সংবাদ উপস্থাপনায় আবৃত্তি ও মঞ্চের অভিজ্ঞতা বড়ো ভূমিকা রাখে —নাদিরা আশরাফ

30 Sep 2026, 02:39 PM সংবাদ উপস্থাপক শেয়ার:
সংবাদ উপস্থাপনায় আবৃত্তি ও মঞ্চের অভিজ্ঞতা বড়ো ভূমিকা রাখে —নাদিরা আশরাফ

টিভি সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট উচ্চারণ, মিষ্টি কণ্ঠ, সাবলীল বাচনভঙ্গি, আকর্ষণীয় চেহারা এবং দর্শকপ্রিয়তা বা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে যে-ক’জন সংবাদ উপস্থাপক এগিয়ে আছেন, বাংলা ভিশন-এর নাদিরা আশরাফ তাদের মধ্যে অন্যতম। এবারের আনন্দভুবনের সংবাদ উপস্থাপক বিভাগে নাদিরা আশরাফকে নিয়ে লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


শৈশবেই গড়ে ওঠে সংবাদ পাঠের স্বপ্ন

ছেলেবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাদিরা আশরাফ। জাতীয়পর্যায়ে কবিতা আবৃত্তি ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একসময় বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পীও হন তিনি। সেখান থেকেই তার সংবাদ পাঠের যাত্রা শুরু।

বাংলাদেশ বেতারের শিশুদের অনুষ্ঠান ‘কলকাকলী’-তে শিশু সংবাদ পাঠক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান নাদিরা। পরবর্তীসময়ে বেতারের ‘যুব তরঙ্গ’ অনুষ্ঠানেও সংবাদ পাঠ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনার সময় সংবাদ উপস্থাপনার প্রতি তার আগ্রহ আরো গভীর হয়। সেই আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার আলোকে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে দিগন্ত টিভিতে প্রথম টেলিভিশন সংবাদ পাঠে যুক্ত হন। এরপর ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে শুরু করেন বাংলাভিশনে সংবাদ পাঠ। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পরিবারের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে চলা

সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নাদিরার এগিয়ে চলার পেছনে পরিবারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তার মায়ের অনুপ্রেরণাই তাকে সংবাদ পাঠের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। বিটিভির সংবাদ উপস্থাপক আসমা আনোয়ারের সংবাদ পাঠ তার মায়ের খুব ভালো লাগত। ফলে ছেলেবেলায় তাদের বাসায় রাত ১০টার সংবাদ দেখা ছিল অনেকটা বাধ্যতামূলক। মায়ের সেই আগ্রহ ও উৎসাহ থেকেই ধীরে ধীরে সংবাদ পাঠের প্রতি নাদিরার ভালো লাগা তৈরি হয়। পাশাপাশি তার বাবাও সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। বিয়ের পর স্বামী সৈয়দ নাবিল আশরাফও তার পেশাগত পথচলায় সবসময় পাশে থেকেছেন। শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকেও পেয়েছেন সহযোগিতা। নাদিরার ভাষায়, কোনো একজনকে আলাদাভাবে কৃতিত্ব দেওয়া সম্ভব নয় ; পরিবারের সবার সমর্থনই তাকে দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় কাজ করে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।

প্রথম লাইভ সংবাদ পাঠের রোমান্স

প্রথম টেলিভিশন সংবাদ পাঠের অভিজ্ঞতাও ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। প্রথম দিনই তাকে লাইভে যেতে হয়েছিল। একদিকে ছিল ক্যামেরার সামনে প্রথম উপস্থিতির চাপ, অন্যদিকে হঠাৎ করে লাইভ করার দায়িত্ব। স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভয় কাজ করছিল। তবে, স্টুডিও, পিসিআর ও নিউজ রুমের সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সেই সংবাদ পাঠ শেষ করতে সক্ষম হন।

ভালো সংবাদ উপস্থাপকের গুণাবলি

একজন ভালো সংবাদ উপস্থাপকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে নাদিরা মনে করেন নিউজ সেন্স বা সংবাদ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থাকা। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিয়মিত জানাশোনার পাশাপাশি উপস্থাপনার দক্ষতা, বাচনভঙ্গি, শব্দের সঠিক প্রয়োগ এবং কণ্ঠের ওঠানামার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরার সামনে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য স্বাস্থ্যসচেতন হওয়াও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

লাইভে বিব্রতকর মুহূর্ত— হয়ে ওঠে মজার স্মৃতি

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সংবাদ পাঠ করতে গিয়ে মজার ও বিব্রতকর পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কখনো কোনো লাইভে রিপোর্টার ভুল করে আগের সংবাদ উপস্থাপকের নামে তাকে সম্বোধন করেছেন— যা বিব্রতকর হলেও পরে মজার স্মৃতি হয়ে থাকে। আবার টেলিপ্রম্পটার কাজ না-করলেও সাময়িক সমস্যায় পড়তে হয়। তবে, একজন দক্ষ সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে পরিস্থিতি সামলে নিজের মতো করে সংবাদ পাঠ চালিয়ে যেতে হয়। এর বাইরে স্টুডিওতে হঠাৎ মাছির উপদ্রবও কখনো কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

প্রশিক্ষণের চেয়ে মঞ্চচর্চায় বেশি আস্থা

সংবাদ উপস্থাপনার জন্য ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে এক মাসের গ্রুমিং প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নাদিরা। সেটি তার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। পরবর্তীসময়ে সংবাদ উপস্থাপনার ওপর আলাদা কোনো বড়ো কোর্স না-করলেও কবিতা আবৃত্তি ও শুদ্ধ উচ্চারণের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার বিশ্বাস, মঞ্চের অভিজ্ঞতা ও আবৃত্তির চর্চা একজন সংবাদ উপস্থাপকের ভীতকে আরো দৃঢ় করে।

সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি ব্যাংকিং পেশা

সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি ব্যাংকেও কর্মরত নাদিরা আশরাফ। অর্থাৎ পেশাগত জীবনে তিনি একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র সমানভাবে সামলে চলেছেন।

নতুনদের উদ্দেশে পরামর্শ

নতুন প্রজন্মের সংবাদ উপস্থাপকদের উদ্দেশে তার পরামর্শ— শুধু উপস্থাপনার প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না, নিয়মিত মঞ্চচর্চা ও আবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত থাকা প্রয়োজন। কারণ, সংবাদ পাঠের ক্ষেত্রে শুদ্ধ উচ্চারণ, শব্দের সঠিক প্রক্ষেপণ এবং কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব দক্ষতা অর্জনে আবৃত্তি ও মঞ্চের অভিজ্ঞতা বড়ো ভূমিকা রাখে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও নাদিরার রয়েছে বিস্তৃত ভাবনা। সংবাদ উপস্থাপকদের সংগঠন ঘইঅ-এর গত দুই কমিটিতে তিনি ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদ উপস্থাপকদের নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে তার। বিশেষ করে নারী সংবাদ উপস্থাপকদের কাজের ক্ষেত্র আরো বাড়ানো এবং তাদের জন্য পেশাগত পরিবেশকে আরো সহজ ও নিরাপদ করার বিষয়ে কাজ করতে চান তিনি। পাশাপাশি নতুনদের সংবাদ উপস্থাপনার খুঁটিনাটি শেখানোর জন্য একটি ছোটো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলারও ইচ্ছা রয়েছে তার।

অবসর সময়ে

ব্যস্ততার কারণে অবসর সময় খুব বেশি পান না নাদিরা। তাই অবসর পেলেই ঘুমাতে ভালোবাসেন— হাসতে হাসতে এমনটাই জানান তিনি। এর বাইরে মেয়ের সঙ্গে গল্প করা এবং মাঝে মাঝে মেয়ের সঙ্গে ছবি আঁকতেও ভালো লাগে তার। ভ্রমণের ক্ষেত্রে দেশের বাইরে থাইল্যান্ড তার প্রিয় গন্তব্য। সুযোগ হলে সাধারণত বছরে একবার সেখানে বেড়াতে যান।

ব্যক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রেও নাদিরার রয়েছে কিছু সহজ-সরল ভালো লাগা। তার প্রিয় রং লাল, প্রিয় ঋতু শীত। আর প্রিয় খাবারের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে মায়ের হাতে রান্না করা মুরগির মাংস।

প্রায় দেড় যুগের বেশি সময় ধরে সংবাদ উপস্থাপনায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন নাদিরা আশরাফ। সংবাদ পাঠকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, নিজের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের জায়গা হিসেবেও দেখেন তিনি। অভিজ্ঞতা, অধ্যবসায় ও পরিবারের সমর্থনকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতেও সংবাদ উপস্থাপনার জগতে নতুনদের জন্য কাজ করে যেতে চান এই অভিজ্ঞ সংবাদ উপস্থাপক।