অদ্ভুত আঁধার এক : ঝর্না রহমান

11 Mar 2026, 02:09 PM সাহিত্যভুবন শেয়ার:
অদ্ভুত আঁধার এক : ঝর্না রহমান

ঢেউ তোলা ডিজাইনের দেয়ালটি চোখে পড়তেই একটু নড়েচড়ে বসি। এবার ইউটার্ন নিয়ে দেয়ালটি বাঁয়ে রেখে খানিকটা এগিয়ে গেলেই বাহার কনফেকশনারি। ওই দোকান ঘেঁসে গলিটায় ঢুকে যেতে হবে। আমি যাবো স্বনামধন্য লেখক কোহিনূর জামানের বাসায়।

বাহার কনফেকশনারির বাটার টোস্ট খুব ভালো। আগে এ রাস্তায় এলে ওই দোকান থেকে এক-দু প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে নিতাম। বহুদিন আসা হয় না। এখন কেমন, কে জানে।

কোহিনূর আপার বাসার জন্য আমি একবাক্শো ফ্রেশ শনপাপড়ি নিয়েছি। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের শন পাপড়িটা আমার খুব পছন্দ। কোহিনূর আপা হয়তো মিষ্টি খাবেন না। হয়তো কেন, সাতাত্তর বছরের একজন মানুষের খাওয়াদাওয়া খুব সংযত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাও নিয়েছি। তিনি না-খান বাসার লোকজন খাবে। আমি এটা টোকেন মিষ্টি হিসেবে নিয়েছি। সম্প্রতি আমার সন্তানতুল্য ছোটকাগজ ‘বহুমাত্রিক’-এর ঝুলিতে মোটামুটি ভালো মানের একটা সম্মাননা জুটেছে।

কোহিনূর আপা বহুমাত্রিক লিটল ম্যাগ-এর একজন সম্মানিত উপদেষ্টা। শুধু লিটল ম্যাগ নয়, তিনি আমারও এবং আমার মতো অনেক নারীর, যারা লেখালিখির জগতে আছেন, তাদের উপদেষ্টা। তরুণ নারী লেখক-সম্পাদক অনেকই তাঁকে মেন্টর জ্ঞান করেন। অপ্রতিষ্ঠিত, অনামা, লেখক-হতে-চাওয়া কেউ তাঁর পরামর্শ চাইলে তিনি সাধ্যমতো করেন। যারা বড়ো লেখক হয়ে ওঠেন, তাঁদের মধ্যে অনুজ লেখকদের প্রতি যে অবজ্ঞা উপেক্ষা থাকে কোহিনূর আপার মধ্যে তা খুব কমই আছে। তবে, কারো মধ্যে লেখালিখির মেধা না-থাকলে তাঁকে মুখের ওপর বলে দিতেও তিনি ছাড়েন না। সোজা বলেন, আপনাকে দিয়ে সাহিত্য হবে না। আগে বাংলা পড়েন, ভাষা শেখেন, শব্দভান্ডার বাড়ান, ভালো ভালো বই পড়েন, তারপর লেখার চেষ্টা করেন। একবার একজন ক্ষমতাবানের গরবিনী স্ত্রীকে কোহিনূর আপার চাঁছাছোলা মন্তব্য হজম করার পর আড়ালে বলতে শুনেছি, কী আমার ‘ল্যাখক’ রে, দুনিয়ার হাবিজাবি দিয়ে পাতা ভরিয়ে মোটা মোটা বই বের করে মনে করছে নোবেল প্রাইজ পেয়ে যাবে!

তবে, যাদের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেন তাদের সুযোগ পেলে তুলে ধরতে কোহিনূর আপার ঔদার্য প্রশংসনীয়। আমি একবার একটা সাহিত্য ম্যাগাজিনে কোহিনূর জামানের লেখা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন-বিষয়ক প্রবন্ধ পড়ে মুগ্ধ হয়ে, সাহস করে তাঁকে প্রথমবারের মতো ফোন করেছিলাম। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনি ফোন ধরেছিলেন। আমার নামপরিচয় দেওয়ার পর তিনি আমাকে আরেকবার বিস্মিত করে বলেছিলেন, আপনাকে তো চিনি! লেখা পড়েছি পত্রিকায়। তখন এনালগ ফোনের যুগ। টেলিফোনে আপার কথাগুলো মনে হচ্ছিল সোনার তারে ঝংকার তোলা গান। কী মিষ্টি বাচ্চাদের মতো গলা! মুগ্ধতা, আনন্দের উচ্ছ্বাস দমন করে আমি তাঁর লেখার প্রশংসা করি। রোকেয়া প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বইটির কথা চলে আসে। আমি ফস করে বলে ফেললাম, বেগম রোকেয়া আমাদের জুল ভার্ন। এমন সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, যা তখন সাধারণ মানুষ থাক দূরের কথা, লেখকদেরও কল্পনার অতীত ছিল। খুশির ধাক্কায় এত কথা বলে আমি যখন একটু ভয়ে ভয়ে থামলাম, আপা বললেন, ঠিক বলেছেন। নারীমুক্তি নারীশিক্ষা করে করে তাঁর বিজ্ঞানচিন্তা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। ঝরঝর করে কথা বলে গেলেন কোহিনূর আপা। পরে হিসাব করে দেখেছিলাম আঠারো মিনিট। সেই থেকে কোহিনূর জামান আমার প্রিয় আপা হয়ে ওঠেন। তিনি আমাকে উপদেশ দেন, আমি তাঁর পরামর্শ চাই। এমনই চলে।

