পলি ও রাবিন একে অপরের ছন্দ হয়ে বাঁচতে চান

22 Feb 2026, 03:14 PM আবৃত্তি শেয়ার:
পলি ও রাবিন একে অপরের ছন্দ হয়ে বাঁচতে চান



সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘আবৃত্তি দম্পতি’ হিসেবে পলি ও রাবিন পরিচিত নাম। তাদের পরিচয়ের সূত্রপাত হয়েছিল সেই ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে, রমনা বটমূলে এক পয়লা বৈশাখের ভিড়ে। সেই যে ভিড় ঠেলে হাত ধরা, সেই হাত আজও একে অপরের পরিপূরক হয়ে আছেÑ কখনো মঞ্চে কবিতার ছন্দে, কখনো জীবনের কঠিন বাস্তবতায়। তাদের দীর্ঘ দুই দশকের পথচলা, শিল্পচর্চা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গল্প উঠে এসেছে আনন্দভুবনের সঙ্গে এই বিশেষ আলাপচারিতায়। লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


আবৃত্তির হাতেখড়ি

পলির বেড়ে ওঠা পূর্ব-বাসাবো কদমতলা এলাকায়। শৈশবেই তিনি যুক্ত হন ‘চাঁদেরহাট’ নামক শিশু-কিশোর সংগঠনের সাথে। প্রয়াত রফিকুল ইসলাম দাদুভাইয়ের তত্ত্বাধানে সেখানে নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি আর বাদ্যযন্ত্রের এক মহোৎসব চলত। পলি স্মৃতিচারণ করেন, ‘তখন এককভাবে নয়, আমরা দলগতভাবে পারফর্ম করতাম। বৈশাখি মেলা বা পাড়া-মহল্লার অনুষ্ঠানে দলবেঁধে যেতাম।’

পলির জন্ম ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে। সেই সময়ে পাড়া-মহল্লায় হারমোনিয়ামের রেওয়াজ আর সাংস্কৃতিক চর্চার যে আবহ ছিল, সেটাই তার মনের ভেতরে শিল্পের বীজ বুনে দিয়েছিল।

অন্যদিকে, রাবিনের জন্ম ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে, শৈশব কেটেছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে। মফস্বল শহরে সাংগঠনিক আবৃত্তির সুযোগ তখন সীমিত ছিল। কর্মজীবনে ডেনিডার একটি প্রজেক্টে ব্যস্ত থাকার কারণে ইচ্ছা থাকলেও শুরুতে ছন্দে ফেরা হয়নি তার। কিন্তু ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে পলির আগ্রহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠন ‘স্বরকল্পন আবৃত্তি চক্রে’ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাবিনের জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হয়। রাবিনের সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি ছিল। মজার ব্যাপার হলো, রাবিনের আবৃত্তিতে যুক্ত হওয়া ছিল মূলত পলির সাথে ছুটির দিনটিতে [শুক্রবার] একটু বাড়তি সময় কাটানোর অছিলায়। কিন্তু সেই ‘একসাথে সময় কাটানো’র আগ্রহই একসময় শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায় রূপ নেয়।


একটি বৈশাখি সকাল এবং বন্ধুত্ব

পলি এবং রাবিনের পরিচয়ের গল্পটা কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। ১৪১০ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখ, সোমবার। রমনা বটমূলে তিল ধারণের জায়গা নেই। সেই ভিড়ের মধ্যে পলির বন্ধুদের এক অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন রাবিন ও তার বন্ধুরা। রাবিন বলেন, ‘রমনা রেস্টুরেন্টের পাশের সেই ছোটো সাঁকোটা পার হতে গিয়ে ওরা খুব বিপদে পড়েছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে ওদের সাঁকো পার হওয়ার জন্য জায়গা করে দিয়েছিলাম।

এরপর কথা বললে জানতে পারলাম আমরা একই এলাকায় থাকি। সেই পরিচয় থেকে গড়ায় বন্ধুত্বের আড্ডায়। সময় পেলেই বনশ্রী, মেরাদিয়া আর রমনায় ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের এক বিশাল বন্ধু সার্কেল ছিল। সেই সার্কেলে পলিদের দল ছিল ১৮ জনের, আর আমরা ছিলাম মাত্র তিন জন। পলির বাবা-মায়ের প্রশ্রয়ে তাদের বাড়িতেই চলত সব রিহার্সাল আর আড্ডা, একইসাথে দীর্ঘ ২৩ বছরের গভীর বন্ধুত্বের পথচলা।’

