরবর্তীসময়ে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক ইবনে মিজান ছবিটির রিমেক করেন। এবারে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন সাত্তার ও জিনাত। নিয়ে!
সুয়োরানী দুয়োরানী : ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক রহিম নেওয়াজ তৈরি করেন ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, অভিনয়ে ছিলেন সুচন্দা, রাজ্জাক, বেবী জামান প্রমুখ। রাজ্যের এক গহিন জঙ্গলে হরিণ শিকার করতে গিয়ে রাজা এক রাক্ষসী নারীর কবলে পড়েন এবং সেই রাক্ষসীর কারণে কীভাবে তার রাজার প্রথম স্ত্রী ও তার পুত্রকে দেশ-ছাড়া হতে হয় তা নিয়েই চলচ্চিত্রটি। ছবিটি রূপকথার হলেও মিথ্যা বা মন্দের জয় যে কখনোই হয় না, ভালো বা সত্যের জয় অনিবার্য, তারই পরিচয় পাওয়া যায়।
বেদের মেয়ে : নূরুল হক বাচ্চু ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন ‘বেদের মেয়ে’। ছবিতে অভিনয় করেন আজিম, সুজাতা, রোজি ও নারায়ণ চক্রবর্তী। বেদে বহরে বেড়ে ওঠা এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে রাজকুমারের প্রেম-বিরহের ঘটনাই ছিল মূল গল্প।
বেদের মেয়ে জোছনা : বাংলা চলচ্চিত্রে লোককাহিনিনির্ভর ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোছনা’। ছবিটি ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন পরিচালক। যা সাদাকালো ‘রূপবান’কেও হার মানিয়েছিল। বেদে বহরের সুন্দরী কন্যার সঙ্গে রাজকুমারের প্রেম-উপাখ্যান নিয়ে বহু ছবি নির্মিত হলেও ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ জনপ্রিয় এবং ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে দলিলপ্রাপ্ত। ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করে আছে। ছবিটি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী সমীকরণের সব ওলট পালট করে দেয়। একেবারে সীমিত বাজার থেকে ছবিটি অভাবনীয় সাফল্যে ভেসে যায়, ৫০টি প্রিন্ট অনেক বছর দেশের প্রতিটি হলে কয়েকবার করে প্রদর্শিত হয়। দেশের সর্ববৃহৎ সিনেমা হল যশোরের ‘মনিহারে’ টানা ছয় মাস দেখানো হয়, আবার রাজশাহীর ‘উপহার’ হলেও পাঁচ মাসের বেশি চালানো হয়েছিল ‘বেদের মেয়ে জোছনা’। তাছাড়া দেশের প্রায় সকল হলেই ছবিটি মাসের পর মাস চলার রেকর্ড রয়েছে। এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, অনেক হলেই চারটি শোর পরিবর্তে পাঁচটি করে শো চালাতে হয়েচিল! এখানেই শেষ নয় পাশাপাশি সিনেমা হল থাকায়, এক হলের এক রিল শেষ হওয়ার পর অন্য হলে সেই রিল চালানো হতো। এই ছবিতে জোছনার চরিত্রে অঞ্জু ঘোষ আর রাজকুমারের চরিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনয় করেছিলেন।
এ ছবিটির পাশাপাশি অর্থাৎ একই বছরে [১৯৮৯] মুক্তি পায় ফোক ফ্যান্টাসি ছবির রাজা ইবনে মিজান পরিচালিত ‘সাপুড়ে মেয়ে’, ‘আলাল দুলাল’ ও ‘সাগরকন্যা’ নামের তিনটি ফোক-ফ্যান্টাসিভিত্তিক ছবি। পরিচালক সাইদুর রহমান সাইদ নির্মাণ করেন ‘আলোমতি প্রেমকুমার’, তবে ছবিগুলো কোনোটিই ‘বেদের মেয়ে জোছনা’কে টপকাতে পারেনি।
টপকাতে না পারলেও ‘বেদের মেয়ে জোছনা’র এমন সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে নব্বই দশকে নির্মাতাদের মধ্যে ফোক ছবি নির্মাণে ব্যাপক প্রতিযোগিতা দেখা যায়। যার অধিকাংশ ছিল রিমেক। গল্পে তেমন নতুনত্ব না থাকলেও আগের গল্পগুলোকেই ঘষেমেজে রঙিন রূপে পর্দায় তুলে ধরা হয়েছিল। নয়ের দশকের শুরুতেই পরিচালক শামসুদ্দিন টগর নির্মাণ করেন ‘রতনমালা’, ছবিটিকে তিনি অনেকটা মডার্নভাবে উপস্থাপন করেন। এক দরবেশের অভিশাপে ছবির নায়ক রতন সাপ হয়ে যায়, একপর্যায়ে ছবির নায়িকা নাগিন কন্যার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, বেদেসর্দার শেষে তাদের মিল করে দেয়!