নানা কাজে তাঁর বাসায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি। অফিসে গিয়েছি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে সুযোগ খুঁজে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। আমিও দু-একবার তাঁকে সাহিত্য অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি করে নিয়ে এসেছি। তবে, তিনি থাকেন ভীষণ ব্যস্ত। সহজে দেখা করার সময় দিতে পারেন না। আমারও ব্যস্ত জীবন। বহুদিন কোহিনূর আপার বাসায় যাওয়া হয়নি। অবশ্য এই না-যাওয়ার পেছনে কারণও আছে। আচমকা সময়টা বদলে গেল। অন্ধকার গর্তে লুকিয়ে থাকা অপশক্তি নখদন্ত বিস্তার করে বেরিয়ে এলো। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শান্তি-সংহতি-সম্প্রীতি সবকিছুর ওপর আঘাত এলো। জীবনের চেনা দৃশ্যগুলোকে শকুনের ছায়া শেয়ালের কায়া এসে ঢেকে দিচ্ছিল।

শেষ কবে কোহিনূর আপার বাসায় গিয়েছি মনে মনে হিসাব করে নিলাম। পাক্কা দুই বছর। এ দুই বছর শহর যেন থমকে আছে অথবা বলা যায়, শহর যেন বিশাল কড়াইয়ে তপ্ত বালুতে চিনাবাদামের মতো নেড়েচেড়ে ভাজা হচ্ছে।

দেয়ালের গ্রাফিতিগুলো এতদিনে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। ধুলোবালি কাদায় দেয়ালের চেহারাও যাচ্ছেতাই। তাতে করে একটা সুবিধা হয়েছে, কুৎসিত গালি, কদর্য কার্টুন আর নোংরা মন্তব্যগুলো কিছুটা ঢেকে গেছে। সুন্দর সুন্দর তাৎপর্যপূর্ণ ছবি, প্রতীকী কার্টুন আর ভালো ভালো উক্তি বা স্লোগান দিয়ে করা গ্রাফিতিগুলো আমার বেশ লাগে। নতুন অবস্থায় রাস্তায় চলতে গেলে আমি পছন্দের স্লোগানগুলো নোট করতাম। ওসব নিয়ে একটা লেখা লিখবো বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু, পরে উদ্যম হারিয়ে গেছে। তবে, চোখে পড়লে এখনও আমি ভালো চিত্র, ভালো স্লোগান, তাৎপর্যপূর্ণ বাণী দেখে খুশি হই। প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি। ওরা কি ‘মহৎ সত্য বা রীতি’কে স্বাভাবিক বলে মনে করবে? শকুন ও শেয়ালের থাবা থেকে দূরে থাকবে, সংরক্ষণ করবে তরতাজা তরুণ হৃদয়?

এখন গাড়ির গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেয়ালের প্রত্যেক ব্লকের স্লোগান বা উদ্ধৃতি পড়ে শেষ করা গেল না, ফুড়ুৎ করে দেয়াল শেষ হয়ে গেল।

গলির দিকে গাড়ি মাথা ঘুরিয়ে দিতেই মনে হয় এমন চিপা গলি দিয়ে গাড়ি যাবে তো! চালক জয়নাল আমার সন্দেহকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলে, আমিই তো আপনেরে লইয়া ওই বাসায় আরও দুই না তিনবার আইছি। ওই যে ‘ল্যাখক’ কুহিনূর না কী নাম সেই খালাম্মার বাসা না? শেষবার আসছিলাম আন্দোলনের আগে দিয়া।

আমি নিশ্চিন্তে বসি। জয়নাল কোনো ঠিকানা বা লোকজনের পরিচয় মনে রাখার ব্যাপারে একেবারে জিনিয়াস।