আবৃত্তির মঞ্চে জীবনের রসায়ন

আবৃত্তির মঞ্চে পলির শুরুটা হয়েছিল ‘জীবনের হিসাব’ কবিতাটি দিয়ে। আর রাবিন ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সাংগঠনিক মঞ্চে আবৃত্তি করেন রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ্ রচিত কালজয়ী কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’। তারা বিশ্বাস করেন, কবিতা কেবল শব্দপ্রক্ষেপণ নয়, এটি জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

পলির ভাষায়, ‘সবকিছু আসলে জীবনের কথাই বলে। আমি হয়তো ছবি আঁকতে পারি না, কিন্তু একটি পেইন্টিং দেখে তার ভাবটা যখন অনুভব করি, সেখানেও জীবন খুঁজে পাই। আবৃত্তির ক্ষেত্রেও তা-ই। মানুষের কথাগুলোই কবিরা লেখেন, যা আমাদের কারো-না-কারো জীবনের সাথে মিলে যায়।’

পলি ভালোবাসেন জাগরণ আর প্রতিবাদের কবিতা, যা মনন তৈরি করতে ও ইতিবাচক বার্তা দিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে রাবিনের ভালোলাগা জুড়ে আছে প্রকৃতি। বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রতি তার এক অদম্য টান তৈরি হয়েছে। রাবিন বলেন, ‘প্রকৃতিতে যেমন প্রেম আছে, তেমনি আছে গভীর জীবনবোধ।’


ভালোবাসা : বিলাসিতা নয়, মানসিক প্রশান্তি

ভালোবাসাদিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ নিয়ে এই দম্পতির ভাবনা একটু ভিন্ন রকমের। তারা বিশ্বাস করেন, ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই। পলি জানান, ছাত্রজীবনে কার্ড বা উপহার দেওয়া-নেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এখন তাদের কাছে পরিবারই মুখ্য। বিশেষ দিনে তারা বাবা-মায়ের সাথেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

পলির কাছে সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো রাবিনের মানসিক ও আর্থিক সমর্থন। তিনি যখন সিদ্ধান্ত নিলেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে কেবল আবৃত্তি আর কণ্ঠস্বর নিয়ে কাজ করবেন, তখন রাবিন একবাক্যে সায় দিয়েছিলেন। পলি আবেগী কণ্ঠে বলেন, ‘আমি চাকরি ছেড়েছি আবৃত্তি করতে গিয়ে। রাবিন তখন বলেছিল- তুমি কণ্ঠস্বরের কাজগুলো চালিয়ে যাও, আমি তোমার সাথে আছি। এই মানসিক সহযোগিতা আমার কাছে সেরা উপহার।’

রাবিনের কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞার্থ খুব স্বচ্ছ- পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বিশ্বাস অক্ষুণœ রেখে একে অপরকে তার নিজের মতো বাঁচতে সহযোগিতা করা। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে পলির দেওয়া একটি উপহার ক্রিস্টালের শো-পিস আজও সযতেœ রেখে দিয়েছেন রাবিন।


আবৃত্তির বাইরের জীবন

রাবিন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েতে প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন। পলি যুক্ত আছেন কণ্ঠস্বরভিত্তিক নানা পেশায়। সংবাদ উপস্থাপনার ক্লাস নেন, নিজেও সংবাদ পড়েন। উপস্থাপনা, ডাবিং, ভয়েস ওভারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।


বর্তমান ও আগামীর পথচলা

বর্তমানে পলি-রাবিন আবৃত্তি-অঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় ‘যুগল’। স্বতন্ত্র পরিচয়ের পাশাপাশি দর্শকেরা তাদের একসাথে মঞ্চে দেখতে মুখিয়ে থাকেন। সুযোগ ও সময় মিলে যাওয়ায় মাদারীপুরের ‘ধৈবত আবৃত্তি ভূমি’, পাবনার ‘বাচনশৈলী’ ও চট্টগ্রামের ‘বোধন’-এর মতো সংগঠনের আমন্ত্রণে যুগল আবৃত্তি নিয়ে আবৃত্তিপ্রেমী দর্শকশ্রোতার সামনে হাজির হয়েছিলেন। জীবনানন্দ দাশের ‘অন্ধকার’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অনন্ত প্রেম’ কিংবা হুমায়ুন আজাদের ‘খোকনের সানগ্লাস’ কবিতায় তাদের কণ্ঠে উঠে আসে বিরহ, প্রেম আর দ্রোহের আখ্যান।

পলি ও রাবিন কেবল আবৃত্তিতেই নয়, যাপিত জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাইয়ে একে অপরের ছন্দ হয়ে বাঁচতে চান। তাদের কাছে শিল্প মানে কেবল মঞ্চ নয়, শিল্প মানে একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতা।