অপরাজিতা : ফারহানা মমতাজ

11 Mar 2026, 02:13 PM সাহিত্যভুবন শেয়ার:
অপরাজিতা : ফারহানা মমতাজ


আজকের রাতটা অদ্ভুত রকমের। বৃষ্টি নেই, তবু আকাশ অস্বাভাবিক রকম ভারি ছিল। বাতাসে ছিল না ঝড়ের শব্দ, ছিল কেবল এক অজানা শঙ্কা।

হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে এক নারীর জীবন হারিকেনের আলোর মতো দুলছিল- কখনো উজ্জ্বল, কখনো নিভু নিভু।

সে নারী- মা হতে চলেছেন।

তার কপাল ঘামে ভেজা, চোখ দুটো আধখোলা।

তাকে সিজারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শেষবারের মতো তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন,

-‘আমার বাচ্চাটাকে দেখ’

এরপর আর কোনো কথা হয়নি।

কিছু সময় পর শিশুর কান্না শোনা গেল।

কিন্তু সেই কান্নার সঙ্গে সঙ্গে একটি বুকের স্পন্দন থেমে গেল চিরতরে।

একজন ডাক্তার ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে বললেন,

-‘বাচ্চাটা বেঁচে আছে... কিন্তু মা... ’

আর কিছু বলার প্রয়োজন পড়েনি।

বাচ্চাটা যেদিন জন্মেছিল, সেদিনই মা হারিয়েছিল ।

শিশুটির নাম রাখা হয় অপরাজিতা। অপরাজিতার মতোই তার মেয়ে অপরাজেও হয়ে উঠুক এটাই ছিল তার বাবার কামনা। অপরাজিতা বড়ো হতে থাকে। মায়ের দুধ নয়- সে বড়ো হয় অভাব নিয়ে, নীরবতা নিয়ে, আর না-পাওয়ার দীর্ঘ ছায়া নিয়ে। দুধ খাওয়ান দাদি। ঘুম পাড়ান ফুপু। এভাবেই তার বড়ো হওয়া, বেড়ে ওঠা।

এত কোল এত লোকের মাঝে সে তার মায়ের কোল খুঁজে পায় না। একটা সময় সে বুঝতে পারে সে কোল হারা সন্তান।

ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ছিল একটা ছবি। শাড়ি পরা তরুণী। চোখে শান্ত হাসি। এই ছবি দেখে দেখে সে বড়ো হতে থাকে। কখনো কখনো কেউ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছ,

- ‘উনি তোমার মা।’

যত বড়ো হতে লাগল, ততই সেই ছবির দিকে তার তাকানো বাড়তে লাগল।

সে কথা বলত ছবির সঙ্গে।

ছবিটা হাত বাড়িয়ে ছ্ুঁতেও চাইতো।

‘মা’- এই শব্দটা তার কাছে ছিল একটা ছবির নাম।

একটা গল্পের চরিত্র।

একজন না-পাওয়া মানুষ।

স্কুলে প্রথম দিন সে দেখেছিল- সবাই নিজের নিজের মায়ের সাথে এসেছে। কেউ হাত ধরে, কেউ কোলে চড়ে। অপরাজিতা বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরেছিল। হঠাৎ মনে হয়েছিল- এই হাতটা বড্ডো শক্ত, নরম নয়।

একদিন এক সহপাঠী জিজ্ঞেস করেছিল,

- ‘তোর মা কোথায় ?’

অপরাজিতা উত্তর দেয়নি।

সে জানতই না- কোথায় মানে কী।

মা দিবস এলো।

সবাই রঙিন কাগজে কার্ড বানাচ্ছে।

লিখছে-

‘আমার মা আমার পৃথিবী’

অপরাজিতার সামনে শিক্ষিকা যখন এসে দাঁড়ালেন, তিনি একটু থমকে গেলেন। বললেন না কিছু।

শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

সেদিন অপরাজিতা প্রথম বুঝল, তার জীবনে একটা ঘাটতি আছে, যেটা কেউ উচ্চস্বরে বলে না,

কিন্তু সবাই জানে।

অপরাজিতা বুঝেছিল মা শব্দের গভীরতা। সেদিন রাতে সে ছবিটার সামনে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর খুব আস্তে বলেছিল,- ‘তুমি যদি থাকতে...’

বাকিটা বলতে পারেনি।

বাবা খুব কম কথা বলতেন। রাতে খাওয়া শেষে বারান্দায় বসে থাকতেন। অপরাজিতা জানত- এই নীরবতার মধ্যেই মায়ের নাম ঘুরে বেড়ায়। একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল,

- ‘আমি জন্মালাম বলেই কি মা চলে গেল ?’

বাবা কোনো উত্তর দেননি।

শুধু মেয়েকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

অপরাজিতা সেদিন বুঝেছিল-

কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে হয় না, কিছু কষ্ট কেবল বুক দিয়ে বোঝা যায়।

এভাবেই ছোট্ট অপরাজিতা শিক্ষিতা তরুণী থেকে চাকরিজীবী হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবনের প্রতিটা অর্জনের পরেই তার মনে হতো- ‘এটা কাকে দেখাবো ?’ যেদিন সে প্রথম বেতন পেল, ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, - ‘মা, এটা আমার প্রথম রোজগার।’

ছবিটা চুপচাপ ছিল।

কিন্তু তার চোখ ভিজে গিয়েছিল।

বছর কেটে গেল।

অপরাজিতার বিয়ে হলো।

মাতৃত্ব সংসারজীবনের পূর্ণতা।

যেদিন সে প্রথম গর্ভবতী হলো, তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে অদ্ভুত ভয় ঢুকে পড়ল।

সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল- নিজের গল্প।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে সে বারবার ভাবছিল- ‘যেন ইতিহাস আর না ফিরে আসে।’

শিশুর কান্না শোনা গেল।

এইবারও।

কিন্তু এইবার সৃষ্টিকর্তা দু’জনের প্রতি মেহেরবান ছিলেন।

মা বেঁচে রইল।

শিশুও।

অপরাজিতা প্রথমবার বুঝল- মা মানে কী।

রাতে সে একা দাঁড়াল তার মায়ের ছবির সামনে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,- ‘মা, তোমার চলে যাওয়া নিয়ে আমার মনে যে কষ্ট ছিল, তা আজ আর নেই। তুমি গেলে বলেই আমি এসেছি। আজ আমি বুঝি- মা মানে শুধু উপস্থিতি নয়, মা মানে আত্মত্যাগ।’

তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এইবার আর লুকাল না। বলল,

“মা, তুমি রয়েছ আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।” 

অলংকরণ : আশরাফ হোসেন