অ্যাওয়ার্ড ক্রেস্টসহ জিনিসপত্র গুছিয়ে নিই। নামতে হবে।

আড়াইটার মতো বাজে। কিন্তু সূর্য একটুকুও চুপসায়নি। কড়া রোদে ভাজা ভাজা হচ্ছে শহর। মনে হচ্ছে এক ক্রুদ্ধ বয়লার ম্যান চুল্লিতে অঙ্গার উসকে দিচ্ছে। ক্রোধ এখন জাতীয় প্রকৃতি। সবকিছু যেন ক্রোধে লাভার মতো ফুটছে। যখন তখন তার উদগীরণ ঘটছে। শুধু শহর নয়, দেশও নয়, গোটা বিশ্বই এখন চুলায় আগুন ঠেলছে। গাড়ির কাচের ভেতর দিয়ে সূর্যতাপ গায়ে ততটা না-লাগলেও ঝলসে দিচ্ছে চোখ। আমি চোখ বন্ধ করে বসি।

কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে! দড়াম করে পেছন থেকে এক ধাক্কা খেয়ে আমার হেলানো মাথাটা ফুটবলের মতো লাফিয়ে ওঠে। পেছনে আর একটা গাড়ি। ওর ড্রাইভার যেন এক বয়লারম্যান। সে ধাক্কা দিয়েছে আবার খিস্তিও করছে। জয়নালই নাকি গাড়ি মোড় ঘোরাতে গিয়ে রাস্তা আটকে দিয়েছে। বচসা চলে। তর্ক বিতর্কের এক ফাঁকে আমি পোটলাপাটলি হাতে নেমে পড়ি। ওরা দুই মোরগের লড়াই চালাক।

বনবাণী। লোহার ফটকের একপাশে ছোটো একটি শ্বেতপাথরে বাড়ির নাম। পাথরটির ওপরে কেউ কালো রং স্প্রে করে দিয়েছে। এর সঙ্গে ক্রোধের সম্পর্ক কোথায়, ভাবতে গিয়ে উল্টো পাশের দেয়ালে চোখ পড়ে। মুহূর্তেই বুঝে যাই, স্প্রে করনেওয়ালা মূর্খ নয়। পাশের দেয়ালে একটি চমৎকার টেরাকোটা, যেখানে রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষরের ধরনের ফন্টে উৎকীর্ণ ছিল দুটি লাইন, ‘অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান/ প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদি প্রাণ।’ এক কোনায় কবির মুখাবয়বের একটি ছোটো প্রতিকিৃতি। নান্দনিক এই শিল্পকর্মটি আমার খুব ভালো লাগতো। যতবার এখানে এসেছি, কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে শিল্পকর্মটি দেখেছি। মন ভালো হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন দেখছি, ক্রোধের নিষ্ঠুর আক্রোশ থেকে এটিও রেহাই পায়নি। কেউ ধারালো কোনো কিছু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে লেখাগুলোকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। ক্ষতবিক্ষত করেছে কবির ঋষিপ্রতিম চেহারা। টেরাকোটাটির অবস্থা দেখে আজ আর আমি থমকে দাঁড়াই না। ভাঙনের দানব এখন সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সহস্র ধ্বংসের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে মুমূর্ষু পড়ে আছে দেশের মানচিত্র।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সেই বন্য গন্ধটি পেলাম। গাছপালা লতাগুল্মের একটি ঘনিষ্ঠ জড়াজড়ির গন্ধ। যথার্থ নামকরণ করা হয়েছিল বাড়িটির। হয়তো কোহিনূর আপাই এ নাম দিয়েছিলেন। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তিনি তাঁর লেখায় নানাভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘কাঁঠালিচাঁপার কণ্ঠস্বর’ নামের তাঁর উপন্যাসটি কয়েকটা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যও আছে। বনবাণীর কবিকে নিয়েও আছে তাঁর জীবনী উপন্যাস।

বাড়ির পেছনে গাছপালার একটা ঘন জঙ্গল। যত্ন নেওয়া হয় না বোধ হয় অনেকদিন। দলে দলে লতাগুল্ম বেরিয়ে এসে দেয়াল ধরে ঝুলছে। বারান্দার গ্রিলগুলোতে পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্ল্যান্ট আর কার্টেন প্লান্টের লতাগুলো মলিন হয়ে আছে। বারান্দায় একটা গ্রিলের দরজা। তাতে ভেতর থেকে তালা লাগানো। ভেতরটা অন্ধকার। প্রথমবার বেল টিপে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেউ এলো না। আরও দুবার দিলাম। ভেতরে বেলের শব্দ পাচ্ছি কিন্তু মানুষের সাড়াশব্দ নেই।

ধৈর্য ধর মন, বলে শান্ত হয়ে আমি অপেক্ষা করি। কোহিনূর আপার শরীর তেমন ভালো না বলেই শুনেছিলাম। যদিও তাঁর সঙ্গে আজ যখন ফোনে যোগাযোগ করছিলাম তখন তাঁর কণ্ঠে অসুস্থতার কোনো রেশ পাইনি। এই বয়সেও তাঁর গলার স্বর কিশোরীসুলভ পাতলা। কথা বললে শব্দে ধ্বনির কম্পন ওঠে। আমি আসতে চাই শুনে বলেছিলেন, আমি তো এখন লাঞ্চ করবো!