নয়ের দশকে এ ধারার যেসব ছবি নির্মিত হয়েছিল তার মধ্যে আছে মোস্তফা আনোয়ারের ‘কাশেম মালার প্রেম’, ‘কান্দো কেন মন’ জিল্লুর রহমানের ‘মোহনবাঁশি’, স্বপন চৌধুরীর ‘মনিকাঞ্চন’, শাহজাহান আকন্দের ‘কুচবরণ কন্যা মেঘবরণ কেশ’, ফয়েজ চৌধুরীর ‘রাজার মেয়ে বেদেনী’, সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকীর ‘আয়না বিবির পালা’, তোজাম্মেল হক বকুলের ‘রঙ্গিলা’, ‘গাড়িয়াল ভাই’, ‘শঙ্খমালা’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘অচিন দেশের রাজকুমার’, পাগল মন’, জিল্লুর রহমানের ‘বনবাসে বেদের মেয়ে জোছনা’, আলমগীর কুমকুমের ‘জেলের মেয়ে রোশনী’, কাজী মোরশেদের ‘প্রেম যমুনা’, মতিউর রহমানের ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘মোহনমালা’, জীবন রহমানের ‘গহর বাদশা বানেছা পরী’, শফিউল আজমের ‘বিষের বাঁশী’, মতিন রহমানের ‘চাঁদকুমারী চাষার ছেলে’, এম এ খানের ‘মধু পূর্ণিমা’, এম এ কাশেমের ‘বাহরাম বাদশা’ এবং বি এইচ নিশানের ‘রাজারানী’।
পরিচালক এ কে সোহেল ও মৌসুমী
এ ধারার সর্বশেষ সফল চলচ্চিত্র ‘খায়রুন সুন্দরী’। ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে। ছবিটি নির্মাণ করেন এ কে সোহেল। ছবিটি জামালপুরের এক বেদনাবিধুর কাহিনি থেকে নির্মিত, সেই বছরে ‘খায়রুন সুন্দরী’ সেরা ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হিসেবে উঠে এসেছিল। সবকটি গানও ছিল দারুণ জনপ্রিয়, গ্রাম-গঞ্জ, হাটে-বাজারে সব জায়গাতেই শোনা যেত বিখ্যাত গান ‘খায়রুন লো, তোর লম্বা মাথার কেশ, চিরল দাঁতের হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ, খায়রুন লো’। প্রধান চরিত্র খায়রুনের ভূমিকায় অভিনয় করেন মৌসুমী, নায়ক ছিলেন ফেরদৌস, এছাড়াও অভিনয় করেন দিলদার ও এটি এম শামসুজ্জামান। খায়রুনরূপী মৌসুমীর রূপ সঙ্গে ছবির করুণ কাহিনি আর পাগল করা সব গানে ছবিটি দেখতে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল দেশের সব হলে। তবে ছবিটির মূল দর্শক ছিল নারীরা। সে সময় বেশ বন্যাও বয়ে যাচ্ছিল বিভিন্ন জেলায়, তারপরও নারীরা নৌকা, কলার ভেলা, কোমর পানি পাড়ি দিয়েও সিনেমা হলে হাজির হয়েছেন। বন্যাও আটকাতে পারেনি ‘খায়রুন সুন্দরী’র দর্শকদের, শতকরা ৬০-৭০% নারীদর্শকের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল হলগুলোতে। এমনও শোনা গেছে, নারীদর্শকের ভিড় সামলাতে না পেরে শেরপুরের ‘কাকলী’ সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ নাকি শুধুমাত্র নারীদর্শকদের জন্য শোয়ের ব্যবস্থা করেছিল, যেন বানের পানি আর নারীদের চোখের পানিতে ভাসছিল ‘খায়রুন সুন্দরী’।

যখন এই রকম লোককাহিনি নিয়ে সিনেমা তেমন একটা হচ্ছিল না, ঠিক সেই সময় নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম বড়ো পর্দায় নিয়ে আসেন ৪০০ বছর আগের লোকগল্প ‘কাজলরেখা’। ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে ছবিটি ঈদে মুক্তি দেওয়া হয়। ছবিটি মূলত মিউজিক্যাল ঘরানার ফিল্ম। এখানে ২৫টির মতো গান রয়েছে। এই গান দুই বছর ধরে সংগ্রহ করা। গানগুলোর সুরের ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন কফিল আহমেদ। দুই বছর মিউজিক নিয়ে ইমন চৌধুরী কাজ করেছেন। কিছু গান পরিচালক নিজেও লিখেছেন।
২০১৯-২০ অর্থবছরে সরবারি অনুদানের অর্থে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যের হিরন্ময় স্মারক ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত।
ময়মনসিংহ জেলা, বিশেষ করে গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রবাহিত হাওড়াঞ্চলের জীবনের ১০টি পালা দিয়ে সাজানো হয়েছে এ গীতিকা। এই গীতিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য।
৪০০ বছর আগের ‘ময়মনসিং গীতিকা’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মন্দিরা চক্রবর্তী, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, সাদিয়া আয়মান, শরীফুল রাজ, খায়রুল বাসার, গাউসুল আলম শাওনসহ আরও অনেকে।
একসময়ের এই ফোক-ফ্যান্টাসি লোককাহিনি নির্ভর ছবিগুলো হল থেকে মানুষদের মনের ভেতর রং মাখিয়ে দিয়েছিল, বহু মানুষের ভালো লাগার ভালোবাসার নাম হয়ে উঠেছিল। আজ আর রাখালের বাঁশির সুরে কোনো রাজকন্যার ঘুম হারাম হয় না, রাতের উঠোনে বসে না জারি-সারি-পালাগানের আসর, হলের বিশাল পর্দায় আর ভেসে ওঠে না, কোনো ফোক-ফ্যান্টাসি ছবির চলমান চিত্র। আধুনিকতায় অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়, তারপরও লোককাহিনির সেইসব চলচ্চিত্র বন্দি থাকবে যুগ থেকে যুগান্তরে মানুষের মনের পাতায়! হ