হীরামন-কথন

22 Apr 2025, 03:01 PM আকাশলীনা শেয়ার:
হীরামন-কথন


‘হীরামন’ স্থানীয় প্রজাতির পাখি। এদের একাকী কিংবা জোড়ায় দেখা যায়। এর রূপ মনোহরণকারী। দেখতে অনেকটাই ‘লালমাথা টিয়া’র মতো। পুরুষ পাখির চেহারা আকর্ষণীয়। সে তুলনায় স্ত্রী পাখি কিছুটা নিষ্প্রভ। স্ত্রী-পুরুষ পাখির চেহারায় পার্থক্য আছে। পুরুষ পাখির কপাল, মাথা গোলাপি, মাথার পেছনের দিক ফ্যাকাসে নীল। ঘাড়ে কালো বলয়। পিঠ হলুদাভ সবুজ। ডানা সবুজ। ডানার গোড়ায় খয়েরি-লাল পট্টি। নীলাভ-সবুজ লম্বা লেজ। তারমধ্যে সবচেয়ে লম্বা পালকের প্রান্তরটি সাদাটে। দেহতল হলুদাভ-সবুজ। উপরের ঠোঁট ফিকে কমলা-হলুদ, নিচের ঠোঁট বাদামি। উভয়ের চোখের তারা হলুদাভ। অন্যদিকে স্ত্রী পাখির ধূসরাভ-নীল মাথা। ঘাড়ে কালো বলয় নেই। ঘাড়ের শেষ ভাগের বন্ধনী হলুদাভ-সবুজ। ঠোঁট ভুট্টার রঙের মতো। প্রধান খাবার শস্যবীজ, ছোটো ফল, ফুলের পাপড়ি। পোষা পাখি বাদাম এবং দুধ-ভাত খায়। প্রজনন মৌসুম জুলাই থেকে আগস্ট। গাছের প্রাকৃতিক কোটরে বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে ৪-৫টি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ২২-২৪ দিন। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান টিয়া পাখির নিরাপদ আবাস।

বাংলাদেশে প্রচলিত লোককাহিনিতে ‘হীরামন’ পাখি এক বিশেষ চরিত্র- ‘শুকপাখি’ নামে গল্পে তার অবস্থান। এই পাখি ভবিষ্যৎ বলতে পারে। প্রচুর মূল্যে সওদাগরেরা ‘হীরামন’ কিনে পুষতেন আর নিজেদের ভবিষ্যৎ জানতে চাইতেন।

গত শতকের আট ও নয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিমনে ‘হীরামন’ শিরোনামে লোকজ গল্পের নাট্যরূপ প্রচারিত হতো। সে-সময়ে এই ধারাবাহিক বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। রূপবান, ডালিমকুমার, কাজলরেখা-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোককাহিনি ও লোকগাথা অবলম্বনে নির্মিত হতো এর প্রতিটি পর্ব। সে-সময় ‘হীরামন’-এ অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন অনেক শিল্পী। মাঝে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ‘হীরামন’।

বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ টেলিভিশন পুনরায় ‘হীরামন’ নির্মাণ ও প্রচার করতে শুরু করে।, আধুনিক ভার্চুয়াল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে নবপর্যায়ের ‘হীরামন’। প্রথম পর্যায়ে দুটি গল্প নিয়ে ২৬ পর্ব নির্মিত হয়েছিল। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ রূপকথার গল্পগুলোকে পুনরায় মানুষের সামনে নিয়ে আসতেই বিটিভি কর্তৃপক্ষ এমন উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পর্যায়ে ‘রূপবান’ গল্পে অভিনয় করছেন নাইরুজ সিফাত, ইমতু রাতিশ, টুটুল চৌধুরী, কবির টুটুল, ফারজানা মিহি, তুষ্টি ও তপন হাফিজ।

‘ডালিম কুমার’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ২৬ পর্ব। এতে অভিনয় করছেন এন কে মাসুক, সায়েম সামাদ, সামলি আরা সাইকা, শিশির আহমেদ, মীর আহসান, এস ডি তন্ময়, তাসনিম নিশাত ও শীলা। গল্পগুলোকে নাট্যরূপ দিয়েছেন ফজলুল করিম, এস এম সালাহউদ্দিন, বেলাল হোসেন ও শুভাশীষ দত্ত।

বাঙালির জীবনে ‘হীরামন’ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রতিজন বাঙালি মনে মনে একটি করে ‘হীরামন’ পাখি পোষে- আর আশা করে তার ভাগ্য বদল করতে ‘হীরামন’ বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। কেননা, লোকজ কাহিনিগুলোতে ‘হীরামন’ পাখির কথা শুনে গল্পের প্রধান চরিত্রের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়তে দেখা যায়Ñ ‘হীরামন’ সমাধান করে দেয় নানান জটিল সমস্যারও।

বাঙালি সমাজে ‘হীরামন’-এর প্রভাব এতই বিস্তৃত যে, কবি জসীমউদ্দীন তাঁর একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছেন ‘হীরামন’। সেই বইয়ের প্রথম কবিতা ‘আমার বাড়ি’। তার কয়েকটি চরণ এখানে উদ্ধৃত করা হলো :

আমার বাড়ি যাইও ভোমর,

বসতে দেব পিঁড়ে,

জলপান যে করতে দেব

শালি ধানের চিঁড়ে।

শালি ধানের চিঁড়ে দেব,

বিন্নি ধানের খই,

বাড়ির গাছের কবরী কলা,

গামছা-বাঁধা দই।

আম-কাঁঠালের বনের ধারে

শয়ো আঁচল পাতি,

গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস

করব সারা রাতি।...


তুখোড় অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু- অভিনয়ের পাশাপাশি দারুণ গানও করেন তিনিÑ বিশেষত. লোকজ গান তার কণ্ঠে দারুণ বাক্সময় হয়ে ওঠে। ‘হীরামন পাখি’ শিরোনামে তিনি একটি গান করেছেন। সেই গানের কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করা হলো :

ওরে বিলের জলে চান্দের আলো করে ঝিকিমিকি

নিশীথে আসিয়া তুই করিস ডাকাডাকি

হীরামন পাখিরে তুই, হীরামন পাখি...

হীরামন পাখিরে তুই, হীরামন পাখি...

তোর আশায় আশায় আমি পন্থ চাইয়া থাকি

তোর আশায় আশায় আমি পন্থ চাইয়া থাকি।


বাংলা লোককাহিনিতে ‘হীরামন’ আশা-ভরসা ও আকাক্সক্ষা পূরণের এক প্রতীকী নাম। একটি করে হীরামন বাস করে সকল বাঙালির মনে।

আনন্দভুবন ডেস্ক

ছবি : প্রথম আলো, সংগ্রহ