আমি আশ্বাস দিয়ে বলেছি আমার আসতে কমপক্ষে একঘণ্টা লাগবে। আপনি খেয়ে নিন।

‘বাংলাদেশ লিটারেচার অ্যান্ড কালচারাল ইনস্টিটিউট’-এর চেয়ারপারসন পদ থেকে রিজাইন করার পর তিনি অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সম্মানীয় সেলিব্রেটির জন্য ওই বাধ্যতামূলক অবসর নিশ্চয়ই সুখকর ছিল না। তবে, যে-কথাটি কোনো পত্রপত্রিকায় না-এলেও সবাই জানে, সেটি হলো চাকরি ছাড়ার পরেও কোহিনূর জামানকে কয়েকবার ডিবি-র জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে তাঁর চলাফেরা। শঙ্কা, আতঙ্ক, দুর্ভাবনা হতাশায় তাঁর মনোজগতে হয়তো বিশৃঙ্খলা ঘটে গেছে। ক্রমশ বিষণ্নতায় ডুবে গেছেন। তাঁর হাসপাতালে থাকার খবরটা অবশ্য পত্রিকায় নিউজ হয়েছে। বলা হয়েছে, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা। ডিমেনশিয়া। ইনস্টিটিউট ছেড়ে দেওয়ার পরে তাই কোহিনূর আপাকে কোথাও দেখাও যায়নি বা তাঁর সঙ্গে আমার দেখা করাও হয়ে ওঠেনি।

তিনি কি এখন ভাতঘুমে ? হতেও পারে। এখন তাঁর অখণ্ড অবসর। অফিসিয়াল দায়িত্ব নেই, মিডিয়া বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানেও এখন তাঁর উপস্থিতি নেই। এই ঠা ঠা দুপুরে তিনি হয়তো লেখার টেবিলেও বসেন না। একটু ঘুমুলেই ভালো। টেলিফোনে কথা হওয়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার পড়ে না।

তবে বেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ। বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট অপেক্ষাও দীর্ঘ সময়।

কেউ কেউ সাক্ষাৎপ্রার্থীকে অপেক্ষা করাতে একধরনের আনন্দ পান। বিশেষ করে ক্ষমতাবান আমলারা। কামলারাও সুযোগ পেলে এই সুখ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। একবার এক খ্যাতনামা পত্রিকার এক বাছুর সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সূচিতে দেখা করতে যাওয়ার পর আমাকে একঘণ্টার বেশি বসিয়ে রেখেছিলেন। পরে রঙ্গভরা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, কাউকে অপেক্ষা করাতে আমার ভালো লাগে। সে অবশ্য অনেক আগের ঘটনা। আমি তখন সদ্য উদীয়মান লেখক। পত্রিকার লোকজন বড়ো নমস্য। তারা প্রায় বিধাতা। তাই তেতো হাসি হেসে সম্পাদকের অপমানটা হজম করেছিলাম। কিন্তু এত বছর পরে সেই রামও নেই সেই অযোধ্যাও নেই। আমার বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে। ওইরকম গোঁয়ার বাছুরের লেজ মুচড়ে দিতে আমার দুবার ভাবতে হবে না।

কোহিনূর আপাকে যতদিন চিনি, তাতে বুঝি, সে-ধরনের মানুষই নন। মুখের ওপর উচিত কথা বলা ছাড়া তিনি অত্যন্ত ভদ্র সুশীল নারী। একজন স্বনামধন্য লেখকের যতটুকু অহংকার মানায় ততটুকুই তাঁর আছে। এ কথা বললাম একটি ঘটনা মনে করে। একবার বইমেলায় আমার সদ্য প্রকাশিত একটি বই আমি কোহিনূর আপার হাতে তুলে দিয়ে সবিনয় অনুরোধ করলাম, পড়বেন প্লিজ। সে-সময় তাঁর বুকের কাছে ধরা ছিল এক গোছা নানা জাতের বই। তাঁকে ঘিরে আছে ভক্তজন। সবাই চায় তাঁকে নিজের লেখা বই দিতে। আলাপসালাপ করে নিজেকে গণ্য করে তুলতে। তখনো তাঁর সঙ্গে আমার সে অর্থে পরিচয় হয়ে ওঠেনি, সামনে বসে কথা বলার মতো নিজেকে যোগ্য মনে করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বইয়ের ভেতরে অনেক শ্রদ্ধা ভালোবাসার বাণীর সঙ্গে ফোন নম্বরও লিখে দিয়েছিলাম। চলে আসতে আসতে অনেক জল্পনা কল্পনা করছিলাম, বইটি পড়ে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে একটা ফোন করবেন। মেলা থেকে বেরুবার আগে আমার বন্ধু শোভার সঙ্গে দেখা। ওর কাছে শুনলাম, কোহিনূর আপার সঙ্গে ওরও দেখা হয়েছিল। তাঁর কাছে অনেকের উপহার দেওয়া বই জমে গিয়েছিল বলে তিনি সে-সব তাঁর প্রকাশনীর স্টলে কর্মচারীর হাতে দিয়ে এক কোনায় রেখে দিতে বলে চলে গেছেন। কর্মচারীকে গোপনে বলে গেছেন, কেউ নিতে চাইলে দিয়ে দিও। এত বই পড়ার সময় আছে নাকি আমার! ঘরেও রাখার জায়গা নেই। শোভা তখন সেখানে উপস্থিত ছিল। যা-ই হোক, সে-যুগ হয়েছে বাসি। তাছাড়া তিনি তো সত্যি কথাই বলেছেন! একজন লেখকের কাছে রামশামযদুমধুদের এত বই পড়ার সময় কোথায়? বই রাখার জায়গাও তো একটা ব্যাপার বটে!

কী করবো বুঝতে পারছি না। আর একবার বেল বাজিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়াই।

ক্লান্ত লাগছে। বাইরে রোদ তামার মতো গনগন করছে। কিন্তু কোহিনূর জামানের বাসার ভেতরে নিশ্চুপ নীরবতা আর অন্ধকার থমকে আছে।

গেটের বাইরে থেকে একজন সবজি বিক্রেতা আমার অবস্থা দেখছিলেন।

এবার তিনি উঠে আসেন। আমাকে বলেন, আফনে খালাম্মার লগে কতা কইয়া আহেন নাই? বুড়া মানুষ, ঘোমাইয়া গ্যাছে গা।

‘আমি কথা বলেই এসেছি’, শুনে তিনি গ্রিলের ফাঁকে হাত ঢুিকয়ে ভেতরের ছিটকিনিটা খুলে দেন। আমি অবাক হয়ে দেখি তালাটা আসলে হুকের মধ্যে ঝোলানো ছিল। ছিটকিনি এমনিই আংটার ভেতরে টেনে দেওয়া আছে।

যান ভিতরে যান। ভিতরে গেলেই খালাম্মারে পাইবেন। আমি এলাকারই মানুষ। আমার কাছ থন তরকারি কিনে খালাম্মায়। সবজিবিক্রেতা বারান্দায় ওঠার সিঁড়ি থেকে নেমে দাঁড়ান।

বিনা আমন্ত্রণে এভাবে কারো বাড়িতে ঢুকে যাওয়া উচিত হবে কি না ভাবছি। সে মুহূর্তেই ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরের একজন নারী আঁধার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন। সবজিওয়ালা আমাকে নারীটির কাছে পরিচয় করাতে থাকেন, খালাম্মার মেমান। কতক্ষণ ধইরা এই ম্যাডামে রইদে খাড়াইয়া বেল টিপতাসে!

মহিলা আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালে আমি আমার নাম পরিচয় দিয়ে ফোন করে এসেছি, সে-কথাটা বলি। মহিলার মুখের রেখা সহজ হয়। বলে, ও আমিই আপনার ফোনটা প্রথমে ধরছিলাম। আসেন।

শনপাপড়ির বাক্শোটা মহিলার হাতে তুলে দিই।

এক পা ভেতরে দিয়ে আমি একটু থমকে দাঁড়াই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখতে পাই না। গাঢ় অন্ধকার থেকে হঠাৎ তীব্র আলোয় এলে যেমন চোখ ঝলসে যায় তেমনি উজ্জ্বল আলো থেকে ঘন অন্ধকারে এলেও হয়তো চোখই অন্ধ মনে হয়।

সবজিওয়ালা বাইরে থেকে বলেন, লাইটটা জ¦ালান, আন্ধারে ভিতরে যাইবো কেমনে। কোহিনূর আপার বসার ঘরের মানচিত্রটা আমার জানা থাকাতে আমি প্যাসেজ দিয়ে সেদিকে এগোই।

মহিলা ততক্ষণে প্যাসেজের আর ড্রয়িং রুমের সুইচ অন করেছেন। মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়ে। আঁধার তো ঘুচলো, এবার তীব্র হয়ে কানে বাজে নীরবতা। মনে হচ্ছে একটা ভুতুড়ে বাড়িতে এসেছি। জনপ্রাণীর সাড়া নেই। কথাসাহিত্যিকের বাড়িতে কোথাও কোনো কথা নেই। সব স্তব্ধ হয়ে আছে যেন।

মহিলার নাম শাহিদা। তিনি জানান, বাসার সবাই ঘুমে।

সবাই মানে কোহিনূর আপা আর তাঁর স্বামী মো. হালিমুজ্জামান। যতদূর জানি, সন্তানসন্ততি কেউই তাঁর সঙ্গে নেই। মেয়ে মেয়ের সংসারে। দুই ছেলে। দুজনই বিদেশে স্থায়ী। আর হয়তো কাজের লোকজন আছে। তারাও ঘুমে! শাহিদার চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায় তিনিও গভীর ঘুমেই ছিলেন, যে-কারণে দরজা খুলতে এতক্ষণ। আমি একটু দমে যাই। এতদূর থেকে দেখা করতে এলাম, ব্যস্ত জীবনে সময় বের করাও তো কঠিন, আপার সঙ্গে দেখা না-করেই চলে যাবো! শাহিদাকে অনুরোধ করি, একটু দেখেন না, ডাকা যায় কি না। পাঁচ মিনিট কথা বলেই চলে যাবো। দীর্ঘ সময় রোদে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে আমারও ক্লান্ত নিঃশ্বাসের সঙ্গে একটা চাপা হাই বেরিয়ে আসে। শাহিদার বোধ হয় একটু দয়া হয়। আমাকে বসিয়ে ভেতরে যান।

নাতিবৃহৎ বসার ঘর। সোফা, টেবিল-চেয়ার এরকম কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব। একটা কাচের আলমারি ভরতি বিভিন্ন সময়ে কোহিনূর আপার পাওয়া দেশবিদেশের নানা পুরস্কার আর সম্মাননার ছোটোবড়ো ক্রেস্ট। সবই অযত্নে রাখা। ধুলোমলিন। এক-এক তাকে একসাথে গাদাগাদি করে রাখা অনেকগুলো। খেয়াল করে দেখি সোফার কভার টেবিল ক্লথ জানালার পর্দা সবই অনেক পুরোনো। এগুলো দু-বছর আগে এসেও দেখেছি। দেয়ালে ঝোলানো কোহিনূর আপার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার কয়েকটি ফ্রেম বাঁধানো ছবি। সেগুলোও যত্নহীন। কোনোটার ফ্রেম বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে, হালকা মাকড়সার আঁশও দেখা যাচ্ছে একটায়। একজায়গায় দেয়ালে একটা ছবি খুলে ফেলার চিহ্ন। বুঝতে পারি কোন ছবিটা খুলে ফেলা হয়েছে। বিগত সরকার প্রধানের সঙ্গে কোহিনূর আপার ঝলমলে কৃতিত্বোজ্জ্বল একটা ছবি ছিল। এর আগে যে-কবার এসেছি, ছবিটা এখানেই ছিল।

শাহিদা চলে আসেন। ‘খালাম্মায় উঠবো না। সে ঘুমায় নাই। তবে বলছে উঠবো না। শুইয়া থাকবো। আমি আপনের কথা বলছি। তাও কয় উঠবো না।’

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো শাহিদার কথারই পুনরুক্তি করি - উঠবো না!

নাহ। খালাম্মার শরীল ভালো না তো!

তিনি কি অসুস্থ ? আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন তো বুঝতে পারিনি!

ঠিক অসুস্থ না। তবে, খুব একটা কারো সঙ্গে দেখা করতে চান না।

শাহিদার বয়ানে মোটামুটি জেনে নিই তাঁর অবস্থা। কিছু মনে রাখতে পারেন না। মাঝে মাঝে এলোমেলো কথা বলেন। শুয়ে থাকতেই চান বেশি। হয়তো ওষুধের প্রভাবে। তাঁর স্বামীও অসুস্থ। হার্নিয়া পেইন। পায়েরও জোর কমে গেছে। লাঠি ভর করে একটু এঘর-ওঘর করেন। এ ছাড়া শুয়েই থাকেন। দুপুরে খাওয়ার পর তিনি লম্বা সময় ঘুমিয়ে থাকেন।

শাহিদা কোহিনূর আপার কেয়ার গিভার। হালিমুজ্জামানের জন্য একজন যুবক নিযুক্ত আছে। সে আজ বিশেষ কাজে বাইরে গেছে। রাতে বাড়ি ফিরবে।

আপার শোবার ঘর কোন দিকে ? নিশানা জেনে আমি ‘একটু দেখা করে আসি’ বলে শাহিদার অনুমতির অপেক্ষা না করে আপার কক্ষে চলে আসি। শাহিদাও আমার পিছু পিছু আসেন। এ ঘরও পুরো অন্ধকারে ডুবে আছে। তবে এতক্ষণ মৃদু আলোর মধ্যে থেকে অন্ধকার আমার চোখ সওয়া হয়ে উঠেছে। সেই পাতলা অন্ধকারে দুই পা বুকের কাছে নিয়ে খাটের ওপর প্রায় হাঁটুভাঙা হয়ে শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধ নারীকে দেখে আমি চমকে উঠি। ইনি কোহিনূর আপা ? দু’বছরে এ কী অবস্থা হয়েছে তাঁর! সারামাথা সাদা! কোহিনূর আপার চুল ঠিক কোঁকড়ানো নয়, একটু ঢেউ তোলা আর পাতলা। ঢেউগুলো কপালের ওপর দু-তিনটে খিলানের মতো রেখা ফুটিয়ে রাখতো। তাতে তাঁর কপালটি দেখাতো রবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর মতো। আপাকে কালো চুলেই বেশি দেখেছি। কয়েকবছর ধরে ধূসর হয়ে উঠছিল। তাঁর সেই কাঁচাপাকা চুল এখন বালিশের ঘসায় সাদা পাটের আঁশের মতো ফুরফুর করছে। এ ধরনের চুলকে কি শনের নুড়ি বলে? গায়ের ওপর একটা পাতলা কাঁথা। সম্ভবত আড়ংয়ের নকশি কাঁথা। অন্ধকারে তার রূপ বোঝা যাচ্ছে না। কোহিনূর আপা অত্যন্ত রুচিশীল মহিলা। তাঁর সাজপোশাকে রুচি থাকে, আড়ম্বর থাকে না। কিন্তু আজ তাঁর চেহারায় কোনো শ্রী নেই, যত্নের ছাপ নেই। দু-বছরে যেন তাঁর বয়স বিশ বছর বেড়ে গেছে। তিনি ঘুমিয়ে না জেগে আছেন বোঝা যায় না। চোখের খাঁজে দু-চামুচ গাঢ় আঁধার।

আমার পায়ের শব্দ পেয়ে বলে ওঠেন, শাহিদা ?

না আপা। আমি আমার নাম বলে পরিচয় দিই। ‘বহুমাত্রিক’ পত্রিকার কথাও বলি।

কোহিনূর আপা এবার মাথাটা আমার দিকে ফেরান। বলেন, ও, ফাহিমা, তুমি ? তুমি ফোন করেছিলে, না ? কিন্তু আমি তো এখন শুয়ে আছি!

আমি তাড়াতাড়ি বলি, আপনি শুয়েই থাকুন আপা। আমি আপনার সময় নষ্ট করবো না। দু-একটা কথা বলেই চলে যাবো।

আমার কথাগুলো হয়তো কোহিনূর আপা খেয়াল করেন না। তিনি তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো বলতে থাকেন, আমি ঘুমাইনি, বুঝেছো। এমনিই শুয়ে আছি। এ সময় আমি ঘুমাই না। এমনিই একটু শুয়ে আছি... ঘুমোবো না... আমি এখন উঠবো না... আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকবো...।

আমি হাতের ক্রেস্টটি তাঁর দিকে বাড়িয়ে বলি, আপা এটা দেখেন। শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ‘বহুমাত্রিক’। আপনাকে দেখানোর জন্য এনেছি। আপনার সমর্থন...

আচমকা শাহিদা কোহিনূর আপার ঘরের বাতিটা জে¦লে দেন। অমনি তিনি যেন আঁতকে ওঠেন। তীক্ষè কণ্ঠে বলেন, লাইট জ¦ালালো কে ? কে লাইট জ¦ালালো ? কেন আলো জ¦ালালে ? আলো নিবাও। আলো চাই না। লাইট অফ কর। শাহিদা, এই শাহিদা, কে আলো জ¦ালালো... অস্থির হয়ে ওঠেন আপা। ভয় পেয়ে যাই। তাড়াতাড়ি শাহিদাকে আলো নেভাতে বলি। শাহিদা সুইচ অফ করে দেন।

ঘর অন্ধকার হলে কোহিনূর আপা শান্ত হয়ে দু’হাত দুপাশে ছড়িয়ে দেন। পা দুটোও অলস ভঙ্গিতে বিছানায় মেলে দিয়ে আমাকে বলেন, ফাহিমা, কয়টা বাজে? আমি বলি, তিনটা বাজে আপা।

তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসেন কোহিনূর আপা। তিনটা বাজে ? আমি তো ভাত খাইনি! কী আশ্চর্য, এত বেজে গেছে, আমার তো লাঞ্চ করাই হয়নি... খাওয়ার পরে তো ওষুধ খেতে হবে... কী কাণ্ড!

শাহিদা নির্বিকার গলায় বলেন, খাইছেন খালাম্মা। দেড়টার সময় ভাত খাইছেন। ওষুধও খাইছেন। খাইয়াই শুইছেন আপনে।

খেয়েছি ? কই ? নাহ!

হ খালাম্মা, খালু আপনে দুইজনেই একসাথে টেবিলে বইসা খাইছেন। ভুইলা গেছেন।

আপা তবু অস্থির হয়ে ওঠেন। না না খাইনি।

শাহিদা আমাকে ইশারায় কক্ষ ত্যাগ করতে বলেন। ফিসফিস করে বলেন, এমনই করে, ভাত খাইয়া বলে খাই নাই, ওষুধ না-খাইয়া বলে খাইছি। কেউ নাই, শব্দ নাই তবুও হঠাৎ করে বলে, জলদি গেট খোলো, কে যেন এসেছে। মাঝে মাঝে আবার একেবারে সব ঠিকঠাক! খালু বলে, চাকরি ছাড়ার পরে তার জীবনটা হঠাৎ কইরা শান্ত হইয়া গেছে, তাই অসুখটা বাড়ছে। বোঝেন না, দেশেও নানারকম গণ্ডগোল, বাইরেটাইরে যাওয়াযাওয়িও একদম কইমা গেছে। কত বড়ো ‘ল্যাখক’। কত জাগায় যাইত। মানুষজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হইত। কত অনুষ্ঠান, কত কিছু...। বাইরের জীবনটা আছিল তার আলোর জীবন। ঘরের ভিতরে ঢুকলে কি আর বাইরের দুনিয়ার আলো আসে! ঘরে তো অন্ধকার... শাহিদা আপনমনে কথা বলতে বলতে আমার সঙ্গে কোহিনূর আপার কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন।

আলোর জীবনেই তো ছিলেন তিনি! তাঁর পঁচাত্তর বছরের জয়ন্তিতে আমি গিয়েছিলাম। সেটিই আমার কোহিনূর আপার কোনো অনুষ্ঠানে আপাতত শেষ যাওয়া। বিশাল হলে থই থই করছিলেন লেখক কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, প্রকাশক আর ভক্তবৃন্দ। মঞ্চে কোহিনূর জামানের বড়ো একটি ছবি সংবলিত ব্যানার। উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছিল ডিজিটাল ব্যানারের ছবিটি। সে অনুষ্ঠানে কোহিনূর আপার দেশভাগ বিষয়ক উপন্যাস ‘পরান-কাছি’-এর চলচ্চিত্র রূপ প্রদানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। পঁচাত্তর বছর বয়সে কী অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। ঘণ্টাব্যাপী সেই কথামালা শুধু সাংবাদিক নন, উপস্থিত দর্শকের অনেকেই হাত উঁচু করে মোবাইল ধরে সম্পূর্ণ ভিডিও করেছিলেন। তাঁর কথা শুনতে শুনতে দেশভাগের ক্ষত আবার কাঁচা হয়ে উঠছিল অনেক শ্রোতার মনে। জন্মমাটিতে যুগ যুগ ধরে মানুষের ভালোবাসার যে নোঙর গাঁথা, তার কাছিটি বাঁধা তো প্রাণের সঙ্গে! এই কাছিকে টুকরো করে কোনো হতদরিদ্র ভিক্ষুকও ডুবতে রাজি থাকে না। কিন্তু দেশভাগ সেই কাছিকে ছিঁড়ে ফেলেছিল। কোহিনূর আপা কথা বলেন ঝরঝর করে। কোথাও ঠেকেন না, কোনো শব্দ তাঁকে খুঁজতে হয় না। সাজানো মালার মতো তাঁর বক্তব্য। কথা বলার সময় আত্মবিশ্বাসে জ¦লজ¦ল করে তাঁর মুখ। কত কিছু যে শিখি তাঁর কাছে!

সেই কোহিনূর আপা কেমন করে এমন হয়ে গেলেন! এটা কি শুধুই ‘বার্ধক্যজনিত’ সমস্যা ? না কি এক অচেনা অন্ধাকরের ব্যাধি মাকড়সার মতো তাঁকে বেঁধে ফেলেছে! মনটা খারাপ হয়ে যায় আমার। ‘বহুমাত্রিক’-এর সম্মাননা ক্রেস্টটি দেখানো হলো না। বইগুলোও দেওয়া হলো না।

ড্রয়িং রুমে বসে বই দুটোতে কোহিনূর আপার প্রতি শ্রদ্ধাবচন লিখে টেবিলে রেখে আমি উঠবো, এমন সময় দেখি আপা অন্ধকার প্যাসেজে চাঁদে পাওয়া মানুষের মতো এলোমেলো পা ফেলে হাঁটছেন। প্রথমে ভাবলাম, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য তিনি তাহলে উঠে এসেছেন। কিন্তু দু’কদম এগিয়ে এসেই তিনি আবার পেছনে ঘুরে তাঁর শোবার ঘরের দিকে চলে গেলেন।

কোহিনূর আপাকে সবসময় শাড়ি পরাই দেখেছি আমি। এখন দেখলাম তার গায়ে একটা ঢলঢলে ম্যাক্সি। একটি নিঃশব্দ ছায়ার স্তূপের মতো কোহিনূর জামান তাঁর শয়নকক্ষের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যান। হ

লেখক: কথাসাহিত্যিক, কবি

অলংকরণ : আশরাফ হোসেন